খেলা

আমাদের খেলা, আমাদের পেশাদারিত্ব!

মাহমুদুর রহমান : বেশ অনেক কাল আগের কথা। ধরুন ২০০০-২০০৫ সাল। বাংলাদেশের ক্রিকেটের তখনকার কথা মনে পড়ে কি? এক একটা ম্যাচে লজ্জাজনক হার! তখন ম্যাচ শেষে সাক্ষাৎকারে অধিনায়ক বলতেন, “আমরা অভিজ্ঞতা লাভ করছি”। অধিনায়ক যে-ই হোন না কেন, এই বাঁধা বুলিতে বিরক্ত হয়ে মানুষ বলতে শুরু করেছিল, “আর কতো অভিজ্ঞতা লাভ করলে এরা জিততে পারবে?”

সে সময়টাতে দর্শকরা জয়ের আশা তেমন করতেন না। একটা কথা প্রচলিত হয়েছিল, ‘হারটা যেন সম্মানজনক হয়’। অর্থাৎ, হারুক, কিন্তু লড়াই করে যেন হারে। সে সময়টা কেটে গেছে। দেশের ক্রিকেটের অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। একটা সময়ে আমরা মোটামুটি নিয়মিত জয়ের দেখা পেতে শুরু করলাম। কিন্তু আসলে আমাদের পেশাদারিত্ব কতোটা এলো?

‘খেলা’ বিষয়টাকে বরাবর হালকা করে দেখা হয়। খেলা যেন কেবল অবসর উপভোগের জন্য। হয়ত সেটা ছিল এককালে, কিন্তু কালের বিবর্তনে খেলা এখন একটি পেশা। এবং প্রতিটি পেশায় ‘পেশাদারিত্ব’ থাকা উচিত। খেলা থেকে শুরু করে যে কোন পেশায় সাফল্য লাভ করার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, পেশাদারিত্ব।

কিন্তু আমরা কতোটা পেশাদার?

সম্প্রতি, দলের দুঃসময়ে ভাঙা কব্জি নিয়ে মাঠে নামায় তামিমের বিপুল প্রশংসা হয়। দলীয় প্রয়োজনে, তামিমের এই মাঠে নামাটাই পেশাদারিত্ব। আমাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন একটা রব উঠলো যেন তামিম ইকবালই প্রথম এমন ‘ত্যাগ’ স্বীকার করেছেন। অথচ, ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন উদাহরণ আরও আছে। কপালে আঘাত নিয়ে খেলেছেন ব্রেট লি, ভাঙা চোয়াল নিয়ে খেলেছেন অনিল কুম্বলে। আমাদের মাশরাফি খেলছেন একশ’টা আঘাত নিয়ে।

এ তো গেলো ক্রিকেটের কথা। ফুটবল, টেনিস, হকি সব খেলায় এরকম উদাহরণ পাওয়া যাবে। অতি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপে কপাল থেকে টপটপ করে রক্ত ঝরতে থাকা অবস্থায় খেলা চালিয়ে গেছেন হাভিয়ের মাশ্চেরানো।

পেশাদারিত্ব কেবল ইনজুরি নিয়ে খেলার মাঝেই নেই। পেশাদারিত্ব থাকে আচরণেও। বিপক্ষ দলের সাথে গোলযোগ, রেফারি কিংবা আম্পায়ারের সাথে ব্যবহার, এমনকি দর্শকের সাথে ব্যবহারেও খেলোয়াড়কে পেশাদারিত্বের পরিচয় দেওয়া উচিত।

সেই সঙ্গে আরেকটি পেশাদারিত্ব হলো নিজের যোগ্যতাকে বাড়িয়ে তোলা। সময়ের সাথে সাথে সঠিক অনুশীলন এবং আত্মপ্রত্যয়ই পারে, একজনকে এগিয়ে নিতে।

আমাদের ক্রিকেটে এককালে শরীর বাঁচিয়ে খেলার প্রবণতা ছিল। সে জায়গা থেকে এখন অনেক বেশি পেশাদারিত্ব দেখা যায়। কিন্তু খেলায় যে ছন্দ কিংবা ধারাবাহিকতা থাকা উচিত, সেখানে পেশাদারিত্বের বড় অভাব। একটা ম্যাচ জিতে গেলে, পরের ম্যাচে সেই মনোভাব, প্রত্যয় দেখা যায় না। অতি আত্মবিশ্বাস, কখনও গা ছাড়া ভাব এখনও আমাদের খেলোয়াড়দের মাঝে রয়ে গেছে। তাঁরা পুরোপুরি পেশাদারী হয়ে উঠতে পারেন নি। দলের ভেতরে প্রচুর ইনজুরি থাকা সত্ত্বেও আফগানিস্তান এবং ভারতের সাথে ভরাডুবির একটি কারন পেশাদারী মনভাবের অভাব।

পেশাদারিত্ব কেবল মাঠের খেলোয়াড়ের একার বিষয় নয়, পেশাদারিত্ব থাকতে হয় দর্শকেরও। এবং সেখানে আমরা খেলোয়াড়দের চেয়েও অপেশাদারি। আমাদের আচরণের কোন ঠিক নেই। যখন দল ভালো খেলে, আমরা আনন্দে আত্মহারা হই, হারলে আমাদের রাগের সীমা থাকে না। কোন খেলোয়াড় কিছুদিন ভালো না খেললে তাকে নিয়ে নোংরা ‘ট্রল’ করতে যেমন সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে, ভালো খেলামাত্র তাঁর প্রশংসা করতেও দেরি হয় না। আমাদের এই অপেশাদারি মনোভাব আমাদের খেলার ওপর প্রভাব ফেলে।

অতিসম্প্রতি ক্রিকেট ও ফুটবলে, নারী খেলোয়াড়দের সাফল্যে আমরা উচ্ছ্বসিত। অথচ এর আগে তাদের খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করিনি।

খেলা এখন একটা বৈশ্বিক পরিচিতির মাধ্যম। আমাদের পেশাদারিত্বই পারে, বিশ্বের মঞ্চে আমাদের তুলে ধরতে।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker