খেলা

একজন সুপারম্যানের গল্প!

মঞ্জুর দেওয়ান:  পৃথিবীতে মায়াবী নারী আমরা অনেক দেখেছি, মায়াবী নারীর কথা পড়েছি কবিতায়, গল্পে। কিন্তু কেউ মায়াবী পুরুষ দেখেছেন কখনো? হ্যাঁ আমি দেখেছি। আমার ধারণা আপনারা সবাই দেখেছেন !
পৃথিবীর একমাত্র সেই মায়াবী পুরুষের নাম মাশরাফি বিন মর্তুজা।
যার হৃদয়ে দেশ ও মানুষের জন্য এক আকাশ ভালোবাসা আর মায়া।আজ আমরা বলবো এক অন্য মাশরাফির গল্প!
বাংলাদেশের ক্রিকেটের অপর নাম যেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। কারণ গত পনের বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে বল হাতে তিনি যতটা সফল, ঠিক ততটাই সফল তিনি অধিনায়ক হিসেবেও। যার সহজ উদাহরণ হতে পারে টাইগারদের বিগত দুই বছরের পারফর্মেন্স। এই সময়ে প্রতিপক্ষ দলগুলোর সাথে নিয়মিত জেতার পাশাপাশি, আইসিসির র‌্যাংকিংয়েও বাংলাদেশ জায়গা করে নিয়েছে বেশ সমীহ জাগানিয়া স্থানেৃ।
বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলা যেকোন ক্রিকেটারের তুলনায় মাশরাফির উঠে আসার গল্পটা ভিন্ন। ভিন্ন তার লড়াইয়ের গল্পও। খেলোয়াড়ি জীবনের শুরু থেকেই ইনজুরি তার প্রিয় সহচর। এজন্যে দুই হাঁটুতে করাতে হয়েছে মোট সাতটি অস্ত্রোপচার। তবুও তাকে দমাতে পারেনি কেউ। বরং দুঃসময়েও তিনি সামনে থেকে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন। প্রেরণা জুগিয়েছেন গোটা দেশকে।

জাতীয় দলে মাশরাফির সুযোগ পাওয়াটা বেশ নাটকীয়। প্রথম শ্রেণির কোনও ম্যাচ না খেলেই জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে টেস্টে অভিষেক হয়েছিল তার। বৃষ্টি বিঘ্নিত সেই ম্যাচে এক ইনিংস বল করে ৪ উইকেট নিয়েছিলেন মাশরাফি। এর আগে তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। সে সময়ই সান্নিধ্য পেয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলিং কোচ অ্যান্ডি রবার্টসের।

বাংলাদেশের জার্সি পরার পর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি মাশরাফিকে। ইনজুরির দখল কাটিয়ে যে কয়দিন তিনি খেলার সুযোগ পেয়েছেন, তিনি চেষ্টা করেছেন নিজের সবটা দিয়ে খেলার। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম ও পোর্ট অব স্পেনে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম দুটি জয়েই সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছিলেন মাশরাফি। কেবল ভারতের বিরুদ্ধেই নয়, বাংলাদেশের প্রায় সব বড় জয়েই ব্যাটে-বলে মাশরাফির অবদান ছিল। ফলে ৩৬ টেস্টের ছোট্ট ক্যারিয়ারে ৭৮ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি তিন হাফসেঞ্চুরিসহ ৭৯৭ রানও আছে তার নামের পাশে। আর ১৬৩ ওয়ানডেতে উইকেট পেয়েছেন ২০৮টি, আর রান ১,৪৫০। এমনকি সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি বোলার হিসেবে সাকিবের পরই তার অবস্থান।

২০০১ সালের ৮ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হয় মাশরাফির। বৃষ্টির বাগড়ায় ম্যাচটি ড্র হলেও, বল হাতে মাশরাফি নিয়েছিলেন ৪ উইকেট। একই বছরের ২৩ নভেম্বর ওয়ানডে ক্রিকেটেও একই দলের বিপক্ষে মাশরাফির অভিষেক হয়। অভিষেক ম্যাচে বোলিং ওপেন করে তিনি ৮.২ ওভারে ২৬ রান দিয়ে নেন ২টি উইকেট। ওয়ানডে ও টেস্ট ক্রিকেটে দুই ফরম্যাটেই জিম্বাবুয়ের গ্রেট ক্রিকেটার গ্রান্ট ফ্লাওয়ার ছিলেন মাশরাফির প্রথম শিকার!

তৃতীয় টেস্ট খেলার সময় মাশরাফি আঘাত পান হাঁটুতে। ফলে প্রায় দুই বছর ক্রিকেটের বাইরে থাকতে হয় তাকে। ফিরেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৬০ রানে ৪ উইকেট নেওয়ার পর আবার আঘাত পান হাঁটুতে। এ যাত্রায় তাকে মাঠের বাইরে থাকতে হয় আরো বছরখানেক। ২০০৬ সালে এক বর্ষপঞ্জিকায় ৪৯ উইকেট নিয়ে মাশরাফি ছিলেন একদিনের আন্তর্জাতিক খেলায় বিশ্বের সর্বাধিক উইকেট শিকারি বোলার। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে যে আলো ছড়িয়েছিলেন মাশরাফি, তাতে চোট তার শত্রু হয়ে না দাঁড়ালে উইকেট সংখ্যায় হয়তো অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে যেতেন তিনি।
তবে মাশরাফির জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসছে ২০১১ সালে। সে বছর ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপে খেলতে পারেননি তিনি। তার চার বছর পর যদিও বিশ্বকাপেই তিনি বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। শুধুই কি নেতৃত্ব দেওয়া, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে না হারলে টাইগারদের গল্পটি হয়তো আরো ভিন্ন ভাবে লেখা হতো।

শুধু বিশ্বকাপের সাফল্য নয়, বাংলাদেশের গোটা ক্রিকেটকেই বদলে দিয়েছেন তিনি। বদলে দিয়েছেন ক্রিকেটারদের মানসিকতাও। ২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মাশরাফির দলের স্বপ্নযাত্রার শুরু। এর পর বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা এবং সেখানে ভারতের কাছে বিতর্কিত হার। দেশে ফিরে পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়েকে টানা ওয়ানডে সিরিজে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে যায়গা করে নেয়া। আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয়। আর এবারের এশিয়া কাপের ফাইনালে বাংলাদেশ ! আর এই সবই সম্ভব হয়েছে কেবল ওই একজনের জন্যই।
তিনি আর কেউ নন মাশরাফি বিন মর্তুজা।
আমাদের নেতা , আমাদের অধিনায়ক! যার হৃদয় টাই বাংলাদেশের মানচিত্র। যাকে দেখে অনুপ্রেরণা পায় কোটি কোটি মানুষ!
শুধু ক্রিকেটীয় কারনে নয় একজন যর্থাথ মানুষ হিসাবে মাশরাফি বেঁচে থাকবেন চিরকাল বাঙালির জাতির ভালোবাসায়।
জয়তু মাশরাফি!

ছবি: সংগ্রহীত

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker