খেলাহোমপেজ স্লাইড ছবি

স্বন্দীপ লামিচান: নেপালের নতুন বিজ্ঞাপন

সাইদুর বিপু: নেপালের নাম শুনলেই সবার আগে মনে আসে এভারেস্টের কথা। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু এই পর্বতশৃঙ্গের কারনেই নেপাল অধিক পরিচিত বাকি দুনিয়ার সবার কাছে। যে দেশের মানুষের কথা শুনলেই প্রথমে মনে আসে পর্বতারোহী শেরপাদের ছবি। ব্যাপারটা এমন যে, এই দেশের মানুষ শেরপাই হবে- এটাই যেন নিয়তি! আসলে সব সময় যে সেটা ঘটে না, তা প্রমাণ করার জন্যই কিনা, মাত্র ১৮ বছর বয়সী এক তরুণের কারনে পুরো ক্রিকেট দুনিয়া জেনে যাচ্ছে পাহাড়-পর্বতে ঘেরা এই দেশটায় এখন ক্রিকেট খেলাও হয় এবং অমিত প্রতিভা নিয়ে খেলোয়াড় জন্মে। নেপালে ক্রিকেট খেলাও হয়! হুম, এই কথাটা এখন অনেকেই বলবেন, কিন্তু গত কয়েক বছর আগেও যে শোনা যেত না এমন কথা।

নেপালের ক্রিকেটের অস্তিত্বই শুরু হয় মধ্য ৯০ দশকে। সেই দেশের ক্রিকেট খেলা সম্পর্কে এমন কথা বলা হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিছুদিন আগে ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়া দলটার মধ্যেও অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় আছে। যার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হলো স্বন্দীপ লামিচান নামের একজন সদ্য কৈশোর পেরোনো ছেলে। যে দেশটাতে ক্রিকেট খেলার জন্য কোন স্টেডিয়াম নাই, যাদের ক্রিকেট খেলার প্রধান ক্ষেত্র হলো ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এর মাঠ, সেই দেশের খেলোয়াড় কে নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় ফ্রাঞ্চাইজি লীগ গুলোতে কাড়াকাড়ি চলতেছে বর্তমানে।

তাহলে শুরু করা যাক। ২০০০ সালের ২রা আগস্ট নেপালের অরুচাউর নামের একটা জায়গায় জন্ম নেয়া সন্দ্বীপ বছর দুই আগে যখন মাইকেল ক্লার্ক এর পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন “তার স্বপ্ন হলো বিগ ব্যাশে খেলা”, তখন তিনি জানতেন না কিছুদিন পরেই তার এই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। স্বপ্ন পুরনের গল্প শুরু হয় যখন তার বয়স ৮-৯। স্বন্দীপ নিজেই বলেন “নিছক মজা থেকে, ৮-৯-১০ এমন বয়সে আমরা মানে আমার বন্ধু-ভাইদের সাথে রাস্তায় ক্রিকেট খেলতাম, পাড়ায় বেশ নামডাক ছিল, অবশ্যই তখন ভাবিনি যে এতোদূর আসবো, কিন্তু আস্তে আস্তে সামনে এগুতে থাকি।” অরুচাউর থেকে চিতওয়ান শহরে আসেন তিনি শুধু মাত্র ক্রিকেটের উপর ট্রেনিং নিতে। এই ট্রেনিং ক্যাম্পটি পরিচালনা করতেন নেপালের সাবেক অধিনায়ক রাজু খাদা। এই চিতওয়ান ক্রিকেট একাডেমিতে থাকাকালীন এখানে ভিজিটে আসেন তৎকালীন অধিনায়ক পরশ খাদা ও নেপালের সাবেক কোচ পুবুবু দাসানায়েকে। এসেই তারা হীরা চিনতে ভুল করেননি, তাই তো স্বন্দীপ কে ডেকে নেটে বোলিং করতে বললেন এবং এখান থেকেই অনূর্ধ্ব ১৯ এর ট্রেনিং এর ক্যাম্পে ডাক পান। যদিও স্বন্দীপ ছোটবেলা থেকে ক্রিকেটীয় আদর্শ মানতেন শচীন টেন্ডুলকার ও শেন ওয়ার্ন কে তবে তার জীবনের ভাগ্যরেখা বদলে দেয়ার পেছনে অস্ট্রেলিয়ার দুই অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক ও রিকি পন্টিং অবদান রাখেন।

হংকং এর একটা টুর্নামেন্টে মাইকেল ক্লার্ক যখন স্বন্দীপ কে দেখেন ২০১৬ সালে, সেখান থেকে ১৬ বছর বয়সী এই লেগ স্পিনার কে নিয়ে আসেন সিডনি গ্রেড ক্রিকেটে। এখান থেকে রিকি পন্টিং তাকে নিয়ে যান আইপিএল এর দিল্লীর হয়ে খেলার জন্য। শুরু হয় স্বন্দীপের স্বপ্নযাত্রা। বিশ্বের কাছে নেপালীজ ক্রিকেটের অগ্রগামী হিসেবে থাকবে এই স্বন্দীপের নাম। ইতিমধ্যেই সে আইপিএল, বিগ ব্যাশ, কানাডিয়ান লীগ, ক্যারিবিয়ান লীগ, দুবাই লীগ এবং হালের আমাদের দেশের বিপিএল খেলার কারনে এই বয়সেই ড্রেসিং রুম শেয়ার করা হয়ে গেছে রিকি পন্টিং, ক্লার্ক, ম্যাক্সওয়েল, সুনীল নারাইন, ক্রিস গেইল, ক্রিস লিন, কাইরন পোলার্ড, ডেভিড ওয়ার্নার মতো খ্যাতিমান ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের সাথে। এতো বড় বড় জায়গায় খেলছেন, তবু দেশের হয়ে খেলা কিংবা নিজ দেশের খেলা বা খেলোয়াড়ের উন্নতির কথাই তিনি বলেন “এই যে আমি খেলছি, এটা আমার দেশ কে রিপ্রেজেন্ট করছে। যদি আমি ভালো খেলি তাহলে এটা নেপালের ক্রিকেটেরই উন্নতি হবে। আমাদের দেশের নতুনদের কাছে ‘কখনো হার না মানার একটা ভালো একটা শিক্ষা হয়ে থাকবে। এখন সবাই বুঝবে যে খেলার মধ্যেই ভালো কিছু সম্ভব”। 

আইপিএল ৩ ম্যাচে ৫ উইকেট, বিগ ব্যাশের ৪ ম্যাচে ৮ উইকেট। মোট ১৭ টিটোয়েন্টি তে ২৪ উইকেট, আন্তর্জাতিক ওয়ানডে তে ৩ ম্যাচে ৮ উইকেট নেয়া এই লেগ স্পিনার এর কথাবার্তাতেও ম্যাচুরিটি দেখা যাচ্ছে, বাকিটা সময়ই বলে দিবে। তবে চাইবো স্বন্দীপের মতো খেলোয়াড়ের হাত ধরে ক্রিকেট দুনিয়ায় উঠে আসুক নেপাল নামের এক জায়ান্ট কিলারের নাম- সেটাই এখন বেশি করে কাম্য।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker