খেলাহোমপেজ স্লাইড ছবি

সুইমিং পুলের অবিসংবাদিত রাজা কিংবা একজন জল দানব!

মঞ্জুর দেওয়ান: মাইকেল ফেলপস। একজন জল দানব। সুইমিং পুলের অবিসংবাদিত রাজা। যা কে কোন বিশেষণেই বিশেষায়িত করা যায় না। ফেলপসের জন্য অভিধানে নতুন শব্দের সংযোজন ঘটলেও অবাক হবার কিছু নেই। একজন মানুষের পক্ষে যা করা সম্ভব তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু করে দেখিয়েছেন এই মার্কিন সাঁতারু। অতিমানবীয় কোন শক্তি নিয়ে জন্মেছেন মানুষরূপী এই জল দানব! অম্ভব কিছু নয়; হতেই পারে! নাহলে রেকর্ডধারী একজন সাঁতারু কিভাবে অবসর থেকে ফিরে, আবার রেকর্ড গড়তে পারেন! এমন অনেক দেশ আছে যারা দীর্ঘদিন ধরেই একটি অলিম্পিক সোনার জন্য কাঠখড় পুড়িয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু পদকের দেখা পাচ্ছেনা না। অথচ ফেলপস একাই ২৮ টি পদক জিতেছেন। যার মধ্যে ২৩ টি স্বর্ণপদক! 

এই মানুষটির জন্মই হয়েছে যেন অলিম্পিকে আলো ছড়ানোর জন্য। পুলে ঝড় তোলার জন্য। অবশ্য ফেলপসের কথা থেকেও তাই বুঝা যায়। অবসর ভেঙে ফেরা পর, নিজের চেয়ে সাঁতারকে বেশি ভালোবাসার কথা বলেছিলেন এই মার্কিন তারকা। ২০০০ সালে সিডনি অলিম্পিক দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে অংশ নেয়া শুরু হয় ফেলপসের। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই অলিম্পিকে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। আর একের পর এক রেকর্ড গড়তে থাকেন। অভিষেকে অলিম্পিক রাঙাতে না পারলেও এথেন্স অলিম্পিকে পদক অভিযান শুরু হয় ফেলপসের। ছয়টি স্বর্ণ ও দুটি ব্রোঞ্জ পদক মিলিয়ে মোট আটটি পদক জিতেন। যার মধ্যে প্রথম সোনাটি ছিলো বিশ্বরেকর্ড গড়ে। ৪০০ মিটার একক মেডলিতে ৪ মিনিট ৮.২৬ সেকেন্ড সময় নিয়ে এই বিশ্বরেকর্ড গড়েন ফেলপস। ঘোষণা দিয়ে রেকর্ড ভাঙা প্রথম সাঁতারু ফেলপস। ১৯৭২ সালে মিউনিখের সামার অলিম্পিকে স্পিৎজের গড়া ৭ টি সোনা জয়ের রেকর্ড ভেঙে দেন ফেলপস। ২০০৮ সালে বেইজিং অলিম্পিকের আগে ঘোষণা দেন, এবারই স্পিৎজের রেকর্ড ভাঙবেন তিনি। যেই কথা কাজ, ঘোষণা অনুযায়ী বেইজিংয়ে এসে ৮ টি বিভাগে সোনা জিতে নেন ‘দ্য কিং অব পুল’! ভেঙে দেন উত্তরসূরি স্পিৎজের ৪০ বছরের রেকর্ড। শুধু তাই নয়; বেইজিং অলিম্পিকের ৭ টি ইভেন্টে বিশ্বরেকর্ড করেন ফেলপস। বাকি একটি ছিলো অলিম্পিক রেকর্ড!

২০০৮ এর সাথে মিল রেখে ২০১২ অলিম্পিকেও ঘোষণা। জিমন্যাস্ট লারিসা লাতিনিনার ১৮ টি পদকের রেকর্ড ভাঙতে চান ফেলপস। এবারও কথা রাখলেন মার্কিন ‘ফ্লাইং ফিশ’। ভাঙলেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন আর্টিস্টটিক জিমন্যাস্টের দখলে থাকা ৪৮ বছরের রেকর্ড। ১৮ পদকের জবাব দিলেন ২২ পদক দিয়ে! নিজেকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে নিয়ে গেলেন ফেলপস। শুধু পদক জিতেই পৃথিবীকে অবাক করেননি ফেলপস। ফর্মের তুঙ্গে থেকে অবসর নিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন। এক বছরের বেশি সময় ক্রীড়াবিদদের আলোচনার খোরাক ছিলেন ‘দ্য কিং অব অলিম্পিক’! তবে অবসরের ঘোষণা দিয়ে যতটা অবাক করেছিলেন, তার চেয়ে বেশি অবাক করেছিলেন অবসর ভেঙে! পুলের চিরচেনা উত্তেজনা আর জলরাশির শব্দ থেকে বেশিদিন দূরে থাকতে পারেননি ফেলপস।

২০১৬ রিও অলিম্পিকে ফেরার ঘোষণা দেন এই মহাতারকা। তবে কাগজে কলমের বয়স সায় দিচ্ছিলো না ফেলপসকে। অনেক বিশেষজ্ঞই বলেছিলেন, ‘এবার আর ফেলপসকে দিয়ে হবেনা’! দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন কেবল ফেলপস। নিজেকে আগের চেয়ে অধিক ফিট দাবি করে ৬ টি পদক জিতে নেন এই সাঁতারু। যার মধ্যে ছিলো ৫ টি স্বর্ণ ও একটি রৌপ্য পদক। প্রথম মার্কিন সাঁতারু হিসেবে ৫ টি অলিম্পিকে অংশ নিয়েছেন। অলিম্পিকের সুইমিং ইতিহাসে একক সাঁতারে সবচেয়ে বেশি বয়সে স্বর্ণ জিতেছেন ফেলপস। ২০০৯ সালে ফেলপস ১০০ মিটার বাটারফ্লাইয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েন। ওই ইভেন্টে ফেলপসের টাইমিং ছিলো অবিশ্বাস্য। ঘন্টায় সাড়ে ৫ মাইল গতিতে সুইম করেছিলেন তিনি। একবিংশ শতাব্দীর মানুষ ফেলপসের কাছে হয়তো ঋণী থাকবে চিরকাল। মানব হয়েও অতিমানবীয় সব দৃশ্য উপহার দিয়েছেন এই সাঁতারু ৷ টানা ৫ টি অলিম্পিকে মানুষকে মোহিত করে রেখেছিলেন। সাঁতারকে নিজের সমার্থক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন মাইকেল ফ্রেড ফেলপস!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker