খেলাহোমপেজ স্লাইড ছবি

মোহামেদ সালাহ কিংবা মরুভূমির জাদুকর!

মঞ্জুর দেওয়ান: লিওনেল মেসি এটা করেছেন; ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ওটা করেছেন! অথবা নেইমার ইনজুরিতে পড়েছেন; সুয়ারেজ কামড় দিয়েছেন! বছর কয়েক আগেও এমন সব খবরে সয়লাব ছিলো গণমাধ্যম। তবে সময়ের স্রোতে প্রেক্ষাপট পাল্টেছে। একটা সময় হালের সব ফুটবল মহাতারকার জন্ম দিত লাতিন আমেরিকা। পেলে, ম্যারাডোনা, রবার্তো কার্লোস, রোনালদো, রোনালদিনহো যার বড় উদাহরণ। বর্তমান সময়ের উদাহরণ হতে পারে মেসি, নেইমার, সুয়ারেজও। তবে লাতিনদের সেই ছন্দকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে এখন ইউরোপিয়ানদের ‘পাওয়ার শো’ চলছে। তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার কথা ইউরোপের সব ফুটবলারের। আছেও তাই। বিগত চারটি বিশ্বকাপ জিতে ইউরোপিয়ানরা শক্তির জানান দিয়েছে। তবে ইউরোপিয়ানদের সাথে সমান তালে লড়ে চলেছেন একজন। যার জন্ম মরুর দেশে। মরুর রাজ্য থেকে এসে বরফের রাজ্যে রাজত্ব করছেন। মেসি-রোনালদোর রেকর্ডে যিনি ভাগ বসানোর দাবিদার তার নাম মোহামেদ সালাহ। মিশর থেকে এসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্রের অধিপতি হয়েছেন। ফুটবলের আতুরঘর ইংল্যান্ডকে করে রেখেছেন সালাময়। সময়ের অন্যতম সেরা ফুটবলারকে নিয়ে তুলে ধরবো কিছু তথ্য।

অন্যান্য আরবী ভাষাভাষীর মতো মোহামেদ সালাহরও রয়েছে সুবিশাল নাম। সালাহর পুরো নাম মোহামেদ হামেদ মাহরোস ঘালি হলেও মোহমেদ সালাহ নামেই তিনি পরিচিত। শহর থেকে অনেক দূরে মিশরের বাসইয়ুন শহরের অন্তর্গত নাগ্রিক নামক এক গ্রামে জন্ম সালাহর। ভাইয়ের সঙ্গে খেলে ফুটবলের সাথে পরিচয় তার। বলতে গেলে ভাইয়ের থেকে ফুটবলের হাতেখড়ি নিয়েছেন তিনি। তবে পরিশ্রমী সালাহর স্বপ্ন ছিলো আকাশছোঁয়া। গলির ফুটবলেই থেমে থাকেননি সালাহ। নিজের গ্রাম থেকে প্রায় আধা ঘন্টা দূরের একটি ক্লাবে নাম লেখান। সেখানে তৃপ্ত না হয়ে তান্তার আর একটি ক্লাবে যোগ দেন সালাহ। তবে সিনিয়র ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন ইজিপশিয়ান প্রিমিয়ার লিগের এল মকাওলুন নামের একটি অখ্যাত ক্লাবে। ক্লাবের অনুশীলনে পৌঁছানো ছিলো এক যুদ্ধ। গড়ে তিন চারটি বাস বদল করে অনুশীলনে যেতেন সালাহ। স্কুল আর অনুশীলন একসাথে করা ছিলো অমাবনবিক পরিশ্রম। ২ বছরের ক্যারিয়ারে ১১ গোল করতে পেরেছিলেন সালাহ। সকাল থেকে রাত অবধি পরিশ্রম বিফলে যায়নি তার। মকাওলুনে ২ বছর খেলার পর ‘পদোন্নতি’ পেয়ে ইউরোপে যান। নাম লেখান সুইস ক্লাব বাসেলে। সেখানেও দুই বছরের জন্য ছিলেন। ৪৭ ম্যাচ খেলে মাত্র ৯ গোল করতে পেরেছিলেন আজকের এই গোলমেশিন! তবে ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলোর নজরে এসেছিলেন। যার সুবাধে ২০১৪ তে চেলসিতে খেলার সুযোগ হয়। কিন্তু চেলসিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি ইজিপশিয়ান কিং। ২০১৪ থেকে ২০১৬ তে মাত্র ১৩ ম্যাচ খেলার সুযোগ পান। গোলখরা দেখে চেলসি কর্তৃপক্ষ ফিওরেন্তিনার কাছে ধারে ছেড়ে খেলতে দেন সালাহকে। ফিওরেন্তিনায় নিজেকে ফিরে পাবার পূর্বাভাস মিললে এএস রোমায় ধারে যান। ২৪ ম্যাচে ১৪ গোল করে নিয়মিত হওয়ার সংকেত দেন সালাহ। এরপর পুরোপুরি রোমার ফুটবলার হিসেবে খেলার সুযোগ পান। ৩১ ম্যাচে ১৫ গোল করে আবার নামজাদা সব ক্লাবের নজরে আসেন সালাহ। দলবদলের বাজারে অনেক ক্লাব সালাকে দলে ভেড়াতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত সালাকে জিতে নেয় লিভারপুল।

৯ বছরের সিনিয়র ফুটবল ক্যারিয়ারে অনেকগুলো ক্লাবে খেলেন সালাহ। তবে তার ফুটবল দক্ষতার সর্বোচ্চ প্রতিভা দেখিয়েছেন এই লিভারপুলে যোগ দিয়ে। ২০১৬ সালে এএসরোমা থেকে লিভারপুলে এসে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেন এই ‘ইজিপশিয়ান কিং’। প্রথম মৌসুমেই অল রেডদের হয়ে ৪৪ গোল করে সবাইকে চমকে দেন সালাহ। এক মৌসুমের সবচেয়ে বেশি ম্যাচে গোলের রেকর্ড গড়েছেন সালাহ। অভিষেকে লিভারপুলের হয়ে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ডও এখন সালাহর দখলে। শুধু প্রিমিয়ার লিগেই নয়, ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ চ্যাম্পিয়ন্স লীগও সমান নৈপুণ্য দেখিয়েছেন সালাহ। তার অসাধারণ ফুটবল কারিশমায় লিভারপুল উঠেছিল ফাইনালে। ইনজুরি বাঁধা গ্রাস না করলে সেদিনও হয়তো অপ্রতিরোধ্য থাকতেন মোহাম্মদ সালাহ। 

ক্লাব ফুটবলের পারফর্মেন্স জাতীয় দলে টেনে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন সালাহ। মিশরের নিয়মিত স্কোরার ছিলেন তিনি। যার সুবাদে ২৮ বছর পর মিশর ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে খেলার সুযোগ পায়।
প্রিমিয়ার লিগ এখনো সালাহময় হয়ে আছে। অ্যানফিল্ডে খেলতে নামলেই সালাহ বন্দনায় মাতেন দর্শকরা। আর টিভি সেটের সামনে বসে সালাহ’র ফুটবল কারিশমা দেখে মোহিত হয় কোটি ফুটবলপ্রেমী!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker