খেলাহোমপেজ স্লাইড ছবি

বিশ্বসেরা তিন গোলরক্ষক

মঞ্জুর দেওয়ান: ফুটবল খেলাকে যদি স্ট্রাইকারদের খেলা বলি তাহলে কি খুব বেশি ভুল হবে? আমার কাছে মনে হয় হবেনা। কারণ সবুজ গালিচায় গোলদাতাকেই হিরো হিসেবে গণ্য করা হয়। ডিফেন্স, মিডফিল্ডার কিংবা টিম ম্যানেজারকে ছাপিয়ে ফ্লাডলাইটের সবটুকু আলো কেড়ে নেন ফরোয়ার্ডরা। বড় বড় ক্লাব কিংবা জাতীয় দলের দিকে তাকালেই আন্দাজ করতে পারবেন ব্যাপারটা। সেই পেলে-ম্যারাডোনার আমল থেকে হালের মেসি রোনালদো। স্ট্রাইকার ছাড়া অন্য কাউকে নিয়ে কি খুব বেশি মাতামাতি করতে দেখেছেন? কালেভদ্রে দু একজন নজর কাড়েন না তা নয়। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রাধান্য পায় গোলদাতারা। কিন্তু গোল পোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে যে একজন প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামলাচ্ছে তাকে নিয়ে মাতামাতি করার অবকাশই হয়তো থাকেনা দর্শকদের। তারপরও মাঝে মাঝে ’ক্ষনজন্মা’ এমন কিছু গোলকিপারের দেখা মিলে যারা নিজেদেরকে সবার চেয়ে আলাদা করে বিবেচনায় আনতে ‘বাধ্য’ করেন। এমনই ৩ জন গোলকিপারের গল্প জানাবো এবারের আয়োজনে।

ইকার ক্যাসিয়াস
চাদর দিয়ে হয়তো মোমবাতির আলোকে আড়াল করা যায়। সূর্যের আলোকে কি আড়াল করা যায়? যাওয়ার কথাও না। প্রচলিত এই কথাটি বলার পেছনে একটি বিশেষ কারণ আছে। আর তা হলো ইকার ক্যাসিয়াস। স্প্যানিশ গোলরক্ষকের সাথে এই উক্তিটি খুব ভালোভাবে যায়। ১৯৯৯ সালে রিয়াল মাদ্রিদে অভিষেক হলেও বছর তিনেক প্রায় রিজার্ভ বেঞ্চে কেটেছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই গোলরক্ষকের। ২০০২ সাল অবদি বেঞ্চে বসে স্বপ্নের রিয়াল মাদ্রিদের খেলা দেখেন ক্যাসিয়াস। মূল গোলরক্ষক সিজার সানচেজ ফিট থাকায় একাদশে সুযোগ পেতেন না। কিন্তু একদিন এই সিজারের ইনজুরি আশীর্বাদ হয়ে আসে ক্যাসিয়াসের জীবনে!

২০০২ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে সিজারের ইনজুরিতে তৎকালীন কোচ ভিসেন্তে দেল বস্ক বাধ্য হন ক্যাসিয়াসকে নামাতে। আনকোরা ক্যাসিয়াস নেমে যান জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধে কিংবা পরীক্ষায়। সাঁতারের অভিজ্ঞতা না নিয়েই নেমে পড়েন চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মতো ‘মহাসাগরে’। কিন্তু সেদিন চাপ সামলে, কি দূর্দান্তভাবেই না নিজেকে চিনিয়েছিলেন ক্যাসিয়াস। দেল বস্কের জহুরি চোখে লেটার মার্ক নিয়ে পাস করেন বিশ্বকাপ জয়ী এই গোলকিপার।

সেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল থেকে শুরু হয় ইকার ক্যাসিয়াসের পথচলা। এরপর এক যুগের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আর পেছনে তাকাতে হয়নি স্প্যানিশ ’বাটারফ্লাই’র। রিজার্ভ বেঞ্চে বসে থাকা সেই ছেলেটিই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন রিয়াল মাদ্রিদের মধ্যমণি। ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসে অনন্য নজির স্থাপন করেন সেইন্ট ইকার ক্যাসিয়াস। রিয়াল মাদ্রিদ তো বটেই বিশ্বফুটবলের অন্যতম সেরা গোলকিপার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি।

চারটি লিগ টাইটেল, তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা, দুটি ইউরো শিরোপা, চারবার স্প্যানিশ সুপার কাপ জিতেছেন নাম্বার ওয়ান। সবচেয়ে বড় শিরোপাটি জিতেছেন ২০১০ সালে। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে সোনার অক্ষরে লিখেছিলেন স্পেনের নাম। স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে মূল্যবান শিরোপাটি আসে ক্যাসিয়াসের অধিনায়কত্বে। ২১টি মেজর শিরোপা জিতে নিজেকে অনন্য এক জায়গার নিয়ে গেছেন সেইন্ট ইকার ক্যাসিয়াস ফার্নান্দেজ। হলফ করে বলতে পারি স্পেনের ফুটবল ভক্তরা একদিন গর্ব করে বলবে, আমরা ইকার ক্যাসিয়াসের দেশের মানুষ!

জিয়ালুইজি বুফন

ফুটবল ইতিহাসের আশ্চর্যজনক এক গোলকিপারের নাম জিয়ালুইজি বুফন। অ্যাথলেট পরিবারে জন্ম নেয়া বুফনের বিশ্বব্যাপী পরিচিতি জিজি নামে। বলা হয়ে থাকে, জন্মের আগেই বুফনের পেশা ঠিক করে ফেলেন তার পরিবার! পুরো পরিবারই যেন খেলার দল! ইতালিয়ান চাকতি নিক্ষেপে বুফনের মা তিনবার সেরা হয়েছিলেন। বাবাও ছিলেন অ্যাথলেট। দুই বোন জড়িত ভলিবলের সাথে। তাই ছোটবেলা থেকেই খেলার নেশা পেয়ে বসে বুফনকে। পরিবারের অন্যদের চেয়ে বুফনকে আলাদা করে গড়তে চাইলেন বাবা-মা। ১০ বছরের ছোট্ট বুফনকে তাই ভর্তি করিয়ে দেয়া হলো ফুটবল একাডেমিতে।

সুবোধ বালকের মতো ফুটবল খেলে বুফন। বেছে নেন মিডফিল্ড পজিসন! হ্যা, ক্যারিয়ারের শুরুতে মিডফিল্ডার হয়ে খেলতে শুরু করেন জিজি। মাঝমাঠের সেনানী হয়েই কেটে যায় দুই বছর! পরে নিজেকে ’ভাঙতে’ চান বুফন। যে ভাঙার পেছনে ছিলো ক্যামেরুন গোলকিপার থমাস এনকোনো’র অবদান। ১৯৯০ এ চলা ইতালি বিশ্বকাপে নিজের আইডলকে খুঁজে পান বুফন। ক্যামেরুনের গোলরক্ষক থমাস এনকোনোকে দেখে গোলকিপার হবার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তারপর থেকেই হাতে কিপিং গ্লাভস তুলে নেন ইতালিয়ান কিংবদন্তি।

সিনিয়র ক্যারিয়ারের শুরুতে পার্মার হয়ে খেলেছেন বুফন। ৫ বছরের পার্মা ক্যারিয়ার শেষে যোগ দেন জুভেন্টাসে। যোগ দেয়ার পরই ক্লাব ক্যারিয়ারে ইতালিয়ান জায়ান্ট জুভেন্টাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যান বুফন। টানা ১৭ বছর কাটান অ্যালিয়েঞ্জ স্টেডিয়ামে। লড়ে যান তুড়িনের বুড়িদের হয়ে। পিএসজিতে যোগ দেবার আগে জুভেন্টাসের হয়ে ৫০৯ টি ম্যাচ খেলেন জিজি।

জুভদের হয়ে রেকর্ড ১১ টি লিগ শিরোপা জিতেন কিংবদন্তি এই গোলকিপার। যদিও আইনি জটিলতায় দু’টি শিরোপা ধরা হয়না। কাগজে কলমে তাই ৯ টি শিরোপাকেই জুভদের ধরা হয়। কোপা ইতালিয়ার ৪টি শিরোপা আছে বুফনের ঝুলিতে। ৫টি সুপারকোপা জিতে পৃথিবীর অন্যান্য গোলকিপারের চেয়ে নিজেকে আলাদা করে প্রমাণ করেন বুফন। জিতেছেন বিশ্বকাপের মতো শিরোপাও। ২০১৬ বিশ্বকাপে জিজির নেতৃত্বে চার নম্বর সোনালি ট্রফির স্বাদ পায় ইতালি।

অর্জন আর অভিজ্ঞতার ঝুলি যার এতো সমৃদ্ধ, তারও রয়েছে ছোট্ট এক দু:খ। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ না জেতার দু:খ! একটিমাত্র চ্যাম্পিয়ন্স না জেতার আক্ষেপ বহুবার করেছেন ইতালিয়ান কিংবদন্তি। একবার ঘোষণাও দিয়েছিলেন, জুভদের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ না জিতিয়ে অবসরে যাবেন না বুফন। কিন্তু তীরে এসে তরী ডুবেছে একাধিকবার। যার নেপথ্যে ছিলেন স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ আর বার্সেলোনা। দুই দলের কাছেই হেরেছে বুফনের জুভেন্টাস। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের অধরা ট্রফি না ছুঁয়েই জুভেন্টাস ছাড়েন বুফন। নতুন জীবন উৎযাপন করছেন প্যারিস সেইন্ট জার্মেইন’র হয়ে। কে জানে, নেইমার-এমবাপেদের সাথে নিয়েই হয়তো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা ছুঁতে চান গোলপোস্টের অতন্দ্র প্রহরী জিজি !

অলিভার কান

নতুন প্রজন্মের কাছে অলিভার কান নামটা কেমন সাড়া ফেলবে উপলব্ধি করা কঠিন। কিন্তু যারা ফুটবলের নিয়মিত খোঁজ খবর রাখেন, তাঁরা স্মৃতি বিজড়িত না হয়ে পারবেন না। অথবা আফসোস করে বলবেন, অলিভার কানের সময় কেন আমাদের জন্ম হলো না! হ্যা, অলিভার কান এমনই একজন গোলকিপার ছিলেন। দূর্বল দলকে যিনি গোল ঠেকিয়ে সবল করে তুলতেন। পায়ের খেলাকে হাত দিয়েই খেলতেন! আচ্ছা একটা স্মৃতিচারণ করা যাক; ২০০২ বিশ্বকাপের ফাইনালে রোনালদো-রিভালদোরা যখন একের পর এক গোল করে যাচ্ছিলেন, তখন জার্মানির হয়ে একজন গোল ঠেকিয়ে যাচ্ছিলেন! তুলনামূলক দূর্বল দলকে গোল ঠেকিয়েই ফাইনালে নিয়ে গিয়েছিলেন অলিভার কান। ফুটবল যে শুধু পায়ের খেলা না; হাত দিয়েও খেলা যায় তার অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন কান। জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে কানের পারফর্মেন্স এতোটাই মনোমুগ্ধকর ছিলো যে, প্রথম এবং ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে গোল্ডেন বল জিতে নিয়েছিলেন জার্মানির কিংবদন্তি এই গোলকিপার।

সব দিক দিয়েই শতকের যেকোন গোলকিপারের চেয়ে সেরা ছিলো কান। অসম্ভব জাম্পিং কোয়ালিটির কারনে হতাশ হয়েছেন সে সময়ের বাঘা বাঘা সব স্ট্রাইকার। কানের সামনে শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে অনেক সেরা সেরা দলকে। তার এই অতিমানবীয় পারফরমেন্স এর জন্য তাকে বলা হতো ’দ্য টাইটান’।

মাত্র তিন বছর বয়সেই ফুটবলে হাতেখঁড়ি হয় কানের। ফুটবলের প্রতি অগাধ ভালবাসা আর আগ্রহের কারনে ৬ বছর বয়সেই স্থানীয় ক্লাব ‘কার্লস’রুহে সকার ক্লাব’এ খেলার সুযোগ পান। প্রথমে মিডফিল্ডার হিসেবে খেলেছেন জগতবিখ্যাত এই গোলকিপার। কানের পজিসন বদল হয় একদিন ম্যাচ চলাকালীন সময়ে গোলকিপার ইনজুরিতে পড়ায়। রিজার্ভে কোন গোলকিপার না থাকায় কান গিয়ে দাঁড়ান গোলবারের সামনে। সে ম্যাচে অসাধারণ পারফরমেন্সের পাশাপাশি দুর্দান্ত কিছু সেভও করেন কান। সেদিনই কোচ আবিষ্কার করেন গোলকিপার কান কে। তারপর থেকে গোলকিপিং এর দায়িত্ব আসে কানের উপর। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। সেদিন যদি ঐ গোলকিপার ইনজুরিতে না পড়তো তাহলে আজকে অলিভার কান নামক বাজপাখিকে পেতোনা ফুটবল দুনিয়া।

১৯৭৫ থেকে এক যুগ কার্লস রুহে ইয়ুথ টিমে খেলেন কান। ১৯৮৭-৮৮ মৌসুমে ডাক পান মূল দলে। তবে ব্যাক আপ গোলকিপার হিসেবে দিন কাটতে থাকে কানের। তবে অভিষেকেই নজর কাড়েন সাবেক জার্মান নাম্বার ওয়ান। এফসি ক্লোন’র বিপক্ষে ৪-০ গোলের জয় দিয়ে শুরু হয় কানের কিপিং অভিযান। কিন্তু মূল গোলকিপার দুর্দান্ত ফর্মে থাকায় বেশি ম্যাচ খেলা হয়না কানের। কিন্তু ক্লাবের প্রতি ভালবাসা আর অসাধারণ ব্যক্তিত্বের কারণে ১৯৯০ সালে মূল একাদশে সরাসরি অধিনায়ক হিসেবে জায়গা করে নেন। পুরো সিজনে দুর্দান্ত ছিলেন কান। দলকে নেতৃত্ব দেন ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত। ততদিনে এই হীরের খবর ছড়িয়ে পড়ে জার্মানী সহ পুরো ফুটবল বিশ্বে। যার সুবাদে রেকর্ড ট্রান্সফার ফি’তে বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেন।

বায়ার্নে এসেও সহজাত স্বভাবে খেলতে থাকেন কান। অভিষেক মৌসুমেই জিতে নেন সেরা গোলকিপারের মুকুট। কিন্তু নিজেকে পুরোপুরি মেলে ধরলেও বায়ার্নের হয়ে প্রথম শিরোপার দেখা পান দুই বছর পর। ১৯৯৬ সালে বর্ডেক্স কে হারিয়ে উয়েফাকাপ এর শিরোপা জিতে বায়ার্নের সাথে শিরোপা খরা কাটে কানের। ওই সিজনে(৯৬-৯৭ তে) কান তার কারিশমা দেখান। সেরা গোলকিপার এর পাশাপাশি তার দলকেও জেতান বুন্দেস লীগা।

দল হিসেবে জার্মানীকে কিছু না দিতে পারলেও ব্যক্তিগত অর্জনে ছাপিয়েছেন বাঘা বাঘা সব তারকাকে। দুইবার জার্মানির বর্ষসেরা ফুটবলার হয়েছিলেন। টানা চারবার জিতেছিলেন ইউরো বর্ষসেরা গোলকিপারের পুরস্কার। ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার যিনি বিশ্বকাপ ফুটবলের একমাত্র গোল্ডেন বল জয়ী গোলকিপার। ১৯৯৯ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত একক আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন পুরো ফুটবল বিশ্বে। টানা চারবার উয়েফা বেস্ট গোলকিপার, বেস্ট বুন্দেসলীগা গোলকিপার এবং টানা চারবার চ্যাম্পিয়নস লীগ একাদশে জায়গা করে নিয়েছিলেন কান দ্য টাইটান!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker