খেলাহোমপেজ স্লাইড ছবি

ফুটবল মাঠের ‘কালো চিতা’

মাহমুদুর রহমান: আফ্রিকার গরীব দেশ মোজাম্বিক। ইংরেজ কিংবা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের কাছে অন্ধকার দেশ আফ্রিকা, যারা মানুষ হত্যা করে উৎসবের ভোজ করে। সেখানে সবাই বর্বর, আধুনিকতা নেই, নেই কোন প্রতিভা। কিন্তু ইউরোপীয়দের সেই ভুল ধারণা নানা সময়ে নানা প্রতিভাবান ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন হলেন ইউসেবিও দা সিলভা ফেরেইরা। ২৫ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে পূর্ব আফ্রিকার জন্ম নেওয়া এই মানুষটি পরবর্তীতে ফুটবল দুনিয়ায় ‘কালো চিতা’ নামে পরিচিত হন।

মোজাম্বিকের মাপুতো শহরের ছেলে ইউসেবিওর বাবা লোরিন্দো অ্যান্টনিও দা সিলভা ফেরেইরার ছিলেন অ্যাঙ্গোলিয়ান রেল শ্রমিক। এবং মা এলিসা বেনি ছিলেন আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ। তিনি তার ভাই বোনদের মধ্যে চতুর্থ ছিলেন। ফুটবলে ছিল ছেলেটির অদম্য আগ্রহ। বর্তমানে বিভিন্ন আফ্রিকান দল স্বাধীন ভাবে নিজ পতাকা, নিজ জার্সি জড়িয়ে মাঠে নামলেও যে সময়ে ইউসেবিও জন্মেছিলেন তখন মোজাম্বিক ছিল পর্তুগীজ একটি উপনিবেশ। তাই তিনি খেলেছেন পর্তুগালের হয়ে। কিন্তু সে খেলার সূচনা কেমন ছিল? ইউসেবিও ছেলেবেলায় ‘ওস ব্রাজিলেইরোস’ নামক ক্লাবে খেলতেন। ইউসেবিও সহ দলের সবাই ছিলেন ব্রাজিলের সমর্থক। শোনা যায় ওই ক্লাবের খেলোয়াড়রা একেকজন একেক ব্রাজিলীয় কিংবদন্তীর ছদ্মনাম ব্যবহার করে খেলতেন।

অর্থাভাবে ভোগা আফ্রিকান কিশোররা খবরের কাগজ গোল করে মোজার ভিতর ঢুকিয়ে সেটাকেই ব্যবহার করতেন বল হিসেবে। একটু বড় ইউসেবিও ট্রায়াল দিতে গেলেন ‘গ্রুপো দেস্পোর্টিভো’ তে, বেনফিকার একটি ক্লাবে। সেখান থেকে ডাক না পেয়ে চলে যান ‘স্পোর্টিং দে লরেন্সো মার্কি’তে। ক্যারিয়ার সেরা সময়ের সম্পূর্ণটাই খেলেছেন পর্তুগালের বেনফিকা ক্লাবে। বেনফিকার হয়ে খেলা ১৫ বছরের ক্যারিয়ারে ৩০১টি ম্যাচে তিনি ৩১৭টি গোল করেছেন। এসময় ১০টি লিগ চ্যাম্পিয়নশিপস ও পাঁচটি পর্তুগিজ কাপ এবং ১৯৬২ সালে ইউরোপিয়ান কাপ জেতেন ইউসেবিও। বেনফিকার হয়েই তিনি ১৯৬২ ইউরপীয় বর্ষসেরা ফুটবলারের খেতাব অর্জন করেন। পর্তুগালের জাতীয় দলের হয়ে তিনি ১৯৬১ থেকে ১৯৭৩ সাল মাঠে নামেন। এ সময়ে মোট ৬৪টি খেলায় তিনি ৪১ গোল করেন।

১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে পর্তুগালের তৃতীয় স্থানে নেওয়ার পেছনে তার কৃতিত্ব কম ছিল না। এই আসরে তিনি ৬ ম্যচ খেলে ৯টি গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। ফরোয়ার্ডে হিসেবে খেলা ৫ ফুট ৯ ইঞ্চির ইউসেবিও তার গতির জন্য ‘কালো চিতা’ (ব্ল্যাক প্যান্থার) নামে পরিচিত হয়ে গেছেন ততদিনে। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে বিশেষভাবে স্মরণীয় উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে পর্তুগালের কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচটি। খেলায় ২৪ মিনিটের মধ্যে উত্তর কোরিয়া ৩-০ গোলে এগিয়ে যায়। এরপরও পর্তুগাল সে ম্যাচ জিতেছিল ৫-৩ গোলে, যার ৪টি গোল একাই করেছিলেন ইউসেবিও। ইংল্যান্ডের কাছে সেমিফাইনালে ২-১ গোলে হারের পর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে ২-১ গোলে হারিয়ে আসরে তৃতীয় হয় পর্তুগাল।

১৯৭৯ সালে ইউসেবিও পেশাদারী ফুটবল থেকে অবসর নেন। কিন্তু অবসর নিলেও ফুটবল অঙ্গনে তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার জনপ্রিয়তা, বিশেষত পর্তুগালে কতোটা ছিল তার একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। ইউরো ’১৬ ফাইনালের অতিরিক্ত সময়ের খেলা গড়িয়েছিল। ইনজুরির কারণে রোনালদো উঠে যাওয়ার পরও এডারের গোলে এগিয়ে পর্তুগাল। গ্রিয়েজম্যানদের প্রাণপণ চেষ্টায়ও ম্যাচে ফিরতে পারেনি ফ্রান্স। নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মত আন্তর্জাতিক শিরোপার স্বাদ পেয়েছিল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। সহকারী কোচ ইলিদিও ভালে, বন্ধু ফার্নান্দো সান্তোসকে জড়িয়ে ধরে আকাশের দিকে ইশারা করে শুধু একটি কথাই বলেছিলেন, “ইউসেবিও, ইউসেবিও!”

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker