খেলাহোমপেজ স্লাইড ছবি

অ্যাশেজ সিরিজ কিংবা ইংল্যান্ড- অস্ট্রেলিয়ার ধ্রুপদী যুদ্ধ

মঞ্জুর দেওয়ান: অ্যাশেজ! বাংলা অর্থ ছাই কিংবা ভস্ম হলেও এটি মূলত একটি ক্রিকেট সিরিজের নাম। টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে প্রাচীনতম প্রতিযোগিতা। যে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। সাদা পোশাকের ক্রিকেটকে যারা নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। সীমিত ওভারের ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকলেও অ্যাশেজের সামনে যেনো সবকিছুই লাপাত্তা হয়ে যায়! সূচনালগ্ন থেকেই অ্যাশেজের আবেদন ছিলো অন্য সবকিছুর চেয়ে ভিন্ন। আদি থেকে বর্তমান, পরতে পরতে রঙ ছড়ায় ইংল্যান্ড- অস্ট্রেলিয়ার এই ধ্রুপদী যুদ্ধ।

বর্তমানে টেস্ট ক্রিকেটকে ম্যাড়মেড়ে, উত্তেজনাহীন লড়াই বলে থাকেন অনেকে। কিন্তু অ্যাশেজ সিরিজের কথা শুনলেই তাদের মতবাদ পাল্টে যায়। দেড় শতক ধরে চলা কোনো দ্বৈরথকে ম্যাড়মেড়ে বলা অন্যায় হবে বৈকি! ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টির যুগে সাদা পোশাকের কদর কমলেও অ্যাশেজের বেলায় তা পুরো ভিন্ন। ক্রিকেটের অভিজাত সংস্করণকে জনপ্রিয় করে রাখার গুরুদায়িত্ব নিয়ে রেখেছে অ্যাশেজ! ক্রিকেটের নবীন দর্শকরাও ওয়ানডে-টি টোয়েন্টি ভুলে টিভি পর্দায় খুঁজতে থাকেন সাদা পোশাকের স্নায়ুযুদ্ধ!

১৬ সেন্টিমিটার সিরামিকের এক ট্রফির গল্প শুরু হয়েছিলো আজ থেকে ১৪২ বছর আগে। বর্তমানে যে ট্রফি নিয়ে এতো মাতামাতি। তার শুরুটা মোটেও সুখকর ছিলোনা। অ্যাশেজ সিরিজের নামকরণ-ই করা হয়েছিলো বিদ্রুপাত্মকভাবে। শোকের প্রতীকীরূপে। যার শুরু হয়েছিলো ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর আগে। ১৮৭৭ সালে মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হয়েছিলো অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড। ধরাবাধা কোনো নিয়মের বালাই না থাকা টেস্টটি ছিলো ইতিহাসে প্রথম টেস্ট। ইতিহাসের প্রথম টেস্টটি ৪৫ রানে জিতে নিয়েছিলো অস্ট্রেলিয়া। মূলত সেখান থেকেই দুই দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়।

১৮৮২ সালে ক্রিকেটে নতুন কিছু নিয়ম চালু করে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। শুরুর দিকে যেখানে ঘণ্টা কিংবা দিনক্ষণের বালাই ছিলোনা, সেখানে নতুন নিয়ম চালু করা হয়। তিনদিনের টেস্ট ম্যাচ খেলার সিদ্ধান্ত হয়। ১৮৮২ সালের ২৮ আগষ্ট ইংল্যান্ডের ওভালে এক ম্যাচের সিরিজ খেলতে নামে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঠাসা ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার দেয়া ৮৫ রানের টার্গেটও দুঃসাধ্য হয়ে যায় ইংল্যান্ডের সামনে। ফ্রেড স্পোফর্থের আগুনে বোলিংয়ে পুড়ে যায় ইংলিশদের ইনিংস। ৪৪ রানে ৭ উইকেট নিয়ে ঘরের মাঠে শক্তিশালী ইংল্যান্ডকে হারের লজ্জা দেয় স্পোফর্থ।

ঐতিহাসিক সেই ম্যাচে হারের পর ইংল্যান্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ‘দ্যা স্পোর্টিং টাইমস’ ইংলিশ ক্রিকেটকে ভস্মীভূত করার কথা উল্লেখ করে। ইংলিশ ক্রিকেট ভস্মীভূত হয়েছে আর ছাইগুলো সব অস্ট্রেলিয়াকে দিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এরপর ১৮৮২-৮৩ সালে অ্যাশেজ পুনরুদ্ধারের সফর শুরু হয় ইংরেজদের। তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্ট অস্ট্রেলিয়া জিতলেও পরবর্তী দুই টেস্ট ইংল্যান্ড বিজয়ী হয়। উল্লেখ্য, ঐ সফরে মেলবোর্নের একদল নারী তৎকালীন ইংল্যান্ড অধিনায়ক আইভো ব্লাইকে ছোট্ট ভস্ম স্তুপাকারে দেয়। পাত্রের ছাই ছিলো ক্রিকেটের অন্যতম উপকরণ বেইলের। অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটের ছাই হিসেবে যা ইংল্যান্ড অধিনায়ক ব্লাইকে দেয়া হয়েছিলো। তারপর থেকে অ্যাশেজ আরোও রাজসিক হয়ে উঠে।

অভিজাত ক্রিকেটের অভিজাত সিরিজে নিজেদের আলাদাভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন বেশ কজন মহারথী। যার মধ্যে দুজন ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে সবার উপরে। অ্যাশেজ সিরিজে সর্বোচ্চ রানের মালিক স্যার ডোনাল্ড ব্র‍্যাডমান। মাত্র ৩৭ টেস্ট খেলে ১৯ সেঞ্চুরিতে তার মোট রান ৫০২৮! টেস্ট ক্রিকেটে একটি নির্দিষ্ট দলের বিপক্ষে যা সর্বোচ্চ। ১৯৩০ সালের অ্যাশেজে ৯৭৪ রান ছিলো এক টেস্ট সিরিজে সর্বোচ্চ রান। নির্দিষ্ট একটি দলের বিপক্ষে সেঞ্চুরির রেকর্ডও তার দখলে।

সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীর তালিকায়ও অজিদের জয়জয়কার। অ্যাশেজে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীর তালিকায় থাকা প্রথম চারজনই অস্ট্রেলিয়ান। যেখানে সবার উপরের নাম শেন ওয়ার্ন। ৩৬ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তির উইকেট সংখ্যা ১৯৫। একটি নির্দিষ্ট দলের বিপক্ষেও সমান উজ্জ্বল এই স্পিন কিংবদন্তি। অ্যাশেজে সবচেয়ে বেশি (চারবার) দশ উইকেট নিয়েছেন।

কালের পরিক্রমায় ক্রিকেটে বিভিন্ন নিয়মের সংযোজন হয়েছে। কিন্তু অ্যাশেজ তার আবেদন হারায়নি বিন্দুমাত্র। সম্প্রতি এজবাস্টন টেস্ট দিয়ে অ্যাশেজের ৭১ তম সিরিজ মাঠে গড়িয়েছে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের ম্যাচ দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে নতুনত্ব এসেছে। এই ম্যাচ দিয়ে ক্রিকেটের লংগার ভার্সনে প্রথমবারের মতো সাদা জার্সিতে নাম ও নম্বর যুক্ত হয়েছে। এছাড়া ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া দ্বৈরথ দিয়ে মাঠে গড়াচ্ছে আইসিসি টেস্ট বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker