খেলাহোমপেজ স্লাইড ছবি

ম্যারাডোনার ইতালি বিশ্বকাপ কড়চা

মিরাজুল ইসলাম:  ৯০- এর বিশ্বকাপে একটি পোস্টার আমার খুব প্রিয় ছিলো। ছবিতে ডিয়াগো ম্যারাডোনা খোঁচা খোঁচা দাড়িতে গম্ভীর চেহারায় বাম পায়ে বল ড্রিবলিং করছেন। সেটা রাশিয়ার সাথে ম্যাচের একটি মুহূর্তের ছবি। ততদিনে উদ্বোধনী ম্যাচে ক্যামেরুনের সাথে হেরে ‘৮৬র মহানায়ক ব্যাকফুটে। সেই সূত্রে রাশিয়ার সাথে গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচটি ছিল অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ।

মজার ব্যাপার ১৩ জুন ১৯৯০ সালে রাশিয়ার সাথে গ্রুপ পর্বের ঐ ম্যাচে ম্যারাডোনা’র হাত দলকে রক্ষা করেছিলো আরেকবার। অবশ্য সেই ক্ষেত্রে গোল দিতে নয়, গোল বাঁচাতে। গোল বারের সামনে রুশ আলেইনিকভের নিশ্চিত হেড হাত দিয়ে ঠেকান ডিয়াগো। এবং আশ্চর্যজনকভাবে তা সুইডিশ রেফারীর নজর এড়িয়ে যায়। খেলা শুরু হবার পনের মিনিটের মধ্যে নিয়মিত গোলরক্ষক পম্পিদু বিশ্রীভাবে পা ভেঙ্গে আহত হয়ে মাঠ ত্যাগ করলে পুরো আর্জেন্টিনা টিম নার্ভাস হয়ে পড়ে। এর সাথে ক্রমাগত ট্যাকনিক্যাল ফাউলের শিকার হচ্ছিলেন ম্যারাডোনা ও ক্যানিজিয়া।

যা রেফারী ধরতে পারছিলেন না। সহজাত খেলার সুযোগ পাচ্ছিলেন না ডিয়াগো। অবশেষে প্রথমার্ধে ট্রগলিয়া ও দ্বিতীয়ার্ধে বুরুচাগা’র গোলে জিতে আর্জেন্টিনা। ম্যারাডোনা ম্যাচ শেষে স্বীকার করেন এটা তিনি দলকে বাঁচাতে ইচ্ছাকৃতভাবেই করেছেন এবং আশা করেছিলেন রেফারী তাঁকে শাস্তি দেবেন। যদিও পুরো স্টেডিয়াম সমর্থন দেয় ম্যারাডোনা’র আর্জেন্টিনাকে। কারন খেলাটা হয়েছিলো তাঁর নিজ ক্লাব নেপোলি’র মাঠে। যেখানে সবাই তাঁকে ঈশ্বর জ্ঞান করতেন।

ক্যামেরুনের বিপক্ষে পরাজয়ের পর আর্জেন্টিনা ফুটবল টিমকে তুলাধূনা করা শুরু করে দিয়েছিলেন ’৭৮ বিশ্বকাপ জয়ী কোচ ও বার্সেলোনায় ম্যারাডোনার ফুটবল গুরু সিজার লুই মেনেত্তি। কার্লোস বিলার্ডো’র খেলার ধরণ, প্লেয়ার সিলেকশন কিছুই তাঁর পছন্দ হচ্ছিলো না। বিলার্ডো’র সমালোচনায় আরো যোগ দেন ’৮৬ বিশ্বকাপ জয়ী ইনফর্ম প্লেয়ার ভালদানো। যাকে কোচ ইচ্ছে করে দলে রাখেন নি। খেলায় তার ছাপ পড়তে শুরু করেছিলো ম্যারাডোনা’র ভিতরেও।

পরবর্তী রাউন্ডে ব্রাজিলের বিপক্ষে খেলার আগে ম্যারাডোনা অগোছালো হয়ে পড়লেন। ‘৮৬র সেই স্পিরিট নেই বললেই চলে। প্র্যাকটিসে ঠিক মতো আসেন না। বিলার্ডো মুখ বুঁজে সহ্য করেন। রাশিয়ার বিপক্ষে হাত দিয়ে গোল বাঁচানোর ইস্যু নিয়ে বুয়েন্স আয়ার্সের পত্রিকায় ব্যঙ্গ কার্টুন বের হয়েছিলো।

ওদিকে নতুন প্লেয়াররা ম্যারাডোনার খেলার ধরনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না। এর আগে ’৮৬ তে মেক্সিকো যাবার আগে পুরো টিম প্রায় দুই মাস এক সাথে নিবিড় অনুশীলন করেছিলো। এবার ঠিক সে রকম হচ্ছে না। কিন্তু ব্রাজিলের সাথে মাঠে নেমে ম্যারাডোনার চেহারা পাল্টে গেলো। সেই সাথে ভাগ্য সহায় হলো। একের পর এক গোল মিস করতে থাকলেন ডুঙ্গা, ক্যারেকা, অ্যালেমাও। পুরো খেলায় ম্যারাডোনা একটা মাত্র ‘সলিড চান্স’ পেলেন। তিনজন ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডারের পায়ের ফাঁক দিয়ে নির্ভুল পাসে বল পাঠালেন ক্যানিজিয়ার কাছে। এবং গোল। ব্রাজিল আউট। আর্জেন্টিনা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে গেলো কোয়ার্টার ফাইনালে।

আবার চাঙ্গা হয়ে উঠলেন ডিয়াগো। মনের মধ্যে উঁকি দিলো আবার গোল্ডেন বুট পাবার স্বপ্ন। এর আগের বিশ্বকাপে পাওয়া পুরস্কারটি নেপোলি’র এক লকারের ভল্ট থেকে চুরি হয়ে গিয়েছিলো। ইতালী পুলিশ চোর ধরতে পারলেও সোনার বুট ফেরত দিতে পারে নি। চোর নাকি সোনা গলিয়ে বুটের রেপ্লিকাটিকে বলের মতো গোল বানিয়ে মূল সৌন্দর্যই নষ্ট করে ফেলেছিলো। সে যাই হোক। যুগোশ্লাভিয়া’কে কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকারে হারালো আর্জেন্টিনা। দলের নায়ক হলেন বদলী গোলকিপার গোইকোচিয়া, যাকে বিলার্ডো বাদ দিতে চেয়েছিলেন। গোইকোচিয়া দুর্দান্ত সেভ না করলে ম্যারাডোনা ভিলেন বনে যেতে পারতেন। কারন আর্জেন্টিনার পক্ষে টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস করেছিলেন তিনি। এরপর যখন সেমিফাইনালে স্বাগতিক ইতালীর বিপক্ষে আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হলো তখন ঘটতে থাকে একের পর এক ঘটনা। যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব ম্যারাডোনার ভবিষ্যত ক্যারিয়ারে গভীর ছাপ ফেলে।

নেপোলির নাগরিকদের ইতালিয়ানরা মানুষ বলেই গণ্য করে না। নেপোলি’র জনগনের উচিত আর্জেন্টিনা’কে সাপোর্ট করা।’ – ম্যারাডোনার এই মন্তব্যে পুরো ইতালিয়ান মিডিয়া শত্রু বনে গেলো। এটা ঠিক উত্তরের মিলান-তুরিনের ধনী এলাকার লোকজন দক্ষিণের নেপলস আর কাম্পানিয়ার মানুষদের চাষা ও মাফিয়া হিসেবে তাচ্ছিল্য করে সব সময়। ছয় বছর নেপোলি’তে খেলার কারনে ম্যারাডোনা তাদের আঞ্চলিক সংঘাতের হাঁড়ির খবর জানতেন। খোদ নেপোলি সাময়িকভাবে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়লো। অবশ্য শেষ পর্যন্ত নেপোলি’র সমর্থক গোষ্ঠি তাদের প্রিয় পেলুসা ডিয়াগো’র সাফল্য কামনা করলেও খেলার মাঠে নিজ দেশের পক্ষেই সমর্থন দেবে বলে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিলো।

এক দিকে তাদের নিজ শহরের ক্লাবকে সিরি-আ’তে তিনবার চ্যাম্পিয়ন করা ম্যারাডোনা, অন্য দিকে জন্মভূমির জাতীয় দল। এই রকম দোটানায় নেপলসবাসীরা আর কখনো পড়ে নাই। কিন্তু ভাগ্য শেষ হাসি হাসলো আর্জেন্টিনার পক্ষে।আবারো গোইকোচিয়া টাইব্রেকারে দলকে জেতালেন। এবার আর পেনাল্টি মিস করেন নি ম্যারাডোনা। গোলরক্ষক জেঙ্গা’কে আলতো ফ্লিক শটে পরাস্ত করে ক্যামেরার সামনে এমনভাবে খুশীতে লাফাতে থাকলেন তা দেখে ইতালিয়ানদের পিত্তি জ্বলে গেলো। পুরো গ্যালারী ম্যারাডোনার বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়া শুরু করলো। যদিও আবার প্রমাণিত হলো নেপোলি’র মাঠ ম্যারাডোনার জন্য বিশেষ কিছু।nএরপর নেপোলিবাসীরা সেই ৩ জুলাইয়ের রাত থেকে মনে মনে ম্যারাডোনাকে বিসর্জন দেবার পণ করলেন যেন। জাতীয়তাবাদী শক্তির কাছে ম্যারাডোনা ম্যাজিকের আবেগ তখন তুচ্ছ।

ম্যারাডোনা নিজেও ইতালিয়ানদের আচরণে পুরোদস্তুর ক্ষেপে গেলেন। কারন ইতালী মিডিয়া ফাইনালের আগে জার্মানী দলের পক্ষে প্রচারণা চালাতে লাগলো। এর মধ্যে ম্যারাডোনা ও তাঁর ছোট ভাই লালো দুইজন মিলে ইতালিয়ান পুলিশকে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠালেন। কারন লালো’কে নাকি সেই দুইজন পুলিশ অপমান করেছিলো। কোচ বিলার্ডো’র হস্তক্ষেপে ফাইনালের আগে জেলে যেতে হয় নি ম্যারাডোনা’কে। কিন্তু ম্যারাডোনা সাংবাদিক সম্মেলন করে পুরো বিশ্বকে জানিয়ে দিলেন, ‘আর্জেন্টিনা যেন চ্যাম্পিয়ন হতে না পারে, সেজন্য ইতালী ষড়যন্ত্র করছে।’ মজার ব্যাপার আর্জেন্টিনা’র মিডিয়া ম্যারাডোনার কথাটা বিশ্বাস করে তাঁর পক্ষে সাফাই দেয়।

১৯৯০ সালের বিরক্তিকর ফাইনাল ম্যাচে ক্লিন্সম্যানকে ফাউল করার দায়ে ব্রেহমা’র দেয়া পেনাল্টি গোলে বেকেনবাউয়ারের অধীনে পশ্চিম জার্মানী বিশ্বকাপ জিতে নেয়। আর্জেন্টিনা’কে খেলতে হয়েছিলো তাদের চারজন নিয়মিত সদস্য গুইস্তা, ওলার্তোকোইচিয়া, বাতিস্তা ও ক্যানিজিয়া’কে ছাড়া। এছাড়াও ম্যাক্সিকান রেফারী কোদেসাল দুইজন ইনফর্ম আর্জেন্টাইনকে লাল কার্ড দেখান। ম্যাচ শেষে স্পষ্টভাষী ডিয়াগো ম্যারাডোনা সাংবাদিকদের বললেন,
‘পুরস্কার নেবার সময় আমি কাঁদছিলাম। বিলার্দো আর বাতিস্তা আমাকে আড়াল করা চেষ্টা করছিলো, কিন্তু আমি চোখের পানি লুকাতে চাই নি। কেন লুকাবো? ষড়যন্ত্র করে আমাদের হারিয়ে দেয়া হয়েছে। বুচয়ার্ল্ড আমাকে বারবার ফাউল করছিলো। হাফ টাইমে রেফারী কোদেসালের কাছে গিয়ে বললাম, আপনি কার্ডগুলো বাসায় ফেলে এসেছেন? উনি জবাব দিলেন, না, আমার সাথেই আছে। সময় হলেই তা বের করবো। এবং তা উনি ঠিক বের করে দেখালেন আমাদের।খেলোয়াড়দের বের করে দেবার জন্য। তখনই বুঝে গেলাম উনি কাদের পক্ষে মাঠে নেমেছেন। যে পেনাল্টি থেকে ব্রেহমা গোল দিলো সেই পেনাল্টিটাই অন্যায্য। জানেন, কোদেসালের এই ম্যাচে রেফারী হবার কথা ছিল না, তার শ্বশুর ফিফা’র রেফারী কমিটিতে আছে। এই জোচ্চুরি আমি সহ্য করতে পারি নি। এজন্য ফিফা’র প্রেসিডেন্ট হ্যাভেলাঞ্জের সাথে আমি হ্যান্ডশেক পর্যন্ত করিনি।’

একেই বলে ম্যারাডোনা। ফুটবলীয় বিনোদন বিলিয়ে গেছেন মাঠের ভিতরে-বাইরে সর্বত্র। কোন কিছুর সাথে আপোষ করেন নি।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker