প্রযুক্তিহোমপেজ স্লাইড ছবি

ডার্ক ওয়েব: রহস্যের এক অন্য নাম!

আবু জাফর সাদিক: আমাদের মত জনসাধারণের মনে ডার্ক ওয়েব নিয়ে এক প্রবল আগ্রহ বা কৌতুহলের যেন শেষ নেই। আর এই কৌতুহলকে আরও শতগুণে রহস্যমণ্ডিত করে তুলেছে এনিয়ে বহুল প্রচলিত কিছু ভুল এবং অতিরঞ্জিত তথ্য। যেহেতু গুজব, গোপন খবর বা অতিরঞ্জিত তথ্যে মানুষের আগ্রহ সবসময়ই বেশি থাকে, তাই এই আগ্রহকে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোও এই টপিকের উপর সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে খবর ছাপিয়েছে অগণিত। ইন্টারনেটে সার্চ দিলে মিথ্যা এবং অতিরঞ্জিত খবরের ভিড়ে আসল তথ্য পাওয়াটাই কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে এই ধোঁয়াশাটা আরও বেশি বেড়ে যায় কিছুদিন আগে “ব্লু-হোয়েল” নামক এক গেমের জন্য। যার ফলে অনেকেই রিসার্চ শুরু করে “ডার্ক ওয়েব” সম্পর্কে। আর তাই আজ আমরা এসেছি আপনার রিসার্চের সহযোগী হতে।প্রথমেই আমাদের জানা উচিৎ এই ডার্ক নেট বা ডার্ক ওয়েবটা আসলে কী?

এটা আসলে পাবলিক ইন্টারনেট ব্যবহারকারী হতে এক ধরণের গোপন বা লুকায়িত নেটওয়ার্ক। আমরা সাধারণত যেসব ব্রাউজার ব্যবহার করে থাকি, যেমনঃ মজিলা ফায়ারফক্স, গুগল ক্রোম, অপেরা ইত্যাদি এসব ব্রাউজার দিয়ে ডার্ক ওয়েবে ভিজিট করা সম্ভব নয়। এতে প্রবেশ করতে নির্দিষ্ট সফটওয়্যার, কনফিগারেশন বা অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। ডার্ক ওয়েব মূলত ডিপ ওয়েবের একটি অংশ। এই অংশে সাধারণ সার্চ ইঞ্জিন প্রবেশ করতে পারে না।
দিন দিন আমরা সম্পূর্ণ ইন্টারনেট নির্ভর হয়ে পড়ছি। কারণ ইন্টারনেট হল তথ্যের এক সুবিশাল সম্ভার। যেকোন তথ্যের প্রয়োজন হলেই আমরা ইন্টারনেট বা সার্চ ইঞ্জিনের সাহায্য নিই। আর সার্চ ইঞ্জিনের নাম বলতে গেলেই শুরুতেই যে নাম গুলো চলে আসে তারমধ্যে অন্যতম হল গুগল, ইয়াহু, বিং ইত্যাদি। বিশেষ করে গুগল এর নাম বলতেই হবে, যা এখন বিশ্বব্যাপী অন্যতম এক বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। আমরা গুগল ছাড়া এক মূহুর্তও চিন্তা করতে পারি না। কিন্তু এই গুগলের সামর্থ্যই বা কতটুকু?

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল, যখনই আমরা কোন তথ্যের জন্য সার্চ দিই, তখনই সে সেকেন্ডের মধ্যে লক্ষ লক্ষ ফলাফল এনে হাজির করে। আর এটা, ইন্টারনেটে থাকা মোট তথ্যের ১০ শতাংশ। জ্বী, হ্যাঁ…! মাত্র ১০ শতাংশ। বাকি ৯০ শতাংশ লুকায়িত আছে ডার্ক ওয়েব বা ব্ল্যাক ওয়েব বা ডিপ ওয়েব নামক এক অদৃশ্য ওয়েবে।

ডার্ক ওয়েব সম্পর্কে বহুল প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
ডার্ক ওয়েব সম্পর্কে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল হল, আমরা অনেকেই ডিপ ওয়েব আর ডার্ক ওয়েবকে এক করে ফেলি। কিন্তু এই দু’টো মোটেও এক না। এটা অনেকটা “সকল ক্ষারই ক্ষারক, কিন্তু সকল ক্ষারকই ক্ষার না” ধরণের। সকল ডার্ক ওয়েব ডিপ ওয়েবের অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু ডিপ ওয়েব মানেই ডার্ক ওয়েব না। আপনার কি কখনও মনে হয়, আপনি ডিপ ওয়েব ব্রাউজ করেছেন? চলুন একটু দেখে আসি। আপনার জিমেইলে বা অন্য কোন মেইল অ্যাকাউন্ট থাকলে সেটা খুলুন। ইউজার নেম, পাসওয়ার্ড দিন। ব্যস! আপনি ঢুকে গেলেন ডিপ ওয়েবে!! আশাহত হলেন? হওয়াটাই স্বাভাবিক।
এত্তো জল্পনা-কল্পনা, রহস্যে ঘেরা একটা বিষয় হঠাৎ এতটাই সিম্পল প্রমাণিত হলে এমনই হয়। আসলে এতোটাই সিম্পল এই ডিপ ওয়েব। সার্চ ইঞ্জিন যে পেজ বা পেজের অংশগুলো সার্চ রেজাল্টে দেখাতে পারে না, সেগুলা সবই এই ডিপ ওয়েবের অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণ স্বরুপ বলা যেতে পারে, আপনার মেইল অ্যাকাউন্ট, গুগল ড্রাইভ বা কোন ক্লাউড অ্যাকাউন্ট বা স্টোরেজ, ফেসবুকে অনলি মি করে রাখা ফ্রেন্ডলিস্ট, ফটো বা পোস্ট ইত্যাদি সবই এই ডিপ ওয়েবেরই একটা অংশ।
অন্যতম কিছু গুজব হল “ডার্ক ওয়েবে ঢুকলেই আপনার তথ্য অমুক তমুকের কাছে চলে যাবে”, “আপনাকে ট্র্যাক করা হবে”, “ঢুকলে বেরোতে পারবেন না কাজ শেষ করার আগ পর্যন্ত”, “আপনার ছবি এবং ব্যক্তিগত তথ্য চলে যাবে এডমিনের কাছে” ইত্যাদি। বিশেষ করে এই ধরণের গুজব গুলো বেশি করে ছড়ানো শুরু হয়েছে কিছুদিন আগে ব্লু হোয়েল গেমকে কেন্দ্র করে। যেগুলো সম্পূর্ণই রটানো বা অপপ্রচার।

কী ধরণের সেবা পাওয়া যায় এখানে
সহজ ভাষাতে বলতে গেলে ডার্ক ওয়েবের মানে হচ্ছে ইন্টারনেটের অন্ধকার জগত বা ইন্টারনেটের কালো জগত। ডার্ক ওয়েবের মধ্যে পৃথিবীর যত খারাপ কাজগুলো আছে সবকিছু হয়ে থাকে। যেমন- স্মাগলিং থেকে শুরু করে কাউকে মার্ডার করার জন্য কিলার বা শুটার ভাড়া করা অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচা করা, হ্যাকিং, ব্যাংক লুট, জালিয়াতি, ফিশিং বা স্ক্যাম, শিশু পর্নোগ্রাফি, বড় ধরণের কোন অবৈধ কাজের ডিলিং পর্যন্ত যত অবৈধ কাজগুলো আছে সবকিছুই মূলত ডার্ক ওয়েবের মধ্যে হয়ে থাকে। এবং যারা ডার্ক ওয়েব ইউজার তারা প্রত্যেকে তাদের নিজের পরিচয় গোপন রেখে ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে।
সাধারণ সার্ফেস ওয়েব বা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব থেকে অনেক অনেক গুণ নিরাপদ তাই নিরাপত্তার খাতিরে ডার্ক ওয়েবকেই বেছে নেয় ভয়ংকর অপরাধীরা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। তাই বলে কি এসব অবৈধ কাজ যারা করে তাদের ধরা যায় না? হুম, ধরা যায়। যেহেতু, ডার্ক ওয়েব অপরাধীদের আখড়া; তাই গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরাও এই জায়গাতেই ওঁত পেতে থাকে অপরাধী ধরার জন্য। ফলে নিরাপত্তায় ন্যূনতম ঘাটতি থাকলেই অপরাধী ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা এখানেই বেশি। পরিশেষে একটা কথাই বলতে চাই, ইন্টারনেট হল জ্ঞানের সাগর। নাহ, সাগর বললে ভুল হবে। আসলে বলা উচিৎ মহাসাগর। এই ইন্টারনেট ব্যবহার করে যেমন আপনি অনৈতিক কোন কাজে জড়িয়ে পড়তে পারেন ঠিক তেমনি পারেন ভাল কাজে সময় ব্যয় করে নিজের জ্ঞানের ভাণ্ডার বাড়াতে। যেটা সম্পূর্ণই নির্ভর করছে আপনার উপর।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker