প্রযুক্তি

ইউটিউব এবং একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত এর গল্প

আবু জাফর সাদিক: ইউটিউব; ভিডিও শেয়ারিং এর অন্যতম এক বিশাল ওয়েব সাইট। অনেকেই আছে যারা ঘন্টার পর ঘন্টা সময় ব্যয় করে ফেলে শুধু এই সাইটেই। কোন প্রকার ঝামেলা মুক্ত এবং সহজ মাধ্যম হওয়াই খুব দ্রুতই জায়গা করে নিয়েছে মানুষের মনে। এটা এখন এতটাই জনপ্রিয় যে, আজকাল বিজ্ঞাপন, নাটক কিংবা ডকুমেন্টরি গুলো শুধু টেলিভিশন কেন্দ্রিকই তৈরি হয়না ; বরং, ইউটিউব কেন্দ্রিক হতে শুরু করেছে দিনকে দিন। শুধু তাই নয়, এই ইউটিউবকেই ব্যবহার করে অনেক ফ্রিল্যান্সার আয় করে ফেলছে প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকা। কিন্তু আমরা কি কখনও একবারের জন্য ভেবে দেখেছি “কারা এই সাইটের নির্মাতা বা আবিষ্কারক? কিংবা এটাও কি কখনও কল্পনা করতে পেরেছি যে, “একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভুতও রয়েছেন এই তালিকায়?” কে এই বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত? কী…? অবাক হচ্ছেন?? আসুন আমরা জানি তাঁর সম্পর্কে।

তিনজন ব্যক্তির অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল হল এই ইউটিউব। তাঁরা হলেন Chad Hurley, Steve Chen এবং Jawed Karim. এতক্ষণে হয়ত নামগুলো দেখে ঠিক ধরেই ফেলেছেন কে হতে পারে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত কিংবা আজকের আলোচনার মূল নায়ক। জ্বী, হ্যাঁ। ঠিক তাই। তিনি হলেন, Jawed Karim / জাভেদ করিম।
১৯৭৯ সালের ২৮ অক্টোবর পূর্ব জার্মানিতে জন্মগ্রহণ করেন এই তারকা। ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত সেখানেই বেড়ে উঠেন তিনি। জাভেদ করিমের বাবার নাম হল, “নাইমুল করিম” একজন বাংলাদেশি এবং মায়ের নাম হল “ক্রিস্টিনা করিম” একজন জার্মান। তাঁরা উভয়েই ছিলেন গবেষক। ১৯৯২ সালে নাঈমুল করিম স্বপরিবারে পাড়ি জমান আমেরিকায়।

জাভেদের বেড়ে ওঠা
জাভেদ আমেরিকাতেই তাঁর পড়াশোনা শুরু করেন। স্নাতক কোর্স চলাকালীন পড়াশোনার পাশাপাশি পেপালে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

ইউটিউবের গল্প
পেপালে কাজ করা অবস্থায় জাভেদ করিমের দেখা হয় বাকি দু’জন অর্থাৎ, “চ্যাড হার্লি ও স্টিভ চেন” এর সাথে। তাঁরাও তখন একই সাথে পেপালে কাজ করতেন। ধীরে ধীরে এই তিনজনের মাঝে গড়ে উঠে গভীর বন্ধুত্ব। স্টিভ ছিলেন একজন কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্র। আর, হার্লি মূলত ছিলেন একজন ডিজাইনার। তিনজনই নতুন কিছু করতে চাইতেন। একে অপরের সাথে নিজেদের সুখ-দূঃখ, পরিকল্পনা গুলো ভাগ করে নিতেন। কিন্তু এরমাঝে পারস্পরিক যোগাযোগের অভাবে কিছুদিন ভাঁটা পড়ে তাঁদের পরিকল্পনায়। এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে বিলম্ব হয় প্রায় এক বছর। কিন্তু, না। এভাবে তো আর চলতে দেওয়া যায়না। তাই তাঁরা একসাথে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত নেন। পরিকল্পনাকে বাস্তবে রুপ দিতে এবার তাঁরা নড়ে-চড়ে বসেন। আলোচনার জন্য স্থান নির্ধারণ করা হল সান ফ্রান্সিস্কোতে স্টিভ চেনের বাসায়। রাতের খাবারের সময় সিদ্ধান্ত নেয়া হল ইউটিউব সাইটটি তৈরি করার। অনলাইনে প্রচুর সাইট থাকলেও ভিডিও শেয়ার করার মত তেমন উল্লেখযোগ্য সাইট নেই। এজন্য ভিডিও শেয়ারিং সাইটের সম্ভাবনা যাচাই করে একটি ভিডিও শেয়ারিং সাইট তৈরির সিদ্ধান্ত হল। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৫, তাঁরা তিনজন মিলে YouTube ডোমেইনটি নিবন্ধন করেন। ডোমেইন নাম নিবন্ধনের পর তিন তরুণ প্রকৌশলী হাত লাগালেন সাইট ডিজাইনের কাজে। কয়েক মাসের অক্লান্ত পরিশ্রমে দাঁড় করে ফেললেন সুন্দর একটি সাইট। আরও একটি তথ্য যেটা জেনে অনেকের ভাল লাগবে তা হল, ইউটিউবে সর্বপ্রথম আপলোড করা ভিডিওটি ছিল কিন্তু জাভেদ করিমেরই। এপ্রিল ২৩, ২০০৫ এ আপলোড করা “Me at the zoo” নামক ১৮ সেকেন্ডের ভিডিও। চাইলে এখনই দেখে আসতে পারেন ইউটিউব থেকে।

জাভেদ করিম ও আমরা
কম্পিউটার ও ইন্টারনেটকে সঠিক উপায়ে ব্যবহার করে তিনি নিজেকে বানিয়েছেন হাজারো তরুণের পথিকৃৎ। শুধু তাই নয়, ২০০৮ সালের মার্চে নতুন এক উদ্যোগ নিয়ে মাঠে নামেন জাভেদ। তার নাম ইউ-নিভার্সিটি। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনো উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক চিন্তা বাস্তবায়নে সাহায্য করা হয়। অথচ আমরা? আমাদের কাছে কম্পিউটার, ইন্টারনেট সহজলভ্য হলেও তার কতটুকুই বা করতে পেরেছি এতদিনে? ফেসবুক বা ইউটিউবে একবার জাস্ট ঢুঁ দিতে এসে কিভাবে কিভাবে যেন ঘন্টার পর ঘন্টা সময় নষ্ট করে ফেলি তার ইয়ত্তা নেই। অথচ শিক্ষামূলক লাখো ভিডিও রয়েছে শুধু এই ইউটিউবেই। তার থেকে কতটুকুই বা উপকৃত হতে পেরেছি?

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker