দৈনিক ভালো খবরপ্রযুক্তিহোমপেজ স্লাইড ছবি

টাইম ট্রাভেল করে অতীতে যাওয়া যায়?

এনামুল সাদিক: টাইম ট্রাভেল করে অতীতে যাওয়া যায়? টাইম ট্রাভেল বা সময় পরিভ্রমণ সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ বা কল্পনার শেষ নাই। বিজ্ঞানের সবচেয়ে রহস্যময় বিষয়টি হলো টাইম ট্রাভেল। টাইম ট্রাভেল বলতে দুটি বিষয়কে বুঝি। সময় পরিভ্রমণ করে অতীতে ফিরে যাওয়া। সময় পরিভ্রমণ করে ভবিষ্যত ঘুরে আসা। তবে এটা কি সম্ভব?
তবে একটু বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা করে আসি। সহজ ভাষায় বুঝে আসি। আমরা আমাদের সারাটি জীবন একটি গণ্ডির ভেতরে পার করি, আর তা হল মাত্রা। মাত্র তিনটি মাত্রায় আমরা প্রতিটি বস্তুকণার অবস্থান নির্ণয় করতে পারি, এরা হল দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা। স্টিফেন হকিংস বলেন, “মনে করি, আমরা একটি দ্রুতগামী গাড়িতে চড়েছি, গাড়িটা যখন রাস্তার উপর থেকে সোজা চলে যায়, তখন এর বিচরণ ঘটে একটি মাত্রায়। গাড়িটি ডানে বা বামে গেলে এটি দ্বিতীয় মাত্রায় প্রবেশ করবে। এবার গাড়িটি যদি কোন আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তার ঢাল বেয়ে উপরে বা নিচে নামে তাহলে এটি আরও একটি মাত্রা অর্থাৎ তিনটি মাত্রাতেই চলাচল করল।“ তবে আরও একটি মাত্রা আছে যা আমরা দেখতে বা অনুভব করতে না পারলেও ঠিক ঠাক হিসেব কিন্তু ঠিকই করতে পারি! এটা হল সময়, চতুর্থ মাত্রা! সময় নদীর মত সবসময় সামনের দিকে এগিয়ে যায়।একে আজ পর্যন্ত কেউ বাঁকাতে, ধীর করতে বা বন্ধ করতে পারে নি। তবে তার মানে এই নয় যে সময়কে বশে আনা অসম্ভব! ধরলাম, সময়কে আটকাতে পারবো। এজন্য একটি টাইম মেশিন বানালাম। এবার আপনাকে আপনার অতীত সময়ে ঘুরে আসার জন্য পাঠাবো। যদি আপনাকে অতীত সময়ে পাঠাই, তাহলে প্যারাডক্স(paradox) থিওরিটিক্যাল ব্যাখ্যা কি হতে পারে?
এবার প্যারাডক্স থিওরিটিক্যাল অনুযায়ী ব্যাখ্যা প্রদান করলামঃ paradox শব্দটার বাংলা অর্থ হলো আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী। মানে কোনোকিছুর সম্ভাবনাকে বাতিল করে দেয়া।
হিটলার প্যারাডক্স: ধরেন,আপনাকে টাইম ট্রাভেলিং মেশিনে ঢুকিয়ে দিলাম। আপনি আঠারো শতকে চলে গেলেন। শিশু অবস্থায় হিটলারকে পেলেন। তারপর তাকে হত্যা করলেন। তাহলে তার কোনো ইতিহাস থাকবে? যেমন তিনি ইহুদি নিধন করে সারাবিশ্বে খলনায়ক হিসেবে পরিচিত। যেহেতু আপনি শিশু অবস্থায় হিটলারকে হত্যা করেছেন তাহলে হিটলার ইতিহাসের পাতায় আসলো কোথায় হতে? আর যদি ইতিহাসের পাতায় না থাকতো তবে হিটলার নামটি আপনি জানতেন না। সুতরাং হিটলারকে আপনি হত্যা করতে পারবেননা। হিটলার প্যারাডক্স অনুযায়ী আপনি অতীতেও যেতে পারবেন না।
বুট স্টেপ প্যারাডক্স: এই প্যারাডক্সে নির্দেশ করা হয় এমন কোনো এক আবিষ্কারকে যা অতীতে নিয়ে গেলে, কে আবিষ্কার করলো? কোথায় উৎপত্তি বা কোথায় হতে আসলো? প্রশ্নের সন্মুখীন করে ফেলে। আরো একটু সহজভাবে বলছি, ধরেন, আপনি টাইম ট্রাভেল মেশিনে ঢুকে অতীতে চলে গেলেন। কবি জীবনানন্দ দাশের শিশু বয়সে পেলেন। উনার ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি হাতে ধরিয়ে দিলেন। তিনি অবাক হয়ে আপনাকে বললেন,”এটা আবার কি?” আপনি হাসিমুখে জবাব দিলেন,”এটা আপনার লেখা কবিতা।” এবার ভাবুন,আপনি জীবনানন্দ দাশকে তার কবিতা দিলেন যা কবি নিজেই লেখেনি। তাহলে এটি কে লেখেছে? ধরে নিলাম আপনার দেয়া ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি হুবহু কপি করে জীবনানন্দ দাশ প্রকাশ করলেন। তাহলে আপনি কোথায় হতে এই কবিতাটি আনলেন? তার মানে অস্তিত্বহীন বা মালিকহীন কোনো বস্তু বা জ্ঞান বলে কিছু থাকতে পারেনা। তাই এই প্যারাডেক্সের মাধ্যমেও সময় ভ্রমণ সম্ভব না।
গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স: শিরোনামটি পড়েই হয়তো ভাবছেন,দাদাজানের আবার কি হলো? দাদাকে নিয়ে একটু থিওরিটিক্যাল ব্যাখ্যা করবো। গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্সকে অনেকে প্যারাডক্সের রাজা বলে। কারণ এই প্যারাডক্সে টাইম ট্রাভেল পুরোটা বাতিল হয়ে যায়। ধরেন,আপনি টাইম মেশিনে ঢুকে অতীতে চলে গেলেন। আপনার দাদাকে জন্মের পরপর হত্যা করলে। এবার ভেবে দেখেন,আপনার বাবা আসলেন কোথায় থেকে ? আর আপনার বাবা যদি না জন্মায় তবে আপনি জন্মালেন কোথা হতে?
অনেক আলোচনা করলাম। টাইম ট্রাভেলে অতীতে যাওয়া অসম্ভব ভেবে নিলেন। চলেন,আরো একটু এগিয়ে দেখি যাওয়া যায় কিনা! টাইম ট্রাভেলে একটি খুব প্রচলিত থিওরি হলো নভিকভের আত্নরক্ষার থিওরি। এই থিওরি অনুযায়ী সময় ভ্রমণ করে অতীতে গেলেও কেউ কোনো কাজের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারবেননা যেটা প্রকৃত বর্তমানকে প্রভাবিত করবে। ধরি, করিম নামের এক ব্যক্তি অতীতে গিয়ে তার ছোটবেলার শিশু অবস্থাকে হত্যা করার চেষ্টা করল। কিন্ত সেটা সে পারলো না। নিয়ম অনুযায়ী যদি সে তার শিশু অবস্থাকে হত্যা করে তার অস্তিত্ব অসম্ভব হয়ে যাবে। সে ছোটবেলায় যেখানে থাকতো সেখানে গিয়ে দেখবে হয়তো সে সেখানে নাই। অন্য কোনো পরিবারে বসবাস করছে। জগতেই তার অবস্থান পরিবর্তন করে দিয়েছে। এই থিওরি অনুযায়ী কেউ যতই চেষ্টা করুক না কেনো, এমন কাজ করতে পারবেনা যা প্রকৃত বর্তমানকে পরিবর্তন করবে। ম্যাসচুসেটস ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এর সেথ লরেড ও তার গবেষক দল নভিকভের থিওরির একটু বিস্তৃত বর্ণনা দিয়ে বলেন,” প্যারাডক্স পেতে ‘সম্ভবনা’ সবসময় প্রয়োজন অনুযায়ী বেঁকে যায়।” কেউ যদি প্যারাডক্স তৈরি করার মত কাজ করে তবে তার ফলাফল অদ্ভুত হবে কারণ যা ঘটার, তা যাতে ঘটে সেজন্য জগত যতটুকু পরিবর্তন বা যত অসম্ভব প্রয়োজন, সবই সম্ভব করবে। 

প্রখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এর জীবন থেকে একটা উদাহরণ দিয়ে আজ সমাপ্তি টানছি, স্টিফেন হকিং ২০০৯ সালের ২৮শে জুন ক্যামব্রিজের কাছে কোনো এক স্থানে একটি নৈশভোজ পার্টির আয়োজন করেন। তবে তিনি মানুষকে দাওয়াত দেন পার্টির শেষে, সময় তখন ২৯জুন হয়ে গেছে। তিনি পার্টির শেষে ২৮জুনের পার্টিতে অংশ নেয়ার জন্য ‘ইনভাইটেশন লেটার’ বানিয়ে রাখেন।

কী অদ্ভুত! হ্যাঁ এটা অদ্ভুত হলেও তিনি বেশ আশা নিয়েই এই পৃথিবী ত্যাগ করেছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল ভবিষ্যতের কেউ না কেউ এই ইনভাইটেশন লেটারটি নিয়ে অতীত ভ্রমণ করে পার্টিতে অংশ নেবেন। তবে এই সম্ভাবনা কিন্তু উড়িয়ে দেয়া যায় না! মূল কথা হচ্ছে টাইম ট্রাভেলিং দিয়ে অতীতে যাওয়া থিওরিটিক্যালি সম্ভব। যেহেতু প্রাক্টিক্যালি পরীক্ষা করার মত প্রযুক্তি এখনো আবিষ্কৃত হয়নি, তাই শুধু মাত্র থিওরিটিক্যাল সম্ভাবনা নিয়ে সন্তষ্ট থাকতে হচ্ছে।

তথ্য সূত্রঃ  http://—-https://www.google.com/amp/s/mashable.com/2018/03/14/stephen-hawking-time-travel-party.amp/ —https://en.m.wikipedia.org/wiki/Temporal_paradox

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker