ট্রেন্ডিং খবরপ্রযুক্তিহোমপেজ স্লাইড ছবি

রোবট নেটওয়ার্কের ইতিবৃত্ত

বি.কে. আহমেদ: খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ সালের দিকে গ্রীক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল দাসপ্রথার উপর ভিত্তি করেই। তখনকার সময়ে শাসক গোষ্ঠী নিজেদের কাজ অন্যকে দিয়ে করিয়ে নেয়ার জন্য দাসদের ব্যাবহার করত, কৃষিকাজ থেকে শুরু করে নিজের জন্য অট্টালিকা বানানো সব কাজ করানো হত দাসদের দিয়ে। তখন থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত পৃথিবী জুড়ে দাস প্রথার প্রচলন ছিল। পৃথিবীর সর্বশেষ দাস প্রথা বিলুপ্ত হয় মধ্য প্রাচ্য থেকে। সৌদি আরবে ১৯৬২ সালের আগপর্যন্ত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৯৬৩ সালের আগ পর্যন্ত দাস প্রথা প্রচলিত ছিল।

দাস প্রথার বিরুদ্ধে অনেক বিদ্রোহ, অনেক সংগ্রাম হয়েছে পৃথিবী জুড়ে। প্রচুর সিনেমাও তৈরি হয়েছে এই প্রথা নিয়ে। অনেক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এই প্রথা বন্ধ হতে প্রায় ৪০০০ বছর সময় লেগেছে। তখনাকার সময়ে মানুষকে জোর করে দাস বানানো হত তাদের ছেলে-মেয়ে হলে তারাও দাসে পরিণত হত, দাস কেনা-বেচা হত খোলা বাজারে। এ যেন মানব সভ্যতার দীর্ঘতম এক কাল অধ্যায়! শেষ হইয়াও হইল না শেষ!- হ্যা পৃথিবীর সভ্যতা থেকে দাস প্রথা আজ বিলুপ্ত হলেও দাস প্রথা আবার ফিরে এসেছে “তথ্য-প্রযুক্তিতে”।

দাস বানানোর সেই একই ফর্মুলা এখনো এখানে ব্যাবহার করা হচ্ছে- অবৈধভাবে বা গোপনে দখল করে নেয়া হচ্ছে কোন কম্পিউটার নেটওয়ার্কে থাকা সবগুলো কম্পিউটারকে, বানানো হচ্ছে ডিজিটাল দাসে, তারপর ইচ্ছেমত নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী ব্যাবহার করা হচ্ছে এইসব দখল করা কম্পিউটারগুলোকে। আর এটাকেই রোবট নেটওয়ার্ক( Robot Network) বা বটনেট(BotNet) বলে। সে জন্য হ্যাকারদের আস্তানায় এখন সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র বা টুলসের মধ্যে অন্যতম বটনেট, ইনফেক্টেড কম্পিউটারের একটি রোবট নেটওয়ার্ক যা রিমোটলি হ্যাকারদের কন্ট্রলে থাকে।

বটনেটের আওতাধীন এই সব ইনফেক্টেড কম্পিউটারগুলো দিয়ে যে কোন ধরনের ক্রিমিনাল সার্ভিস করানো যায়, যেমন- ম্যালওয়ার(Malware = Malicious Software) ছড়ানো, ডিডস(DDOS = Distributed Denial of Services Attack ) এট্যাক চালানো, স্প্যাম ছড়ানো, অবৈধ কন্টেন্ট রাখা, এ ছাড়া বর্তমান সময়ে বিটকয়েন(Bitcoin এক প্রকার ক্রিপ্টোকারেন্সি, এটা ডিসেন্ট্রালাইস ডিজিটাল কারেন্সি, যার জন্য কোন সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক বা সিঙ্গেল ম্যানেজমেন্ট দরকার হয় না, এটা সরাসরি ইউজার টু উজার (বিটকয়েন) পিয়ার টু পিয়ার নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে লেনদেন হয় আর এই ডিজিটাল কয়েন গুলো তৈরি করতে অনেক কম্পিউটার রিসোর্স দরকার হয়, ১ বিটকয়েনের বর্তমান [অক্টোবর ২০১৯] বাজারমূল্য ৯ হাজার ইউ এস ডলার।) মাইনিং করার জন্য ক্রিপ্টোমাইনিং নামে একটা নতুন ধরনের এট্যাক শুরু হয়েছে যার জন্য বটনেট ব্যাবহার হয়।

কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনকে ম্যালওয়ারের মাধ্যমে ইনফেক্টেড করে এই বটনেটের আওতায় নিয়ে আসা হয়। অতপর এগুলা ডিজিটাল আন্ডারগ্রাউন্ডে চড়া দামে বিক্রি হয়। বটনেটের আওতাধীন এই কম্পিউটারগুলোকে শুধুমাত্র এককালীন ব্যবহার করেই ছেড়ে দেয়া হয় না এর মধ্যে তৈরি করা হয় ব্যাকডর পরবর্তীতে এক্সেস এর জন্য। কখনো কখনো দেখা যায় আমাদের কম্পিউটার অনেক স্লো কাজ করছে যদিও ভারি কোন কাজ করা হচ্ছে না, হতে পারে তখন আমাদের কম্পিউটার কোন বটনেটের কবলে পড়ে কোন সাইবার এট্যাকে(Cyber Attack) অংশ নিচ্ছে যা আমরা টেরও পাচ্ছি না।

পৃথিবীর কিছু কুখ্যাত বটনেটের নাম হচ্ছে- Mariposa, Conficker, Koobface, নতুন যুক্ত হয়েছে GameOver Zesus যাদের অধীনে ১ মিলিয়নেরও বেশি কম্পিউটার থাকে এবং তারা হাতিয়ে নেয় মিলিয়ন মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমরা এখন বসবাস করছি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্রাইমের সময়ে। আমাদের অসচেতনার কারণে আমাদের মেশিন বা কম্পিউটার কাজ করছে হ্যাকারদের জন্যে, নষ্ট হচ্ছে আমাদের সময়, চুরি হচ্ছে সকল প্রকার ডিজিটাল তথ্য, ক্রেডিট কার্ডের এক্সেস, গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস।

অনেক সময় আমাদের মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে অন্য কোন টার্গেটেড এট্যাক বা হ্যাকিং এর জন্য। আসুন একটু সচেতন হই, নিজের মেশিনের কোন প্রকার এবনরমালিটি চোখে পড়লে তার ব্যবস্থা নেই। নিয়মিত অপারেটিং সিস্টেম আপডেট রাখি, ফ্রি সফটওয়্যার পারতপক্ষে ব্যাবহার না করি, মেইলে কোন লোভনীয় অফার পেলেই না বুঝে না খুলি, ফায়ারওয়াল ব্যবহার করি, উইন্ডোস ব্যবহারকারীরা উইন্ডোস ডিফেন্ডার চালু রাখি, আর সবশেষে প্রিমিয়াম এন্টিভাইরাস বা এন্টিম্যালওয়ার ব্যবহার করি।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker