ছুটি

 খুমের রাজ্যে ভ্রমণ

মৃন্ময়ী মোহনা: মারমা শব্দ ‘খুম’ মানে জলপ্রপাত। বান্দরবানের গভীরে রয়েছে খুমের এক বিশাল রাজ্য। বান্দরবানের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সাঙ্গু নদী থেকেই খুম গুলোর সৃষ্টি। নাফাখুম, আমিয়াখুম,সাতভাইখুম,ভেলাখুম, মায়াবীখুম সবগুলোর উৎস এই একটি নদীই। ট্রেকিং,অ্যাডভেঞ্চার, ঝর্ণা-ঝিরির সৌন্দর্য, আকাশ আর পাহাড়ের মিতালী সবকিছু মিলিয়ে খুমের রাজ্যে ভ্রমণ হতে পারে জীবনের স্মরনীয় ক’টা দিন।  আদিবাসীদের গ্রামের সহজ মানুষদের সাথে মিশে যাওয়ার দুর্লভ সুযোগও মিলবে এ ভ্রমণে। বিদ্যুত, মোবাইল, কম্পিউটার,  উন্নত জীবনব্যবস্থা সবকিছুর বাইরে গিয়ে জীবনটাকে পিছিয়ে নিয়ে যেতে হবে অনেকখানি।
কীভাবে যাবেন: 
ভ্রমণের জন্য প্রথমেই দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে যেতে হবে বান্দরবান। বান্দরবান থেকে চান্দের গাড়ির প্রায় ৩ ঘন্টা ভ্রমণ শেষে যেতে হবে থানচি। থানচি থেকে বিজিবি ক্যাম্প ও থানায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখিয়ে (জাতীয় পরিচয় পত্র/স্টুডেন্ট আইডি কার্ড /পাসপোর্ট)  অনুমতি নিয়ে নৌকায় আড়াই ঘন্টা পার করে রেমাক্রি। সেখানে একরাত পার করে পরেরদিন ট্রেকিং শুরু করে থুইসাপাড়া/নিকোলাসপাড়া/জিন্নাহপাড়া। সেখান থেকেই বাকি জায়গাগুলোতে যেতে হবে।
যা যা দেখবেন: 
বান্দরবানকে বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা বললেও অত্যুক্তি হবেনা। এ জেলার পরতে পরতে সৌন্দর্য।পাহাড়ের সৌন্দর্যের সাথে নতুনমাত্রা যোগ করেছে সাঙ্গু নদী। মূলত চান্দের গাড়ি থেকেই শুরু হয় অপার্থিব সৌন্দর্যের জগতে ঢুকে যাওয়া। পথে ‘ডিমপাহাড়’ খ্যাত পাহাড়ের দেখা মিলবে। দূর থেকে ডিমের মতো লাগে বলে এর এমন নামকরণ!
অপার্থিব আমিয়াখুম
চান্দের গাড়ির পুরো ভ্রমণেই চোখে পড়বে পাহাড় আর সর্পিলাকার রাস্তা। থানচি থেকে শুরু নৌপথের ভ্রমণ। সরু সরু নৌকায় কাঠের পাটাতনে বসে আকাশ-নদী-পাথর-পাহাড় দেখে দিব্যি কেটে যাবে সময়টুকু। নদীর পানি কখনো একেবারে স্বচ্ছ, কখনো নীল, কখনো নীলাভ, কখনো সবুজ। বড়ো বড়ো পাথরের নামও রয়েছে। বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায় পাথরগুলোর পূজা করে থাকে। সব’চে বড়ো পাথরকে বলা হয় রাজাপাথর। রাণীপাথরও রয়েছে।এছাড়া আরো অনেক ছোটোবড়ো পাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরো পথজুড়ে।প্রাণহীন পাথরের মধ্যে যে এতো সৌন্দর্য বিরাজমান, তা বান্দরবান না গেলে বোঝা যাবেনা।
রেমাক্রিমুখে যেখানে নৌকা ভ্রমণ শেষ, সেখানেই আছে কটেজ। ভ্রমণের প্রথম রাতটা সেখানেই কাটিয়ে দিতে পারবেন। রাতের আকাশের কোটি কোটি তারার মিছিল দেখতে চাইলে রাতের অনেকটা কটেজের আঙিনাতেই কাটিয়ে দেওয়া যায়।
পরের দিন থেকে ট্রেকিং শুরু।গন্তব্য জিন্নাহপাড়া /থুইসাপাড়া। রেমাক্রি থেকে প্রায় ৪-৫ ঘন্টার হাঁটাপথ। ২/৩ ঘন্টা পর দেখা মিলবে অপার্থিব নাফাখুমের। নাফাখুমের সৌন্দর্য উপভোগ শেষে আবার হাঁটতে আরম্ভ করলে ২/৩ ঘন্টা পর পৌঁছে যাবেন কোনো এক আদিবাসী পাড়ায়।
ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন সব’চে রোমাঞ্চকর দিন। সব’চে খাড়া পাহাড় খ্যাত ‘দেবতাপাহাড়’ পার হতে হবে। হাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে চলা বুঝি একেই বলে! দেবতা পাহাড়ের দুর্ধর্ষ অভিযান শেষে দেখা মিলবে আমিয়াখুম, সাতভাইখুম ও ভেলাখুমের।প্রতিটি খুম তাদের আলাদা আলাদা সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করতে ব্যস্ত। ভেলাখুমে বাঁশের তৈরি ভেলা নিয়ে যেতে হয়। একদিনেই এ তিনটি মনোরম স্থান দেখা সম্ভব। পরের দিন খুব ভোরে রেমাক্রির উদ্দেশ্যে আবার হাঁটা শুরু।অর্থাৎ মোট চারদিনের ভ্রমণে খুমের রাজ্য পুরোটাই উপভোগ করা সম্ভব।
খরচ: দুর্গম ও অনেকটা নতুন আবিষ্কৃত হওয়ায় খুমের রাজ্যে ভ্রমণের খরচপাতি একটু বেশি। যানবাহন, থাকা-খাওয়া সহ গাইডের খরচ-সব মিলিয়ে প্রতিজন ৬০০০-৮০০০ /- টাকা পর্যন্ত লাগতে পারে। থানচিতেই অনেক বাঙালী এবং আদিবাসী গাইড পাওয়া যায়। তারা বিভিন্ন প্যাকেজের মাধ্যমে পুরো ভ্রমণে সহায়তা করতে পারে। ভ্রমণ সদস্য যতো বেশি, মোট খরচ ততোটাই কমে আসবে।
বাড়তি সতর্কতা:
 খুব দূরের জায়গা বলে এটি মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে একদম বিচ্ছিন্ন। তাই অবশ্যই ভালো পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে যেতে হবে। পাহাড় বাইতে হবে বলে অ্যাংলেট ও নি-ক্যাপ নেওয়া জরুরি। পথের মাঝে একটু পরপরই নদী/ঝিরি/জলাশয় পার হতে হবে। তাই প্লাস্টিকের জুতোর কোনো বিকল্প নেই। শুকনো খাবার রাখা জরুরি। ব্যাগের ওজন যতো কমানো যায়,ততোই মঙ্গল। ভ্রমণ আমাদের মনকে বিস্তৃত করে। দুর্গম পথের ভ্রমণ জীবনকে ভালোবাসতে শেখায় নতুন করে।জীবনদর্শন ও জীবনদক্ষতা বাড়াতে খুমের রাজ্যে ভ্রমণ হতে পারে যেকোনো ভ্রমণপ্রেমীর জন্য অত্যন্ত সুখকর।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker