রোববার, ২৩ জুলাই ২০১৭
webmail
Sun, 16 Jul, 2017 12:16:07 PM
নতুন বার্তা ডেস্ক

কাবুল: দীর্ঘ পথ পরিক্রমার পর নানান চড়াই-উতরাই পেরিয়ে স্বপ্নের লর্ডসের মাঠে মঙ্গলবার প্রথমবারের মত খেলার সুযোগ পেল যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের ক্রিকেট দল। শরণার্থী শিবিরে তাদের ক্রিকেটের উত্থান ঘটলেও সীমানা পেরিয়ে যোজন যোজন মাইল দূরত্বে এসে এ যেন ক্রিকেটের প্রতি তাদের ভালবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত রচিত হল।

খুরাসানের মত ঘিঞ্জি পাকিস্তানী ক্যাম্প যেখানে নেই কোন পিচ, খেলাধুলার সামগ্রী, উইকেট, হেলমেট, গ্লাভস, চিত্ত বিনোদনের ব্যবস্থা। সেখানে রয়েছে কেবলমাত্র ক্ষুধা আর ক্ষুধা। যা আফগানিস্তানকে টেস্ট খেলুড়ে অভিজাত ক্লাবের সদস্য হওয়ার জন্য সহায়ক হয়েছে। গত মাসেই টেস্ট মর্যাদা পেয়েছে আফগানিস্তান।

পাকিস্তানের সীমান্ত শহর পেশোয়ারে কাছাকাছি শরণার্থী শিবিরে প্রায় ৪০ বছর যাবত লাখ লাখ আফগান আশ্রয় নিয়েছে। এই আশ্রয় কেন্দ্রে তারা ক্রিকেট ভালবাসায় আক্রান্ত হয়েছে।

কুনার প্রদেশের এক শরণার্থী ৩৫ বছর বয়সী আব্দুল ওয়াহিদ বার্তা সংস্থা এএপপি’কে বলেন, ‘আমরা এখানে ক্রিকেট শিখেছি এবং এই ক্রিকেটকে আমরা আফগানিস্তানে নিয়ে গেছি এবং আফগান দল এখন বিশ্ব পর্যায়ে খেলছে, পুরো বিশ্বের কাছ থেকে স্বীকৃতি পেয়েছে।’

তিনি এবং আফগানিস্তানের একটি প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখানোর আগ পর্যন্ত পাকিস্তান দলের জন্য হর্ষধ্বনি দিয়ে সময় পার করেছেন।
জাতীয় দলে জায়গা না পেলেও বর্তমানে শরণার্থীদের কোচের দায়িত্ব পালন করা ওয়াহিদ বলেন, টেনিস বল দিয়ে তারা ক্রিকেট শিখেছেন। এদের মধ্যে যারা ভাল করেছেন পেশোয়ারে বিভিন্ন একাডেমীতে যোগ দিতেন, সেখানে তারা প্রথমবার কাঠের ক্রিকেট বলের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন।

পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের কোচ ফরিদুল্লাহ শাহ একাডেমীতে আসা আফগান খেলোয়াড়দের দৃঢ়তার কথা স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, ‘দুপুরের আগ পর্যন্ত এরা শ্রমিকের কাজ করত এবং তার এখানে তারা ক্রিকেট খেলত। তাদের অনেকেই পেশোয়ারে পল্ট্রি সরবরাহ করে জীবন ধারণের চেষ্টা করায় আফগান দলের নাম ছিল ‘টিম অব চিকেনস’ (মুরগির দল)।

তারা (আফগান শরণার্থীরা) খেলার সামগ্রী যোগার করতে বেশ চিন্তিত থাকত, তবে প্রতিদিনই খেলত বলে উল্লেখ করে শাহ বলেন, ‘আমাদের খেলোয়াড়দের তুলনায় তাদের শক্তি অনেক বেশি ছিল এবং তাদের সাফল্যের মূলে এটাই।’

বিস্কুট খেয়ে বেঁচে থাকা

ইসলামিয়া ক্রিকেট একাডেমী কোচ ও সাবেক প্রথম শ্রেনী ক্রিকেটার কাজি শফিক আফগান ক্রিকেটারদের প্রশংসা করেন।

শফিক বলেন, ‘আফগানরা দ্রুতই শিখতে পারেÑ একবার কোন ভুল ধরিয়ে দিলে, সে খুব দ্রুতই বুঝতে পারেÑ এরপর সে বিষয়ে কঠোর পরিশ্রম করবে।’

তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমি নাম প্রকাশ করবো না। তবে আফগানিস্তান জাতীয় দলের একজন খেলোয়াড় আমাকে বলেছিলেন, এখানে আসতে তাকে টাকা ধার করতে হতো ...এবং তারপর কয়েক প্যাকেট বিস্কুট বিক্রি করে ১০ রূপী আয় করে সারা দিন চলত।’

কোচ ও দুই বার পেশোয়ার জেলা ক্রিকেট এসোসিয়েশনের সভাপতি আসগর খান আফগান খেলোয়াড়দের এখানকার ‘টুর্নামেন্টের সৌন্দর্য’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

‘লম্বা লম্বা ছক্কা হাঁকানো’ মোহাম্মদ নবী থেকে আফগান জাতীয় দলের অধিনায়ক আসগর স্তানিকজাইর নামের তালিকা উল্লেখ করে তাদের প্রশংসা করেন খান। সকলেই পেশোয়ারে ক্রিকেট শিখেছেন। তিনি বলেন, শাপুর জাদরানের মত অনেকেই শরণার্থী শিবির থেকে শুরু করেছেন।

তালেবান সমর্থক

জিমখানা ক্রিকেট একাডেমীর কর্মকর্তারা জানান, পেশোয়াড় একাডেমীতে এখন আফগান ক্রিকেটারদের প্রশিক্ষণের সংখ্যা কমছে।

শরণার্থীদের আফগানিস্তানে ফেরত পাঠাতে গত বছর পাকিস্তান একটি বিতর্কিত আইন চালু করেছে। যার ফলে হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত পার হয়ে দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। ইসলামাবাদ ও কাবুলের নতুন নিষেধাজ্ঞায়ও খেলোয়াড়দের ওপর প্রভাব পড়ছে।

দেশের অগ্রগতির ওপরই নির্ভর করবে ক্রিকেটের পরিবর্তন।

কট্টর পন্থী ইসলামী তালেবান শাসনামলে আফগানিস্তান ক্রিকেটকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। তালেবানরা ক্রীড়াকে ধর্মীয় কর্তব্য থেকে বিরত থাকা হিসেবে বিবেচনা করতো।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে এক বিদ্রোহী কমান্ডার বলেন, তবে ১৬ বছর আগে শাসন শেষ হওয়া তালেবানরাও এখন ক্রিকেটে মজেছে।

ঐ কমান্ডার বলেন, ‘এখন তারা কেবল রেডিওতে ক্রিকেট শোনে না, সময় পেলে এমনকি খেলেও।’

টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার সংবাদটিকে আফগানিস্তান উদযাপন করেছে এবং বৃষ্টিতে পন্ড হলেও লর্ডসের ম্যাচটি দেখার জন্য তাদের উৎসাহের কোন কমতি ছিল না। এমনকি আবারো নিরাপত্তা শংকা সৃষ্টি হলেও যা থেকে আফগান ক্রিকেটারদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

বর্তমানে নানগরহার প্রদেশের ইসলামিয়া একাডেমীতে প্রশিক্ষণরত ১৭ বছর বয়সী বাঁ-হাতি স্পিনার আরশাদ খান বলেন, এক দিন তিনি আফগানিস্তানের হয়ে খেলবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন।

তরুণ এ শরণার্থী বলেন, ‘জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার বিষয়ে আমি আশাবাদী।’

নতুন বার্তা/এমআর


Print
আরো খবর
    সর্বশেষ সংবাদ


    শিরোনাম
    Top