ছুটিহোমপেজ স্লাইড ছবি

আটলান্টিস: সাগরের অতলে হারিয়ে যাওয়া এক মহাদেশ!

আরিফুল আলম জুয়েল: ইন্টারনেটের কল্যানে আমরা কত কিছুই না জানতে পারি!হারিয়ে যাওয়া শহর বা দ্বীপ বা মহাদেশ নিয়ে মানুষের জল্পনা-কল্পনা বহু পুরাতন। ইতিহাস ও লোককথা আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় সুপ্রাচীন এমন অনেক জমকালো নগরীর সাথে!কত কিছুই তো হারিয়ে যায় সাগরের অতলে; কিন্তু আস্ত একটা মহাদেশ হারিয়ে যেতে পারে, সে কথা শুনেছেন কখনো? অবিশ্বাস্য হলেও ঠিক এমন রহস্যময় ঘটনা ঘটেছিল অন্য কোথাও নয়, আমাদের পৃথিবীতেই।

প্রাচীন নথিপত্র সাক্ষী দেয়, আমাদের জানা সাতটি মহাদেশ ছাড়াও এককালে আরও এক মহাদেশের অস্তিত্ব ছিল। অথচ বহু চেষ্টায়ও হারিয়ে যাওয়া এই মহাদেশের সন্ধান আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। মহাদেশ না বলে দ্বীপ বলাই ভালো, মহাদেশের সমান-ই ছিল এ দ্বীপ; নাম তার আটলান্টিস। সাগরের অতল থেকে মাথা তোলা আটলান্টিস দ্বীপ আবার ফিরে গিয়েছিল সাগরের কোলে। এর অস্তিত্ব আর অবস্থান অপ্রমাণিত, কিন্তু তা মানুষের অভিযানে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। আটলান্টিস নিয়ে বড় বড় বিশেষজ্ঞ বই রচনা করেছেন, প্রচুর অর্থ ব্যয় করে চালানো হয়েছে আটলান্টিস খুঁজে বের করবার মিশন। অ্যাডভেঞ্চার ঘরানার উপন্যাস ঘাঁটলে শুধু আটলান্টিস নিয়েই মনে হয় শতাধিক গল্প লেখা হয়েছে। চলুন আজ আমরা ঘুরে আসি কিংবদন্তীর সেই আটলান্টিস থেকে।

আজকে আটলান্টিস সম্পর্কে আমরা যা জানি তার প্রায় পুরোটাই প্লেটোর (৪২৯-৩৪৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) রচনা থেকে আসে। আটলান্টিসের কথা প্রথম বলা আছে প্লেটোর সংলাপ টিমিয়াসে, পরে যা আরেকটু বর্ধিত আকারে পাওয়া যায় তারই রচিত অন্য এক সংলাপ ক্রিটিয়াসে। দুঃখের ব্যাপার হলো তার সম্পূর্ণ সংলাপ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, ফলে আটলান্টিসের বর্ণনা রয়ে গেছে অসম্পূর্ণ। অন্য কারও লেখা হলে এসব বিবরণকে স্রেফ গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু লেখক স্বয়ং সক্রেটিসের অন্যতম শিষ্য আর অ্যারিস্টটলের গুরু মহামান্য প্লেটো। তাই বিষয়টিকে ধাপ্পাবাজি বলে বাতিল করা যাচ্ছে না। তাহলে?প্লেটো তার লেখায় জানিয়েছেন যে, আটলান্টিসের কথা প্রথম জানতে পারেন গ্রিক মহাজ্ঞানী সোলোন। মহাজ্ঞানী সোলোন তথ্যটি আবার মিশরীয় এক ধর্মযাজকের কাছ থেকে পান। মিশর থেকে ফিরে এসে সোলোন তার এক আত্মীয় ড্রপাইডসের কাছে আটলান্টিসের গল্পটি বলেন।

পরম্পরায় গল্পটি ড্রপাইডস তার সন্তান, তার প্রপৌত্র ক্রিটিয়াস গল্পটি প্লেটোর কাছে ব্যক্ত করেন। আজকের দিনে যার নাম জিব্রাল্টার প্রণালী, প্লেটোর মতে তার বাইরে সাগরে ছিল সুবিশাল এই দ্বীপ। বর্তমানে একে আমরা জানি আটলান্টিক মহাসাগর বলে। আয়তনে আটলান্টিস ছিল প্রায় লিবিয়া আর এশিয়া মাইনরের সমান। কাজেই এক দ্বীপ না বলে ভাসমান এক মহাদেশ বলাই শ্রেয়।প্লেটোর লেখা থেকে জানা যায়, আটলান্টিস ছিল এক স্বর্গোদ্যান। তা ছিল এক ‘সব পেয়েছি ’র দেশ। অত্যন্ত উর্বর ছিল সেখানকার মাটি, সেখানে রকমারি ফসল ফলাতো কৃষকরা। আর তাতে ফলতো নানা ফলমূল, শাকসবজি। প্রচুর পরিমাণে ফসল ফলতো বলে নগরীতে কোনো অভাব ছিল না। মনমাতানো গন্ধে ভরা রং-বেরঙের সুন্দর ফুলে ভরে থাকতো সবুজ এই রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা। পাহাড়, সমুদ্র আর অরণ্যে ঘেরা অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই রাজ্যে সোনা, রূপো, তামা ইত্যাদি খনিজ সম্পদেরও কোনো অভাব ছিল না। সেচ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত উন্নত।

দিগন্ত ‍বিস্তৃত ফসলের মাঠ পেরিয়ে নীলচে পাহাড়ের গাঁ ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল কৃষকদের বাড়ি। আটলান্টিস নগর ঘিরে ছিল সুন্দর সুন্দর প্রাসাদ, বন্দর, মন্দির। সোনা ও রূপার কারুকার্যে ভরা সুন্দর সুন্দর অট্টালিকা। আর ছিল এক সমুদ্র দেবতার মূর্তি। রাজধানীটি ছিল এক সবুজে ঘেরা পাহাড়ের চূড়ায়। সেই পাহাড়ের চারিদিক ঘিরে ছিল বেশ কয়েকটি পরিখা। পরিখাগুলো আবার পরস্পরের সাথে খাল দিয়ে যুক্ত ছিল। বাইরের পরিখাটি খাল দিয়ে যুক্ত ছিল সমুদ্রের সাথে। সমুদ্রপথে বিভিন্ন দেশ ও রাজ্যের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য এ খালগুলো ব্যবহার করা হতো। নগরীর বাড়িগুলোতে ছিল আধুনিক সব ব্যবস্থা। দামি ধাতুর কাজ করা পাথরের দেওয়াল, বিশাল বিশাল সব সোনার মূর্তি, গরম আর ঠাণ্ডা জলের ঝরণা, আরো সব নানা মজার জিনিস। এই উন্নত রাজ্যে ছিল এক সুগঠিত বিশাল সেনাবাহিনী। প্লেটোর অনবদ্য বর্ণনায় শহরটি আশ্চর্যভাবে যেন জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। এ থেকে অনুমান করা যায়, আটলান্টিসের লোকজনের মধ্যে কেউ কেউ দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার, স্থপতিও ছিলেন। প্লেটোর বর্ণনানুযায়ী, যিশু খ্রিস্টের জন্মের ১,৫০০ বছর আগে এই নগরীর বিলুপ্তি ঘটে। এ নগরের ধ্বংস হওয়া নিয়ে প্লেটো বলেছেন, পোসাইডন তার দশ ছেলেকে দেশটির একেক অংশ শাসনের ভার দেন। এমনিতে বেশ শান্তিই ছিল। কিন্তু ক্রমশই দশজনের মধ্যে বিরোধ বাড়তে লাগল। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের রাজ্যের সীমা বাড়াতে চাইল। আটলান্টিসের নির্মল আকাশে লোভ আর হিংসার ছায়া পড়ল।

স্বর্গের জিউস তখন ঠিক করলেন, এদের শিক্ষা দিতে হবে। সেজন্যই দেবতাদের ডেকে তড়িঘড়ি করে এক সভার আয়োজন করলেন তিনি। প্লেটো ঠিক এখানটায় তার গল্প শেষ করে দিলেন। তারপর আর কী হলো তা আর জানা গেল না। কিন্তু অনেকে এই গল্পের পরিসমাপ্তি টানেন এই বলে যে, স্বর্গের দেবতা জিউসের রোষানলে পড়ে এই নগরী ধ্বংস হয়ে যায়। আবার অনেকেই বলেন— ১,৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ এক ভয়ানক আগ্নেয়গিরি জেগে উঠেছিল ভূমধ্যসাগরের সান্তোরিনি দ্বীপে। আগ্নেয়গিরির হঠাৎ জেগে ওঠা ও তার দরুণ এক ভয়াবহ ভূমিকম্প ও প্রবল জলোচ্ছাসের সৃষ্টি হয় পুরো নগর জুড়ে। ফলে এক রাতের মধ্যে আটলান্টিক মহাসাগরের নীচে তলিয়ে যায় এই শহর। আর সেই সাথে মুছে যায় এক উন্নত সভ্যতার যত চিহ্ন।

সোলনের সময়কাল ছিল আনুমানিক ৬৪০-৫৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত। সোলন বলেন— আটলান্টিস, যা গড়ে উঠেছিল তাদের সময় থেকে থেকে প্রায় ৯,০০০ বছর আগে।সে হিসেবে আটলান্টিস গড়ে উঠেছিল আজ থেকে প্রায় ১১০০০ বছর বা ১১৫০০ বছর আগে!বিজ্ঞানী, গবেষক, প্রত্নতাত্ত্বিক কিংবা জ্ঞানপিপাসু মাত্রই আটলান্টিসের প্রশ্নে মাথা চুলকোতে শুরু করেন। একদল বলেন হ্যাঁ, প্রাচীন এমন একটি সভ্যতা ছিল অবশ্যই যারা জ্ঞানে গুণে বর্তমান আধুনিক পৃথিবীবাসী থেকে এগিয়ে ছিল। তাদের ছিল অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, সমুদ্র সম্পর্কে অসীম জ্ঞান এবং সম্পদের প্রাচুর্য। তবে এসবই ধারণা করা হয়। এর কোন কিছুই এখন পর্যন্ত স্বীকৃত সত্য বলে মতামত দেয়া হয়নি। বিজ্ঞানীরা যেমন একদিকে আটলান্টিসের পক্ষেও কথা বলছেন, আবার অন্যদিকে আটলান্টিসের বিরোধিতা করার সংখ্যাটিও কিন্তু নেহায়েত কম নয়।আটলান্টিসের বাসিন্দাদের ছিল অসাধারণ সব ক্ষমতা! তারা আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারত, সমুদ্রের গতিবিধি পরিবর্তন করতে পারত এমনকি তারা কি করে ধাতু থেকে স্বর্ণ পাওয়া যায়, তা সম্পর্কেও জানত। কেউ কেউ তো আবার বলেন এরাই কি ভিনগ্রহের প্রাণী?প্লেটোর কিছু লেখায় পাওয়া যায় আটলান্টিসের সঠিক নির্দেশ হতে পারে আটলান্টিক মহাসাগরের কোন একটি স্থানে।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা আজো এমন কোনো অবস্থান খুঁজে পাননি। আবার কেউ কেউ বলেন, আটলান্টিসের খোঁজ মিলতে পারে স্পেন ও মরক্কোর জলসীমায়। বিজ্ঞানীরা বলেন, আটলান্টিসের দেখা যদি সত্যিই পাওয়া যায়, তবে তা হবে সমগ্র এশিয়া ও লিবিয়ার সম্মিলিত অংশ জুড়ে।পুরোটাই একটি মিথ! পৃথিবীর আরো অনেক অমীমাংসিত ঘটনার মাঝে এটিও একটি অন্যতম অমীমাংসিত ঘটনা। তবে তার চাইতেও বড় সত্য, হারানো শহর আটলান্টিস এখনো মানুষকে বিভোর করে, এখনো মানুষকে চমকে দেয়। কেউ কেউ আবার চান আটলান্টিস একটি মিথ হয়েই থাক।দেখাই যাক কি হয়! এখনো পর্যন্ত এটি অমীমাংসিতই আছে। তবু বিজ্ঞানীরা হাল না ছেড়ে এখনো সাগরতলে আটলান্টিস খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের দৃঢ় আশা, হারানো আটলান্টিস একদিন না একদিন খুঁজে পাওয়া যাবেই যাবে!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker