বাক্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীর আদ্যোপান্ত

এস এম নিয়াজ মাওলা: রানি ক্লিওপেট্রা! মিশরের রানি ক্লিওপেট্রা! ক্লিওপেট্রার কথা শুনলেই মন আবেগে শিহরিত হয়ে উঠে। ক্লিওপেট্রা নামে আমরা যাকে চিনি, তিনি আসলে ক্লিওপেট্রা সপ্তম- টলেমি রাজবংশের শেষ শাসক। এখানে আরেকটি ব্যাপার বলে নেওয়া উচিৎ। টলেমিরা যে সময়ে মিশর শাসন করতেন, সে সময়টাকে বলা হয় হেলেনিষ্টিক যুগ। ইতিহাসে এই হেলেনিষ্টিক যুগের একটা গুরুত্ব আছে। এক কথায় হেলেনিষ্টিক সভ্যতা বলতে বুঝায় গ্রিকের বাইরে গ্রিক সভ্যতা (Greek civilization beyond classical Greeks) । খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ৩২৩ সালে আলেকজান্দার দ্য গ্রেটের মৃত্যুর পর থেকে এই যুগের সময়কাল শুরু।

সমাপ্তি ঘটে খ্রিষ্টপুর্বাব্দ ১৪৬ সালে রোমান কর্তৃক গ্রিক মূল ভূখন্ড বিজয়ে বা খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ৩১ সালে এক্টিয়ামের যুদ্ধে রোমানদের কাছে মিশরের পরাজয়ে। প্রধানত আফ্রিকা এবং এশিয়া মাইনরেই হেলেনিষ্টিক সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিলো। বস্তুত হেলেনিষ্টিক যুগ হচ্ছে একটি ট্রানজিশন পিরিয়ড, যেখানে গ্রিক সভ্যতা উন্নতির শিখরে পৌঁছার পর রোমান সাম্রাজ্যের সূর্য উদিত হচ্ছিল। এই সভ্যতারই শেষ রানি হচ্ছেন ক্লিওপেট্রা সপ্তম।

অর্থাৎ, রানি ক্লিওপেট্রা সপ্তম টলেমি রাজবংশ এবং হেলেনিষ্টিক সভ্যতার শেষ রানী। তাঁর গুরুত্ব অসীম বৈ কি! আমরা একটা ব্যাপার টলেমি রাজবংশের সূচনা থেকেই লক্ষ্য করে এসেছি, টলেমি বংশের সকল পুরুষ শাসক টলেমি নামেই পরিচিত ছিলেন এবং মেয়ে শাসকরা ক্লিওপেট্রা বা বেরেনিস (Berenice) বা আরসিনো (Arsinoë) নামে পরিচিত হতেন। রানি ক্লিওপেট্রা খ্রিস্টপূর্বাব্দ ৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর বাবা ছিলেন দ্বাদশ টলেমি এবং মা ছিলেন পঞ্চম ক্লিওপেট্রা। আমরা পূর্বেই দেখেছি, একাদশ টলেমি যখন রানি তৃতীয় বেরেনিসকে হত্যা করেন এবং ফলশ্রুতিতে তিনিও আলেকজান্দ্রিয়ানদের হাতে খুন হন, টলেমি বংশে বৈধ কোনো উত্তরাধিকারী আর ছিল না। দ্বাদশ টলেমি ছিলেন নবম টলেমির অবৈধ বা জারজ সন্তান। বৈধ কোণো উত্তরাধিকারী না থাকাতে শেষ পর্যন্ত দ্বাদশ টলেমিকেই মিশরের ফারাও হিসাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এখানে একটু অন্য একটি ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করি।

মিশরের শাসন ক্ষমতায় ছিলেন টলেমিরা, যারা মূলত গ্রিক। যাদের ছিল এক বিশাল ঐতিহ্যবাহী সভ্যতা। এমনকি মিশরেও গ্রিকরা আলেকজান্দ্রিয়াতে বসবাস করতেন- যা ছিল সে সময় বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শহর। অন্যদিকে গ্রিক তখন শক্তিশালী সাম্রাজ্য নয়, সে জায়গাটা নিয়েছিল রোম। রোম গ্রিকদের মত এত শিক্ষিত নয়, এত সাংস্কৃতিক নয়। গ্রিকরা রোমানদের দেখতে পারতেন না। কিন্তু মিশরের টলেমিদের ক্ষমতায় থাকার জন্য রোমানদের প্রয়োজন ছিল। টলেমিরা রোমানদের শস্য দিতেন, অর্থ দিতেন; বিনিময়ে রোমানরা যুদ্ধ ক্ষেত্রে বা ক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে সাহায্য করতেন। কিন্তু, গ্রিকরা, আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রিকরা এটা পছন্দ করতেন না। তারা মেনে নিতে পারতেন না, টলেমি একজন গ্রিক হয়ে রোমানের কাছে সাহায্য চাচ্ছেন!

দ্বাদশ টলেমির সাথে রোমানদের কথা হল, তারা তাঁকে সিংহাসনে রাখবেন। বিনিময়ে প্রচুর অর্থ দিতে হবে- যে পরিমাণ অর্থ সত্যিকার অর্থে দ্বাদশ টলেমির ছিল না। তাই তিনি ‘কর’ বাড়িয়ে দিলেন। এটা জনগণকে খেপিয়ে তুললো। রোম টলেমির কাছে আরো চাইলো। তিনি সাইপ্রাস রোমকে দিয়ে দিলেন; সরাসরি নয়, পরোক্ষভাবে। রোম কর্তৃক সাইপ্রাস দখল হলে (সাইপ্রাস তখন শাসন করতেন দ্বাদশ টলেমির ভাই) দ্বাদশ টলেমি কোনো প্রতিবাদ করলেন না। ফলে মিশরীয়রা বিদ্রোহ করেন এবং দ্বাদশ টলেমী সাহায্যের আশায় রোমে পালিয়ে আসেন। এ সময়টাতে মিশরের শাসন ক্ষমতা দখল করেন দ্বাদশ টলেমির স্ত্রী পঞ্চম ক্লিওপেট্রা (মতান্তরে ষষ্ঠ ক্লিওপেট্রা) আর তাঁদের বড় মেয়ে চতুর্থ বেরেনিস । এক বছর পর পঞ্চম ক্লিওপেট্রা মারা যান এবং বেরেনিস শাসন করতে থাকেন। তিনি তাঁর এক জ্ঞাতি ভাই-কে বিয়ে করেছিলেন এবং কয়েক দিনের মধ্যে হত্যা করেছিলেন। এরপর একজন শক্তিশালী বন্ধুকে বিয়ে করলেন এবং তাঁকে নিয়ে মিশর শাসন করতে লাগলেন।

এসময় ক্লিওপেট্রা ছিলেন টিন-এজার। তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরিতে যেতেন, হেরোডটাসের ইতিহাস বই পড়েছিলেন, নিজেকে শিক্ষিত করছিলেন। তাঁর ছোটবেলার একটা ঘটনা আমরা একটা স্টেলাতে লিখিত পাই। একবার তাঁর সন্তানদের নিয়ে দ্বাদশ টলেমি মেম্ফিসে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁরা সেরাপিয়াম দেখতে গিয়েছিলেন। পুরোহিতরা যখন মিশরীয় ভাষা অনুবাদ করে বোঝাচ্ছিলেন,ছোট ক্লিওপেট্রা তখন থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন- তিনি মিশরীয় ভাষা শিখবেন। সপ্তম ক্লিওপেট্রা একমাত্র টলেমি শাসক, যিনি মিশরীয় ভাষা জানতেন। দ্বাদশ টলেমি একসময় মিশরে ফিরে আসলেন এবং রোমান সেনাপতি অউলাস গাবিনিয়াসের সাহায্য নিয়ে মিশরের সিংহাসনে আবারো অধিষ্ঠিত হলেন। ক্ষমতা ফিরে পেয়েই দ্বাদশ টলেমি তাঁর বড় মেয়ে চতুর্থ বেরেনিসকে হত্যা করলেন এবং সপ্তম ক্লিওপেট্রাকে সহ-শাসক হিসেবে ঘোষণা দিলেন। গাবিনিয়াস তাঁর কিছু সৈন্যদেরকে মিশরে রেখে যান দ্বাদশ টলেমিকে সাহায্য করার জন্য, তাদেরকে বলা হতো গাবিনিয়ানি। ক্লিওপেট্রার বয়স তখন মাত্র ১৪ বছর। এদিকে দ্বাদশ টলেমিও অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন। তিনি রোমের সাহায্য নিয়ে ক্ষমতা ফিরে পেলেও, আলেকজান্দ্রিয়াতে গাবিনিয়াসের রেখে যাওয়া ছোট সেনাদলকে চোখে চোখে রাখতে লাগলেন। এবং তিনি প্রস্তুতি নিতে লাগলেন!

তিনি প্রস্তুতি নিতে লাগলেন মন্দির বানানোর জন্য। তিনি মন্দির নির্মাণ করলেন ফিলি দ্বীপে। তিনি প্রস্তুতি নিতে লাগলেন মৃত্যুর জন্য। সেজন্য তিনি একটি উইল বা ইচ্ছাপত্র লিখে গেলেন- তা দু’জায়গাতে রাখলেন- আলেকজান্দ্রিয়ায় এবং রোমে। দ্বাদশ টলেমি জানতেন, মিশরে ফারাও হিসাবে থাকতে চাইলে রোমের অনুমোদন লাগবেই। তাঁর ইচ্ছাপত্রে ছিল, তিনি মারা যাবার পর তাঁর জীবিত বড় কন্যা ফারাও হবেন এবং সে তার ছোট ভাইকে বিয়ে করে সহ-শাসক হিসাবে মিশর শাসন করবেন।

অবশেষে, দ্বাদশ টলেমি যখন মারা যান তখন ক্লিওপেট্রার বয়স ১৮ বছর এবং মিশরীয় রীতি অনুযায়ী তাঁর চেয়ে ৮ বছরের ছোট ভাই ত্রয়োদশ টলেমিকে বিয়ে করে বাবার ইচ্ছানুযায়ী একসাথে মিশর শাসন করতে থাকেন। ক্লিওপেট্রার শাসনকালের প্রথম তিনবছরে ক্রমাগত এক একটি বিপর্যয় ঘটছিল, যেমনঃ অর্থনৈতিক মন্দা, দুর্ভিক্ষ, নীল নদের বন্যা ছাড়াও নিজেদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ ইত্যাদি। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এ সমস্যাগুলোর বিরুদ্ধে তাঁকে অবিরত কঠিন সংগ্রাম করতে হচ্ছিল। এছাড়াও তিনি তাঁর ভাই তথা স্বামীর সাথে যৌথ নেতৃত্বেও সন্তষ্ট ছিলেন না। যে কারনে তিনি বিভিন্ন রাজকীয় নথিপত্র এমন কি মুদ্রা থেকেও তাঁর ভাইয়ের নাম বিলুপ্ত করে তাঁর নিজ নামে একক মুদ্রা প্রবর্তন করলেন। তাঁর এসব কাজে তাঁর অনেক পারিষদই অসন্তষ্ট হয়ে উঠেন। একই সময়ে মিশরে থেকে যাওয়া গাবিনিয়ানিদের সাথে এক ঘটনায় ক্লিওপেট্রার বিরোধ শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁরই পিতার এক পরামর্শদাতার ষড়যন্ত্রে তিনি সিংহাসনচ্যুত হয়ে সিরিয়া পালিয়ে যান। ঠিক সেই সময়ে রোমে চলছিলো গৃহযুদ্ধ- জুলিয়াস সিজারের সাথে পম্পেই-এর।

রোমের গৃহযুদ্ধে পরাজিত হয়ে পম্পেই মিশরে আসেন রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য (পম্পেই ছিলেন ত্রয়োদশ টলেমি এবং ক্লিওপেট্রার বাবা দ্বাদশ টলেমির মিত্র), তখন ত্রয়োদশ টলেমির বয়স মাত্র ১৩ বছর এবং সভাষদদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে জুলিয়াস সিজারকে খুশি করার জন্য পম্পেইকে খুন করার নির্দেশ দেন। জুলিয়াস সিজার যখন মিশরে আসেন, তাঁকে পম্পেই-এর মস্তক দেখানো হলে খুশি হবার পরিবর্তে সিজার প্রচণ্ড রাগান্বিত হোন। তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থান নেন এবং ত্রয়োদশ টলেমি এবং ক্লিওপেট্রার মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হোন। ক্লিওপেট্রা তখন সীজারেরর সাথে দেখা করে সিংহাসনের উপর তাঁর দাবীর কথা জানানোর জন্য একটি আবেদন পেশ করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্ত সিজারের সাথে দেখা করাটা এত সোজা ছিলনা। ক্লিওপেট্রা জানতেন তিনি যদি প্রকাশ্যে শহরে প্রবেশের চেষ্টা করেন তবে ভাইয়ের হাতে তাঁর মৃত্যু অনিবার্য। তার ফলে তিনি এক অভিনব কৌশল গ্রহন করেন।

অসম্ভব চতুর ও বুদ্ধিমতী ক্লিওপেট্রা নিজেকে প্রাচ্য দেশীয় এক কার্পেটে মুড়িয়ে তাঁর সঙ্গীদের মাধ্যমে সিজারের সামনে কার্পেটটাকে উপঢৌকন হিসেবে পেশ করেন। এরপর ক্লিওপেট্রার সঙ্গীরা পুর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সিজারকে দেখানোর জন্য গোল করে মোড়ানো কার্পেটটার এক মাথা ধরে এক টানে সেটাকে খুলে ফেললে তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন বিশ্বের বিস্ময়, অবর্ননীয় সৌন্দর্যের প্রতীক, মিশরের সিংহাসন থেকে বিতাড়িত, নির্বাসিত রানি ক্লিওপেট্রা। বিখ্যাত সেনাপতি জুলিয়াস সিজার, রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতি,বহু যুদ্ধের বিজেতা সেই রাষ্ট্রনায়ক বিস্মিত নয়নে চেয়ে থাকেন কার্পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা সেই একুশ বছরের বিস্ময়ের দিকে…!

ক্লিওপেট্রা সবকিছু খুলে বললেন সিজারকে। সিজার তবুও বললেন, ত্রয়োদশ টলেমির সাথেই তাঁকে মিশর শাসন করতে হবে। ক্লিওপেট্রা তখন সিজারকে নিয়ে মিশর ভ্রমণে বের হলেন। তাঁরা এক বিশাল নৌকায় করে নীল নদ থেকে আসোয়ান পর্যন্ত গেলেন। সিজার প্রথমবারেরমত পিরামিড দেখলেন। তিনি মমি দেখলেন, মুগ্ধ হলেন! ততদিনে ক্লিওপেট্রা গর্ভবতী! এবং সিজারের সাথে প্রথম দেখা হবার নয় মাস পর ক্লিওপেট্রা ছেলে সন্তানের জন্ম দেন, নাম দেওয়া হয় টলেমি সিজার, ডাক নাম সিজারিয়ন, যার অর্থ বাচ্চা সিজার!

এ পরিস্থিতিতে জুলিয়াস সিজার নীল নদের যুদ্ধে ত্রয়োদশ টলেমিকে পরাজিত করে ক্লিওপেট্রাকে মিশরের শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। ত্রয়োদশ টলেমি নীল নদের পানিতে ডুবে মারা যান। রানি ক্লিওপেট্রা তাঁর আরেক ভাই চতুর্দশ টলেমিকে মিশরীয় রীতি অনুযায়ী বিয়ে করেন এবং মিশর শাসন করতে থাকেন। চতুর্দশ টলেমির আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি, সম্ভবত ক্লিওপেট্রা তাকে হত্যা করেছিলেন।

যাহোক, খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ৪৬ সালে রানি ক্লিওপেট্রা এবং সিজারিয়ন রোমে বেড়াতে যান। জুলিয়াস সিজার যদিও কালপুরনিয়া পিসোনিস নামক এক রোমান মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু রোমে ক্লিওপেট্রার সাথে স্বামী স্ত্রীর মতোই থাকতেন। ক্লিওপেট্রা সিজারের অনেক সিদ্ধান্তকেই প্রভাবিত করতে লাগলেন। ক্লিওপেট্রা নিজেকে দেবী নতুন ‘আইসিস’ বা নারীকূলের মাতৃত্ব নিয়ন্ত্রক বলে ডাকতে শুরু করলেন। এমনিতেই ক্লিওপেট্রা খুব বিলাসিতার মধ্যে থাকতে ভালোবাসতেন। সিজারকে বলে নিজের একটা স্বর্ণমূর্তি গড়ে ভেনাস জেনেট্রিক্স মন্দিরে স্থাপনের ব্যবস্থাও করলেন। অধিকাংশ সিনেটর ভাবতেন, সিজার ছিলেন রিপাবলিকের শুভাশুভের প্রতি হুমকিস্বরূপ। কেউ কেউ এটাও ভাবলেন, সিজার নিজেকে রাজা ঘোষণা দেবার মতলব আঁটছিলেন। সেই সময়ের বিখ্যাত সিনেটর সিসেরো এই সবকিছু মেনে নিতে পারলেন না। তিনি কেসিয়াস, ট্রিবোনিয়াস, কেস্কাসহ ৬০ জন সিনেট সদস্যের সাথে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র করেন। অবশেষে সিজারের পুত্রসম ব্রুটাসের সহায়তায় রোমের সিনেট ভবনের সন্মুখ চত্ত্বরে সিজার ছুরিকাঘাতে নিহত হলেন। তাঁর দেহে ৩৬টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেলো যার মধ্যে ২৩টিই গুরুতর। সিজারের হত্যাকাণ্ডের পর ক্লিওপেট্রা তখন মিশরে চলে আসেন।

জুলিয়াস সিজারের হত্যাকান্ডের পর রোমে আবার গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত জুলিয়াস সিজারের বোনের ছেলে অক্টাভিয়ান এবং মার্ক এন্টনী (জুলিয়াস সিজারের প্রধান সেনাপতি) যুদ্ধে জয়লাভ করেন এবং একসাথে রোম শাসন করতে থাকেন। খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ৪১ সালে পার্থিয়া আক্রমনে মিশরের সাহায্যের জন্য এবং রোমান গৃহযুদ্ধের সময় রানি ক্লিওপেট্রার ভূমিকা (গুজব ছিলো ক্লিওপেট্রা সিজারের এক হত্যাকারী ক্যাসিয়াসকে সহায়তা করেছেন) নিয়ে কথা বলার জন্য মার্ক এন্টনী ক্লিওপেট্রাকে টারসাসে (তুরস্ক) এসে দেখা করতে বলেন।

কাঠের অপরূপ কারুকাজ করা সোনালী রঙের নৌকায় বেগুনী পাল তুলে, রুপার বৈঠা বেয়ে ভেনাস তথা মিশরের প্রেমের দেবী আইসিস সাজে সেজে ক্লিওপেট্রা সিডনাস (cydnus) নদী বেয়ে এন্টনীর শিবিরে উপস্হিত হলেন। তাঁর সেই অতুলনীয় রূপরাশি আর ঐশ্বর্যের সাথে তাঁর বর্ণাঢ্য উপস্হিতিতে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়লেন রোমের বিখ্যাত সেনাপতি মার্ক এন্টনী, প্রেমে পড়ে যান দুইজনেই। ক্লিওপেট্রা আলেকজান্দ্রিয়া ফিরে গেলে এন্টনী টলেমি সাম্রাজ্যের হাতছাড়া হয়ে যাওয়া জায়গাগুলো উদ্ধার করতে সফল হন। এর মধ্যে ছিল সাইপ্রাস এবং লেবাননের কিছু অংশ। অভিযান শেষে এন্টনী ক্লিওপেট্রার কাছে ফিরে এসে সিজারিয়নকে জুলিয়াস সিজারের ছেলে এবং তাকে ক্লিওপেট্রার সাথে যৌথ শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেন। তিনি তাঁর বিজিত রাজ্যগুলো তাদের ছেলে মেয়েদের মধ্যে রোম সাম্রাজ্যের তরফ থেকে উপঢৌকন হিসেবে ভাগ করে দেন।

ক্লিওপেট্রা তখন মার্ক এন্টনীর সাহায্যে নিজের এবং সিজারিয়নের ক্ষমতা নিষ্কণ্টক করার জন্য তাঁর বোন আরসিনোকে খুন করেন। হত্যাকাণ্ডের সময় আরসিনো মন্দিরে ছিলেন, অক্টাভিয়ান ব্যাপারটি ভালো চোখে দেখেন নি। এ সময়ে ক্লিওপেট্রা দুটি যমজ সন্তানের জন্ম দেন- আলেকজান্ডার হেলিয়স এবং দ্বিতীয় ক্লিওপেট্রা সেলেনি, যাদের বাবা ছিলেন মার্ক এন্টনী। এর চার বছর পর মার্ক এন্টনী পার্থিয়ানদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য আবার আলেকজান্দ্রিয়ায় আসেন এবং ক্লিওপেট্রার আরেকটি সন্তান এবার জন্ম নেয়- টলেমি ফিলাডেলফাস। এই যাত্রায় মার্ক এন্টনী মিশরীয় রীতি অনুযায়ী রানি ক্লিওপেট্রাকে বিয়ে করেন, যদিও আগেই মার্ক এন্টনী অক্টাভিয়া মাইনরকে (অক্টাভিয়ানের বোন) বিয়ে করেছিলেন। এ সমস্ত ঘটনায় অক্টাভিয়ান মার্ক এন্টনীর বিরুদ্ধে ক্ষুদ্ধ হোন এবং মিশরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেন।

খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ৩১ সালে এক্টিয়ামের যুদ্ধে স্হলযুদ্ধে পারদর্শী এন্টনী ক্লিওপেট্রার অনুরোধে নৌযুদ্ধে অবতীর্ন হন। ভালো অবস্হানে থেকেও যুদ্ধের এক পর্যায়ে এন্টনী কিছুটা বিপর্যয়ের সন্মুখীন হলে পেছনে থাকা ক্লিওপেট্রা তাঁর সৈন্যদের নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যেতে শুরু করেন। এন্টনীও এসময় তাঁর সৈন্যদের শত্রুর মুখে ফেলে ক্লিওপেট্রাকে অনুসরন করতে থাকেন। ফলে অক্টাভিয়ান খুব সহজেই যুদ্ধে জয়লাভ করেন। মার্ক এন্টনী আলেকজান্দ্রিয়ায় ফিরে এসেই খবর পান ক্লিওপেট্রা আত্মহত্যা করেছেন। এ মর্মান্তিক খবরে নিজেকে আর স্হির রাখতে না পেরে এন্টনী নিজ তরবারী দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন । কিন্ত মৃত্যুর আগে তিনি জানতে পারেন ক্লিওপেট্রা বেঁচে আছেন। তখন ক্লিওপেট্রার সাথে দেখা করতে চাইলে তাঁকে ক্লিওপেট্রার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। এন্টনী ক্লিওপেট্রাকে অক্টাভিয়ানের সাথে একটি সমঝোতায় আসার জন্য বিশেষ ভাবে অনুরোধ করেন। 

এর কিছুক্ষন পরেই তিনি ক্লিওপেট্রার বাহুতেই শেষ নিঃশাস ত্যাগ করেন। এন্টনীর অনুরোধে ক্লিওপেট্রা মিশরের সিংহাসনের উপর তাঁর সন্তানদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য অক্টাভিয়ানের শিবিরে কয়েকবার সংবাদ বাহক পাঠান। কিন্ত অক্টাভিয়ান তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। উপরন্তু বিজয়ী অক্টাভিয়ান ক্লিওপেট্রাকে বিয়ে করতে চাইলেন। কিন্তু ক্ষমতায় থাকার আর কোনো সুযোগ না থাকায় এবং অক্টাভিয়ানের হাতে লান্ছিত ও অপমানিত হওয়ার আশঙ্কায় শেষপর্যন্ত ক্লিওপেট্রাও ১২ আগস্ট, খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ৩০ সালে আত্মহত্যা করেন।

বলা হয়ে থাকে নীলনদের এক ধরনের প্রচন্ড বিষাক্ত ছোটো ছোটো ভাইপার জাতীয় সাপের কামড়ে তাঁর ও সহচরীদের মৃত্যু হয়েছিলো। আবার কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলে থাকেন, অত ছোটো সাপের কামড়ে তিনটি পূর্ণ বয়স্ক মানুষের মৃত্যু হতে পারেনা, কোবরা সাপের বিষই ছিল তাদের মৃত্যুর কারণ।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker