বাক্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

ঐহিত্যবাহী বাখরখানির ইতিহাস

আরিফুল আলম জুয়েল: এবার আপনাদের সামনে নিয়ে আসছি পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাখরখানির ইতিহাস। বাকরখানির ইতিহাসের পেছনে রয়েছে এক মিথ, বাকের এবং খনি বেগম নামের দু’জনের অমর প্রেম; একটি ব্যর্থ প্রেমের করুণ ইতিহাস।এখন তো কত ধরনের খাবারের প্রচলন আমাদের দেশে; ফাস্ট ফুড-রিচ ফুড-পশ্চিমা ফুড-ইটালি ফুড-আমেরিকান ফুডসহ নানান ধরনের, নানান স্বাদের খাবার! স্যান্ডউইচ, রোল, বার্গার, প্যাটিস, পিজ্জা- ফাস্টফুড খাবারের রমরমা এই সময়েও নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাকরখানি। পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে এখনো অনেকের সকাল-বিকালের নাস্তায় বাকরখানি থাকেই।

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারটি এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও জনপ্রিয়। বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে মজাদার বাকরখানি। বাকরখানি নামে প্রসিদ্ধ খাবারটির অপর নাম শুখা (শুকনো)। ময়দা ও তেল দিয়ে তৈরি মজাদার এই বাকরখানি এখনো পুরান ঢাকার মানুষের কাছে জনপ্রিয়। একসময় পুরান ঢাকার মানুষ উপঢৌকন হিসেবে আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে পাঠাত বাকরখানি। তবে এখন সেই সংস্কৃতি আর আগের মতো নেই।

শুধু ঢাকার আদিবাসীরাই নয়, চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের কাছেও বাকরখানির জনপ্রিয়তা রয়েছে। পুরান ঢাকা। পুরান ঢাকাকে ব্যাখ্যা করা যায় ‘বায়ান্নো বাজার তেপ্পান্নো গলি’ বলে।
এখানে প্রচুর গলি, বাজার থাকায় এই নামকরণ করেছিলো হয়তো কেউ। শুধু বাজার নয়, এখানে আছে অনেকগুলো ‘পুর’, ‘গঞ্জ’, ‘তলা’, ‘তলী’ এবং বাহারি নামের এলাকা। এলাকার নামকরণের পেছনে লুকিয়ে আছে একটির চেয়ে একটি রোমাঞ্চকর ঘটনা। আছে বিভিন্ন রকমের বাহারি ঐতিহ্যবাহী খাবার; রমজানের সময় ইফতারের সময় দেখা যায়- বড় বাপের ছোট পোলা, ছোট বাপের বড় পোলাসহ আরো নানান খাবারের তালিকা।

নান্নার মোরগ-পোলাও কিংবা হাজীর বিরিয়ানি কিংবা বিখ্যাত বাখরখানি তো এখনো খেতে যায় মানুষ শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। পুরান ঢাকা সত্যি ই এক অন্যরকম নগরী, চারশো বছরের পুরানো, চারশো বছরের ইতিহাস বয়ে বেড়ানো! এখনো আপনি যদি যান দেখবেন হয়তো পুরাণ ঢাকার অলি গলির মধ্য দিয়ে হাঁটছেন, সরু রাস্তা, রিকশার টুং টাং শব্দ কানে আসছে। চারদিকে বিভিন্ন রকমের মানুষ। কেউ কেউ পান চিবুচ্ছে, ফচ করে পানের পিক ফেলে রাস্তা লাল করে দিচ্ছে। কোনো দোকানে মোহাম্মদ রাফির গান বাজছে। কেউ বা হিন্দীতে কথা বলছে, কেউবা উর্দুতে কথা বলছে! পান চিবুতে চিবুতে মুখ লাল করে মসজিদে নামাজ পড়তে যাচ্ছে, বিখ্যাত কাবুলি ড্রেসে সজ্জিত হয়ে! ৪০০ বছরের ইতিহাসের খনি পুরান ঢাকার খাবারগুলোই যেন একেকটা গল্প।

বাখরখানি- এই বিশেষ রুটি বা বিসকুট যা বলা হোক না কেনো এর উৎপত্তি মূলত আফগানিস্থান অঞ্চলে। বাংলাদেশে গম, দুধ, লবণ, ডালডা, ঘি, পনির এবং খামির দিয়ে বানানো এই জনপ্রিয় খাবারটি বাকরখানি নাম হয় নবাবী আমলের শেষ সময়ে। তৎকালীন প্রভাবশালী জমিদার আগা বাকের খানের সাথে এই খাবারটি নামকরণের বিশেষ যোগসূত্র আছে।

সে সময় ঢাকার আরামবাগের খনি বেগম নামে এক নর্তকী মহিলার সঙ্গে আগা বাকেরের গভীর প্রেম ছিল। কিংবদন্তি রয়েছে, সে সময় ঢাকার বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন আগা সাদেকের পিতা আগা বাকের। তিনি মুর্শিদাবাদের মুর্শিদ কুলি খাঁর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত সভাসদ ছিলেন। অপর একটি তথ্যমতে, তিনি ছিলেন মুর্শিদ কুলি খাঁর প্রধান সিপাহসালার। তার সঙ্গে গভীর প্রেম ছিল আরামবাগের নর্তকী খনি বেগমের। ওই খনি বেগমের অপর এক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল উজিরেআলা জাহানদার খানের পুত্র কোতোয়াল জয়নুল খান। জয়নুল খান ১ দিন খনি বেগমের সহিত অসদাচরণের চেষ্টা করে। এ সময় আগা বাকের বাধা দেয় এবং উভয়ের মধ্যে খনি বেগমকে কেন্দ্র করে মল্লযুদ্ধ হয়। জয়নুল খাঁ পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় গুজব ছড়ায় আগা বাকের জয়নুল খাঁকে হত্যার পর লাশ গুম করে ফেলেছে।

এ ব্যাপারে জয়নুল খাঁর পিতা মুর্শিদ কুলি খানের কাছে বিচার প্রার্থনা করেন। মুর্শিদ কুলি খাঁ আগা বাকেরকে দোষী সাব্যস্ত করে বাঘের খাঁচায় তাকে বন্দী করেন। আগা বাকের বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করে বাঘকে হত্যা করে খাঁচা থেকে বের হন। এর পর তিনি সংবাদ পান যে, তার প্রেয়সী খনি বেগমকে জয়নুল খাঁ অপহরণ করে বরিশালের চন্দ্রদ্বীপ এলাকায় নিয়ে গেছে। আগা বাকের তার সেনাপতি কালা গাজীকে সঙ্গে নিয়ে জয়নুল খাঁর পিছু ধাওয়া করে। অপরদিকে পুত্রের এই অপকীর্তির কথা শুনে তার পিতা ভাটি অঞ্চলের চন্দ্রদ্বীপ অবরোধ করেন। খনি বেগমকে বশে আনতে না পেরে জয়নুল খাঁ একটি বিষধর সাপ দিয়ে তাকে ভয় দেখায় যাতে সে বশে আসে। কিন্তু সে সাপই এক সময় জয়নুল খাঁকে দংশন করে। সে বিষের জ্বালায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার আশা পূরণ না হওয়ায় ক্ষোভে বিষ মাখা ছুরি সে খনি বেগমের বুকে বসিয়ে দেয়। এ সময় আগা বাকের সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখেন, তার প্রেয়সী খনি বেগম বিষ যন্ত্রণায় ছটফট করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।

খনি বেগমের মৃত্যু আগা বাকেরকে বিষন্ন করে তোলে। তার মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন বরিশালে অবস্থানের পর আগা বাকের ঢাকায় চলে আসেন। কিংবদন্তি রয়েছে, আগা বাকেরের নামানুসারে ওই স্থানের নামকরণ করা হয়েছে বাকেরগঞ্জ। ঢাকায় এসে প্রেয়সী খনি বেগমের স্মরণে নিজ হাতে এক ধরনের রুটি তৈরি করেন। নাম রাখেন বাকের-খনি।ওই শব্দের কিছুটা পরিবর্তন করে নামকরণ করা হয়েছে আজকের বাকরখানি। নাজির হোসেনের “কিংবদন্তীর ঢাকা” গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক ঘটনার ব্যাপারে লেখক বলেছেন-

খনি বেগমকে না পেলেও প্রেমের স্মৃতিটা জাগরুক রাখতে আগা বাকের নতুন ধরনের একটি শুকনো রুটি তৈরি করিয়ে নাম দিয়েছিলেন বাকের-খনি। পরে মানুষের মুখে ঘুরতে ঘুরতে এই খাবারের নাম হয়ে যায় বাকরখানি!

বাকরখানির ঐতিহ্যে মুগ্ধ হয়ে কবি প্রতুল মুখোপাধ্যায় তার কবিতার ভাষায় বলেছিলেন-

‘আলু বেচো, ছোলা বেচো, বেচো বাকরখানি/বেচো না বেচো না বন্ধু তোমার চোখের মণি।/ ঝিঙে বেচো পাঁচ সিকেতে হাজার টাকায় সোনা/হাতের কলম জনম দুঃখী তাকে বেচো না।’

এই চরণগুলোই প্রমাণ করে বাকরখানির ইতিহাস অনেক পুরনো। এখনো প্রতিদিন পুরান ঢাকার মানুষ সকালের নাস্তার টেবিলে মোঘল আমলে ফিরে যান- ধূমায়িত দুধ চায়ের সাথে বাখরখানি!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker