বই Talkসাহিত্য

কবিতায় এঁকেছিলেন যিনি অপরূপ প্রকৃতির ছবি

আরিফুল আলম জুয়েল: নির্জনতার কবি কে ছিলেন? আরেকটি নামে তাকে ডাকা হয়- তিমির হননের কবি। যিনি বাংলার রূপ দেখে পৃথিবীর রূপ খুঁজতে চাননি সেই জীবনানন্দ দাশের কথা বলছি! খুবই চমকপ্রদ জীবন ছিল কবি জীবনানন্দের! খুব অল্পসময়ের জন্য তিনি এসেছিলেন এই পৃথিবীতে। জন্ম ১৮৯৯ সালে বরিশালে, মৃত্যু ১৯৫৪ সালে কলকাতায়। মাত্র ৫৫ বছরের জীবন! পারিবারিক উপাধি ছিল দাশগুপ্ত। ব্রাহ্ম সমাজে দীক্ষিত হওয়ার পর গুপ্ত-কে কবি নিজেই ছেটে বাদ দিয়েছিলেন, নামের শেষে শুধু দাশ লেখা শুরু করেন।

বরিশাল শহরের সত্যানন্দ দাশগুপ্তের ঘর আলো করে এসেছিলেন জীবনানন্দ। মা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন একজন বিদূষী, স্বভাবকবিও বটে।আদর করে ছোট্ট জীবনানন্দকে মা ডাকতেন ‘মিলু’। একদিন সকালে গোয়ালা দুধ দিতে এসেছিল সত্যানন্দ দাশগুপ্তের বাড়িতে। বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে বালক মিলুর ইংরেজি কবিতা আবৃত্তি শুনে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সে। মুখ থেকে অবচেতনভাবেই বেরিয়ে এসেছিল, “আপনি বড় ভালো পড়েন গো, দাদাবাবু”।

মিলুর আরেকদিনের ঘটনা। তখন ছিল বর্ষাকাল। মিলুদের বাড়ির আঙিনা সবুজ ঘাসে ভরে গিয়েছে। ফকির নামক এক দরিদ্র চাষিকে সত্যানন্দবাবু আঙিনা পরিষ্কার করতে ডাকেন। ফকির সবুজ নির্মল ঘাসের উপর কাস্তে চালাতে থাকে। সে দৃশ্য দেখে কাতরাতে থাকে বালক জীবনানন্দ। সে বয়সেই কয়েক গোছা ঘাসকেও মনের কুঠুরিতে স্থান দিয়েছিলেন জীবনানন্দ। ঘাস কাটাতে কষ্ট পেয়েছিলেন মিলু! ফকির সান্ত্বনা দিয়ে তাকে বলেছিল—“চিন্তা কইরবেন না দাদাবাবু, কিছুদিন পরেই আবার নতুন, সবুজ, কচি ঘাস জন্মাবে”।

শিশু জীবনানন্দ ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ত। অসুস্থ জীবনানন্দকে নিয়ে কুসুমকুমারী কোথায় ঘুরে বেড়াননি? কলকাতা থেকে দেওঘর, লক্ষ্ণৌ থেকে আগ্রা, দিল্লী থেকে মাদ্রাজ কোথায় যাননি? মায়ের কোলে শুয়ে শুয়ে এভাবেই পুরো ভারত চষে বেড়িয়েছেন জীবনানন্দ। বাবাকে একটু ভয় পেতেন। সব কথার শেষকথা ছিল বাবার কথা। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই বাবার উপনিষদ (হিন্দুধর্মের এক বিশেষ ধরনের ধর্মগ্রন্থের সমষ্টি) পাঠ আর মায়ের মিষ্টি-মধুর গান শুনে তার দিন শুরু হতো।

জীবনানন্দের বাবা সত্যানন্দরা ছিলেন সাত ভাই। জীবনানন্দেরা দুই ভাই, এক বোন। ছোট ভাই অশোকানন্দ নয় বছরের ছোট, আর ছোট বোন সুচরিতা দাশ ষোল বছরের। সব মিলিয়ে একান্নবর্তী সংসার। কবির শৈশবের স্মৃতিগুলো ছিল মধুর।লাজুক স্বভাবী, নিভৃতচারী, অল্পভাষী জীবনানন্দকে সবাই পছন্দ করত। কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ছিল ‘ঝরা পালক’। এটি যখন ছাপা হয়, তখন কবির বয়স আটাশ।

তার তিন বছর পর তিনি বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। বিয়ে করেন রোহিণী কুমার গুপ্তের মেয়ে লাবণ্য গুপ্তকে। তাদের দুটি সন্তান হয়েছিল- মেয়ে মঞ্জুশ্রী, ছেলে সমরানন্দ। জীবনানন্দের বৈবাহিক জীবন সুখের ছিল না। বিয়ের পরও অনেকদিন তাকে বেকার বসে থাকতে হয়েছে। অনেকবার আত্মহননের কথাও ভেবেছেন। তারপর কী মনে করে যেন ফিরে এসেছেন।

কবি ছিলেন চাপাস্বভাবের, যা লিখতেন প্রকাশ করতে চাইতেন না। ভাবতেন লেখা মনে হয় ভাল হয়নি। তাই ছাপতে দিতেন না! কাউকে দেখানোর জন্য নয়, তিনি লিখতেন নিজের জন্য। লিখে ট্রাঙ্ক ভর্তি করে রেখে দিতেন। সারা জীবনে তার প্রকাশিত রচনার সংখ্যা বড়জোর তিনশোর মতো হবে। আপনি জানেন- এখন যা পাওয়া যায়, সেগুলো তার মৃত্যুর পরে উদ্ধার করা। একবার ট্রেনে করে ফেরার পথে কবির ট্রাঙ্ক চুরি হয়ে যায়। ট্রাঙ্কের সাথে সাথে হারিয়ে যায় লেখাপাণ্ডুলিপিগুলো। এগুলোর কয়েকটি পরে উদ্ধার করা গেলেও সব যায়নি। আমরা বঞ্চিত হয়েছি অপ্রকাশিত সেই লেখাগুলো থেকে। সেই লেখাগুলো যদি থাকতো, তাহলে আমাদের সাহিত্য কত কিছু পেতো!

কবির যে ছবি এখন বই-পত্তর, পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়, সে ছবির ও একটা কাহিনী আছে! একবার কবি সপরিবারে দিল্লী বেড়াতে যান। ছোট ভাই অশোকানন্দের বাড়িতে। অশোকানন্দের ঘরে তখন তার সাত বছরের সন্তান অমিতানন্দ। একদিন তারা সবাই মিলে দিল্লী ঘুরতে বের হলেন। সেদিন অশোকানন্দের স্ত্রী জীবনানন্দের একটি ছবি তুলে দেন।
সেই ছবিটি এখন আমরা দেখি! জীবনানন্দের প্রিয় শহর ছিল কলকাতা। বরিশালের ব্রজমোহন কলেজের চাকরি ছাড়ার পর তিনি কলকাতায় চলে যান। কলকাতায় কবি কখনও মেসে ছিলেন, কখনও ছিলেন ছোট ভাই অশোকানন্দের বাড়িতে!

আমরা সবাই জানি প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশ কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় মারা যান! যেদিন ট্রামের দুর্ঘটনাটি ঘটে, তার আগের দিন রেডিও-তে আবৃত্তি করেছিলেন ‘মহাজিজ্ঞাসা’ কবিতাটি। দুর্ঘটনার দিন সকালেও বন্ধুদের সাথে এ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। প্রতিদিনের মতো সেদিন বিকেলেও হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। দুই থোকা ডাবও কিনেছিলেন।

দু’হাতে দুই থোকা ডাব নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন, এমন সময় ঘাতক ট্রামটি কবির উপর চড়ে বসে। গুরুতর আঘাত পান তিনি। কণ্ঠ, উরু ও পাঁজরের হাড় ভেঙে যায়। তার চিৎকার শুনে পাশের দোকানদাররা ও অন্যরা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়। তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধানচন্দ্র রায় কবিকে দেখতে গিয়েছিলেন হাসপাতালে! যমে-মানুষে আটদিনের লড়াই চলে। তারপর সব স্থির হয়ে যায়। জীবনানন্দ তার প্রিয় বাংলা, কলকাতাকে ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ উক্তিটি ছিল— “ধূসর পাণ্ডুলিপির রং সারাটা আকাশ জুড়ে”। সত্যি-ই ধূসর পান্ডুলিপিটা রং  ছড়িয়েছে বাংলা সাহিত্যে, বাংলার আকাশে-বাতাসে-গাছপালা-পাখি-শাখী সব জায়গাতে!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker