চলতি হাওয়াবিনোদন

‘জীবনের গল্প বাকি আছে অল্প!’ কিছু মানুষের জীবনের গল্প কখনো শেষ হয় না

‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুশ, দম ফুরাইলে ঠুস, তবুও মানুষের নাই একটু খানি হুশ’। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের কথায় ও আলম খানের সুরে আশির দশকের প্রথম দিকে এক নবীন গায়কের কন্ঠে এই গানে মুগ্ধ শ্রোতামহল। জুরি বোর্ডের রায়েই সেই নবীন গায়কটিই মহারথীদের হারিয়ে অর্জন করে নিয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সেই যে শুরু, তা নিরবধি চলেছিল প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম।

বাংলা চলচ্চিত্রের গানে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন, একের পর এক জনপ্রিয় গান নিজের কন্ঠে শ্রোতাদের মুগ্ধ করলেন। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় গায়ক ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ খ্যাত এন্ড্রু কিশোর। রাজশাহী বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত শিল্পী ছিলেন, প্রথম প্লেব্যাক আলম খানের সুরে ‘তুফান মেইল’ চলচ্চিত্রে। এরপর প্রতীক্ষা,এমিলের গোয়েন্দাবাহিনীর পর নিজের ক্যারিয়ারের শুভসূচনা হয় ১৯৮২ সালে ‘বড় ভালো লোক ছিল’ সিনেমা দিয়ে। এই সিনেমার ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুশ’র ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাশাপাশি প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে কিংবদন্তী সুরকার আলম খান বেশ গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তিত্ব, উনিও এই সিনেমা দিয়ে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। পাশ্চাত্যর ধারা মিশিয়ে এই জুটির আরেক সাড়া জাগানো গান ‘তুমি যেখানে আমি সেখানে’। আমার সারা দেহ খেয়ে গো মাটি থেকে আমার বুকের মধ্যিখানে’ গান বেজে উঠলেই মনে পড়ে যায় জাফর ইকবালের ‘নয়নের আলো’র মত যুগান্তকারী সিনেমার কথা। বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা জনপ্রিয় গানের এই সিনেমার প্রতিটি গান ব্যাপক সাড়া ফেলে।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের কথা ও সুরে এই সিনেমার সব কটা গানের গায়ক ছিলেন এন্ড্রু কিশোর। ‘বড় ভালো লোক ছিল’ সিনেমার গানের মাধ্যমে যে শুভসূচনা হয়েছিল সেটার পরিপূর্ণ যাত্রা শুরু হয় ‘নয়নের আলো’ সিনেমা দিয়ে। জাফর ইকবালের লিপে উনার আরেক জনপ্রিয় গান ‘চাঁদের সাথে আমি দেবো না তোমার তুলনা’। আশির দশকে ইলিয়াস কাঞ্চনের কন্ঠে তিনি দারুন মানিয়ে যেতেন,এই জুটি অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন।

সহযাত্রী সিনেমার বিখ্যাত গান ‘পৃথিবীর যত সুখ’ থেকে ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে ব্যবসা করা সিনেমা ‘বেদের মেয়ে জোছনা’র সাড়া জাগানো টাইটেল গানটিও উনিই গেয়েছিলেন। এছাড়া ‘ভাই বন্ধু’ সিনেমার ‘ভেঙ্গেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা’,আঁখি মিলন সিনেমার ‘আমার গরুর গাড়িতে” গানগুলো তো রয়েছেই,তবে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতে হয় বিখ্যাত সিনেমা ভেজা চোখ এর ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’ গানটির কথা,মর্মস্পর্শী এই গানটি সব শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে যায়।

বাংলা চলচ্চিত্রে সঙ্গীতের দিক দিয়ে আরেক যুগান্তকারী সিনেমা ‘দুই জীবন’। জাতীয় পুরস্কার জয়ী এই সিনেমার জনপ্রিয় গান আমি একদিন তোমাকে না দেখলে থেকে শ্রুতিমধুর গান তুমি আজ কথা দিয়েছোর মত গান তিনি গেয়েছিলেন। ক্যারিয়ারে দ্বিতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান স্যারেন্ডার সিনেমার সেই কালজয়ী গান ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’ গানের জন্য।

‘ভালোবেসে গেলাম শুধু ভালোবাসা পেলাম না, তুমি আমার কত চেনা, তুমি আরো কাছে আসিয়া’ আলমগীর অভিনীত অন্যতম এই সেরা গানগুলি গেয়েছেন তিনিই, আলমগীরের লিপেই ক্ষতিপূরণ সিনেমার ‘এই দুটি ছোট্ট হাতে’র জন্য অর্জন করেন তৃতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। আশির দশকের সফলতার রেশে নব্বই দশকেও তিনি ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় গায়ক। অনুতপ্ত সিনেমার ‘তুমি এসেছিলে পরশু’ থেকে বিয়ের ফুল সিনেমার ‘তোমায় দেখলে মনে হয়’র মত অত্যন্ত জনপ্রিয় গানগুলো কন্ঠে ধারন করেছেন।

অমর নায়ক সালমান শাহ র সাথেও জুটিটিও বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল,অন্তরে অন্তরে সিনেমার ‘এইখানে দুইজনে নির্জনে’ থেকে আনন্দ অশ্রুর ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা’ গানগুলো আজো জনপ্রিয়। ‘স্বপ্নের ঠিকানা’র গানগুলো বেশ সাড়া জাগিয়েছিল,তবে বিশেষ ভাবে বলতে হয় ‘তোমাকে চাই’ সিনেমার রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কথায় আহমেদ ইমতিয়াক বুলবুলের সুরে সেই যুগান্তকারী গান ‘ভালো আছি ভালো থেকো’,যেটি উনি কন্ঠে ধারন করে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছিয়েছিলেন, এটি বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা সুন্দরতম গান। কুলি সিনেমার ‘আকাশেতে লক্ষতারা চাঁদ কিন্তু একটাই’ তো উনার ক্যারিয়ারে আরেক হিট গান। চিত্রনায়ক রিয়াজের ক্যারিয়ারেও উনার গান বেশ প্রভাবক হয়েছিল। তাঁর উত্থান ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’ সিনেমার সেই গান ‘পড়েনা চোখের পলক’ উনার ই গাওয়া, এছাড়া তুমি হাজার ফুলের মাঝে, তুমি চাঁদের জোছনা নও, ঘুমিয়ে থাকো গো স্বজনী, না বোল না তো রয়েছেই।

আজকের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়ক শাকিব খানের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে জনপ্রিয় গান ‘আমার হৃদয় একটা আয়না’ তো গায়ক তিনিই, এছাড়া আছে ‘কিছু কিছু মানুষের জীবনে’, এক বিন্দু ভালোবাসা দেওর মত জনপ্রিয় গান। উনি সর্বশেষ জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন কি যাদু করিলা সিনেমার ‘চক্ষু দুইটা কাজল কালো’ গানের জন্য। এন্ড্রু কিশোর গত দশক পর্যন্ত অসংখ্য সিনেমায় গান গেয়েছেন, প্লেব্যাকে এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে এলব্যাম ও বের করেন নি, টিভিতেও এসে গান করতেন না। প্লেব্যাকের বাইরে এসে তিনি ইত্যাদিতে এসে প্রথম গান করেন ‘পদ্ম পাতার পানি নয়’, যা বেশ জনপ্রিয়তা পায়। পরবর্তীতে বেশ কয়েকবার ইত্যাদিতে এসেছেন, অন্যান্য অনুষ্ঠানেও বিচারক হিসাবে অংশগ্রহন করেন।

প্লেব্যাকে রুনা লায়লা,সাবিনা ইয়াসমিন ও কনকচাঁপার সঙ্গে জুটি বেঁধে অসংখ্য জনপ্রিয় গান গুলি গেয়েছেন,তিনজনের সাথেই মানিয়ে যেতেন। সুরকারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সান্নিধ্য পেয়েছেন আলম খান ও আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সঙ্গে, এছাড়া আলাউদ্দিন আলী, শেখ সাদী খান থেকে ইমন সাহা সবার সঙ্গে কাজ করেছেন। আর ডি বর্মনের সুরেও গান গেয়েছেন। গীতিকার হিসেবে গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মনিরুজ্জামান মনির, মো: রফিকুজ্জামান থেকে কবির বকুল অনেকের লিখা গান ই গেয়েছেন।

দেশের গন্ডি পেরিয়ে কলকাতাতেও প্লেব্যাকে বেশ কয়েকটি গান করেছেন। সিনেমার নাম হয়তো ভুলে গেছেন অনেকে,তবুও উনার যাদুমাখা কন্ঠের গান শুনলেই মনে পড়ে যায় সেই সিনেমার কথা। বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে উনি সেরা গায়ক হিসেবে সর্বোচ্চ আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। পৃথিবীর এই দুঃসময়ে শ্যামা, খঞ্জনার দেশ থেকে বিদায় নিলেন গানের এই কোকিল। রেখে গেলেন অনন্ত মুগ্ধতা, বহুদিন তার সুরের বহতায় ভাসবো আমরা অবিরল। কানে ভাসবে প্রিয় সুর। আপনি শান্তিতে থাকুন অন্য কোথাও। আপনাকে বিদায় বলা যায়না।

  • হৃদয় সাহা

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker