বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

কিশোর কুমারের যত খামখেয়ালী

আরিফুল আলম জুয়েল: প্রথাগত তালিম ছাড়াই হয়ে উঠেছিলেন বলিউডের অন্যতম প্রতিষ্ঠান। ‘বিস্ময়’ শব্দটা তাঁর জীবনেরই সমার্থক। ইনিই ভারতের একমাত্র শিল্পী যাকে শেষ করার জন্য দেশের নেতা থেকে ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক দল উঠে পড়ে লেগেছিল। একমাত্র গায়ক যিনি আজ অব্দি সরকারের থেকে কোনো সম্মান পাননি।

আয়কর দপ্তরকে লেলিয়ে দেয়া হয়েছিল তাঁর পেছনে, এমনকি আকাশবাণীতে পর্যন্ত তাঁর গান বন্ধ করে দেওয়া হয়। নেপথ্য কন্ঠশিল্পী হিসেবে তাঁকে না নেওয়ার জন্য হুমকি দেয়া হয় সিনেমার প্রযোজক থেকে পরিচালক কে। শাসানো হয় তার গান রেকর্ড করলে নিষিদ্ধ করে দেয়া হবে মিউজিক কোম্পানিকে। তবুও নোয়ানো যায়নি ইস্পাত কঠিন মেরুদন্ডের সেই বাঙালি শিল্পী কে। কি ছিলো তাঁর অপরাধ……. ?অপরাধ ভীষণ গুরুতর। দেশের অলিখিত এক যুবরাজের (সঞ্জয় গান্ধী) দলীয় অনুষ্ঠানে বিনা পয়সায় গান গাইতে রাজি হননি তিনি। ঘাড় বেঁকিয়ে বলেছিলেন “বিনা পয়সায় শোনার জন্য আমার গান নয়!”শুধু কি তাই, আজ পর্যন্ত এমন কোন সঙ্গীত শিল্পী জন্মালো না, যিনি টপ ফর্মে থাকা কোন নায়ককে মুখের ওপর বলতে পারেন তোমার লিপের জন্য আমি গান দেবোনা!

হ্যাঁ, সেটাই বলেছিলেন সেসময়ের বক্স অফিস হিট নায়ক জিতেন্দ্র, মিঠুন চক্রবর্তী আর অমিতাভ বচ্চন কে। বেঁচে থাকতে স্ত্রীকে বলেছিলেন, “আমি যখন থাকবো না তখন দেখো লোকে কেমন খুঁজছে আমায় ! আমার কণ্ঠের ঝলক কারুর গলায় পেলে তাঁকে নিয়ে লোকে পাগল হয়ে যাবে, কিন্তু আমায় পাবে না । “কথা কিন্তু সত্যিতে রুপান্তরিত হয়েছিল, কারন তাঁর নামটা যে কিশোর কুমার!!!আইনজীবী কুঞ্জলাল গঙ্গোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী গৌরীদেবীর ছোট ছেলে আভাসকুমারের জন্ম ১৯২৯-এর ৪ অগস্ট। ব্রিটিশ ভারতের সেন্ট্রাল প্রভিন্সের (আজকের মধ্যপ্রদেশ)-এর খণ্ডোয়া অঞ্চলে। সেখানে এক সম্পন্ন পরিবারের ব্যক্তিগত আইনজীবী হয়ে কর্মরত ছিলেন কুঞ্জলাল। কিশোর কুমার যখন ছোট, তখনই তাঁর দাদা অশোক কুমার হিন্দি সিনেমার প্রতিষ্ঠিত তারকা।

অভিনয় শুরু করেছিলেন আর এক দাদা অনুপকুমারও। অশোককুমার চেয়েছিলেন তাঁর মতো ভাইও অভিনয়কে পেশা হিসেবে গ্রহণ করুন। কিন্তু অভিনয় নিয়ে আভাস আদৌ সিরিয়াস ছিলেন না। অভিনয়ের বদলে আভাস প্রথমে ক্যারিয়ার শুরু করলেন বম্বে টকিজ-এর কোরাস শিল্পী হিসেবে। বিনোদন দুনিয়ায় পা রেখে তিনিও দুই দাদার মতো নিজের নাম পরিবর্তন করলেন। আভাসকুমার গঙ্গোপাধ্যায় থেকে হলেন কিশোর কুমার।খামখেয়ালি আচরণ ছিল কিশোর কুমারের বর্ণময় জীবনের অঙ্গ। তার গান কিংবা অভিনয় নিয়ে আজ কথা বলবো না; বলবো তার মেধা, তার খামখেয়ালীপনা নিয়ে!কিশোর কুমার ছিলেন একাধারে ভারতীয় গায়ক, গীতিকার, সুরকার, অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার এবং রেকর্ড প্রযোজক। সাধারণত তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের সর্বাধিক সফল এবং চলচ্চিত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ নেপথ্য গায়ক হিসেবে বিবেচিত হন।

কিশোর কুমারের চার অদ্ভুত কাহিনী— কিশোর কুমার ৪ই আগস্ট ৪টার সময় জন্ম গ্রহণ করেন এবং বাবা মায়ের ৪র্থ সন্তান। তিনি জীবনে ৪ টি বিয়ে করেন, চলচ্চিত্র জীবনে ৪টি বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ছোটবেলায় নাকি তার গানের গলা ভালো ছিল না একদম। অশোক কুমার পরে বিভিন্ন জায়গায় বলেছিলেন, একবার কিশোর কুমার পায়ে আঘাত পেয়েছিলেন। সেই আঘাত পাওয়ার পর তিন-চার দিন নাকি তিনি শুধু কেঁদেছেন। সেই কান্নার পর তার গলায় কী এক পরিবর্তন এলো, গলায় সুর চলে এলো, আওয়াজ পরিবর্তন হয়ে গেল। তার বাড়ির গেটে একটা বোর্ড ঝুলতো, যাতে লেখা থাকতো – ‘Beware of Kishore’, মানে ‘কিশোর হইতে সাবধান’!কিশোর কুমার কোনদিন গান শেখেন নি, নেন নি কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। সঙ্গীতের কোন রাগ, সূত্র তিনি জানতেন না।নিজের মজুরির বিষয়টা তিনি খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিতেন।

একবার এক প্রযোজক তাঁকে অর্ধেক মজুরি দিয়ে বললেন, বাকিটা কাজ শেষ হবার পর দেবেন। পরদিন তিনি স্টুডিওতে এলেন অর্ধেক গোঁফ আর মাথার অর্ধেক চুল কামিয়ে। বললেন, বাকি টাকা না দেয়া পর্যন্ত প্রতিদিন এভাবেই আসবেন।‘হাফ টিকেট’ সিনেমার বিখ্যাত গান ‘আকে সিধি দিল পে লাগে’। এই গানের নারী ও পুরুষ উভয় কন্ঠ তিনি একাই দিয়েছিলেন। এই গানে কিশোর কুমারের সঙ্গে লতা মঙ্গেশকরের গান গাইবার কথা ছিল।কিন্তু শেষ মুহূর্তে কোন কারণে লতাজি স্টুডিওতে আসতে পারলেন না। পরে কিশোর কুমার একাই পুরোটা গাইলেন। তাঁর বড় ভাই অশোক কুমারের কাছে এক ব্যক্তিগত কাজে গিয়েছিলেন গায়ক-সংগীত পরিচালক শচীন দেব বর্মণ। সেখানে কিশোর কুমারকে গাইতে শুনে সে দিনই ছবিতে গান গাওয়ার জন্য রাজি করান তাকে।

৭০ দশকের মাঝামাঝিতে তার প্রযোজনায় একটি ছবিতে অতিথি শিল্পী হিসেবে অভিনয়ে অস্বীকৃতি জানালে অমিতাভ বচ্চনের জন্য গান না গাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন কিশোর কুমার।১৯৭৫-৭৭ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জারি করা জরুরি অবস্থার বিরোধিতা করে রাষ্ট্রীয় সব অনুষ্ঠান ও মাধ্যম থেকে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। রেডিওতে তার গান প্রচার বন্ধ করা হয়, এমনকি দ্বৈত সংগীতগুলো থেকে তার গাওয়া অংশগুলো কেটে দেওয়া হয়।মধুবালাকে বিয়ে করার জন্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নাম নেন করিম আবদুল।যত বড় পরিচালকই হোক না কেন, সম্পূর্ণ পারিশ্রমিক না পাওয়া পর্যন্ত গান রেকর্ডিং করতেন না। লতা মুঙ্গেশকরের অসম্ভব ভক্ত ছিলেন। তার সম্মানে সব সময় পারিশ্রমিক নিতেন লতার চেয়ে এক টাকা কম। তার অভিনয়ে পাগলামির ছাপ ছিল স্পষ্ট, যা তিনি ইচ্ছা করেই তৈরি করেছিলেন। এমনকি খান্ডোয়ায় তার বাড়ির সামনে নিজেই ‘মেন্টাল হসপিটাল’ লেখা সাইনবোর্ড লাগিয়েছিলেন। কিশোর কুমার কোনো কনসার্টে গান করার আগে মঞ্চের মাপ জেনে নিতেন। মঞ্চের মাপ পছন্দ না হলে গান জীবনেও গাইতেন না। বলতেন, ‘আমার বড় স্টেজ চাই। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি গাইতে পারবো না। আমি নেচে-কুঁদে গাইবো।’ আর মঞ্চে তিনি এমন সব কাণ্ড-কারখানা করতেন যে, বাদকরাও বাজনা থামিয়ে হাঁ হয়ে দেখতেন।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker