ছুটিহোমপেজ স্লাইড ছবি

ঘুরে আসুন বিউটি বোর্ডিং

আরিফুল আলম জুয়েল: ১, শ্রীশদাস লেন, (বাংলাবাজার) ঢাকা-১১০০। ঠিকানা দেখে কেউ কি কিছু আন্দাজ করতে পারছেন; কেউ কেউ হয়তো পারছেন, কেউ কেউ পারছেন না! ঠিকানাটা পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর কাছাকাছি অবস্থিত বাংলাবাজারের শ্রীশ চন্দ্র দাস লেনের! সেই লেন থেকে একটু মোড় নিলেই চোখে পড়বে এই ঐতিহ্যবাহী ঠিকানাটার! ঠিকানাটা একটি বাড়ির। রংচটা হলদে দেয়াল ও শ্যাওলাপড়া দোতালা বাড়িটি খুব সাধারণ একটি বাড়ি মনে হলেও এটি বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও ইতিহাসের এক ভিত্তিভূমি।

প্রায় চারশত বছরের পুরাতন পুরান ঢাকাতে রয়েছে অনেক স্থাপনা, অনেক ঐতিহ্য, অনেক ইতিহাস যা কালের স্বাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে! অগনিত স্থাপনা। আমাদের ইতিহাসেরা ঘুরে বেড়ায় এখনো পুরান ঢাকার অলিগলি জুড়ে। আজ তেমনি এক স্থাপনার গল্প ও ইতিহাস জানাবো আপনাকে৷ যে বাড়িটির কথা বলছিলাম সে বাড়িটির নাম হচ্ছে- ঐতিহ্যবাহী বিউটি বোর্ডিং। এখনো বহাল তবিয়তে টিকে আছে বিউটি বোর্ডিং, তবে নীরব, নিস্তব্ধ, নিস্তরঙ্গ। 

তবে আজকের নীরব বিউটি বোর্ডিং দেখে আপনি ভাবতেও পারবেন না এক সময় কি জমজমাট ছিল এ বোর্ডিং; যে বোর্ডিং এ জড়িয়ে আছে একটি দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাস! আড্ডাবাজির জন্য ওপার বাংলায় যেমন কলকাতার কফি হাউস কিংবদন্তি হয়ে আছে, তেমনি এপারে বিউটি বোর্ডিং হয়ে আছে ইতিহাসের এক জীবন্ত জাদুঘর। মান্না দের কফি হাউজ গানটির বদৌলতে আমরা সাতটি চরিত্রের কথা জানি, যারা কফি হাউজের আড্ডায় মেতে থাকতেন। 

অসংখ্য মানুষ তাই আজও সেই ফ্লেভারটা নিতে কফি হাউজে যান। যতটা না কফি পান করতে, তার চেয়ে বেশি স্মৃতিকাতর হতে। ঠিক একইভাবে আমাদের বিউটি বোর্ডিং আজও কালের সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছে বাঙালিকে স্মৃতির বিরানভূমিতে আচ্ছন্ন করতে। আমাদের বিউটি বোর্ডিং নিয়ে নেই সেরকম কোন বিখ্যাত গান তাই হয়তো আমরা যায় না বোর্ডিং এ স্মৃতিকাতর হতে। 

আজকের প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানে না এ ইতিহাসের কথা। আসলে ১৯৪৯ সালে বাড়িটি ভাড়া নেন মুন্সিগঞ্জের দুই সহোদর নলিনী মোহন সাহা ও প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা। নলিনী মোহন সাহার বড় মেয়ের নাম ছিল বিউটি। তার নামেই তারা গড়ে তোলেন বিউটি বোর্ডিং। 

শুরুতে ছোট আকারে ব্যবসা শুরু করেন, একসময় চাহিদা বাড়তে থাকলে বড় করার চিন্তা থেকে ১১ কাঠা জমিসহ ভবনটি কিনে নেন দুই ভাই। ক্রমেই ব্যবসা হয়ে ওঠে জমজমাট। সেই সাথে আবারও শুরু হয় সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের মানুষের বিচরণ। আর একটু পেছনের কথা না বললেই নয়! ইতিহাস নিয়ে লেখার এই এক ঝামেলা, গল্প যে কখন কোনদিকে মোড় নেয় তা বলা মুশকিল। আবার মূল গল্পে ফিরে যাওয়াও বেশ চ্যালেঞ্জিং। 

এটা আমি প্রায়ই ফেস করি! সাতচল্লিশের দেশভাগের পূর্বে ঢাকার নিঃসন্তান এক জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের জমিদারবাড়ির ভবনে সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় বের হতো ‘সোনার বাংলা’ নামের সাপ্তাহিক পত্রিকা, সাথে গড়ে ওঠেছিল সেটার ছাপাখানাও। 

মূলত তখন থেকেই ঐ ভবনটি হয়ে ওঠে শিল্প-সাহিত্যের মানুষদের আনাগোনায় মুখর। কবি শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতাটিও ছাপা হয় সেই পত্রিকায়। দেশভাগের পর ‘সোনার বাংলা’ কার্যালয় স্থানান্তর হয় কলকাতায়, জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসও চলে যান ভারতে। দুই বছর খালি পড়ে থাকে ভবনটি। তারপরই মুন্সিগঞ্জের দুই ভাই বাড়িটি কিনে নেন। দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের কেন্দ্র হয়ে ওঠে বাংলাবাজার। 

সে সূত্রে কবি-সাহিত্যিকদেরও প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। বাংলাবাজারের পাশেই শ্রীশ দাস লেনের ১ নাম্বার বাড়িটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে সাহিত্যচক্রের সুনিপুণ এক ঠিকানা। সে সময় কবি শামসুর রাহমান থাকতেন আশেক লেনে, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক থাকতেন লক্ষ্মীবাজারে আর বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি শহিদ কাদরীর আস্তানা ছিলো বিউটি বোর্ডিংয়ের পাশেই একটি ভবনে। ফলে একসময় বিউটি বোর্ডিংয়ে আসতে থাকেন সবাই, পরিচিত হন একে অন্যের সাথে। 

আবাসিক হোটেলটিতে চায়ের আড্ডায় মেতে থাকেন দিন থেকে রাত। কেউ কেউ কখনো বা রাতেও থেকে যান সেখানে, সৃষ্টি করেন অসংখ্য শিল্পকর্মের। শুধু শিল্প-সাহিত্য নয়, আরও নানা পেশাজীবী মানুষও আসতে থাকেন সেখানে। আসেন অনেক রাজনীতিবিদও।কবি শামসুর রহমান বিউটি বোর্ডিং নিয়ে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে লিখেছেন, “মনে পড়ে, একদা যেতাম/ প্রত্যহ দু’বেলা বাংলাবাজারের শীর্ণ গলির ভেতরে/ সেই বিউটি বোর্ডিং-এ/ পরস্পরের মুখ দেখার আশায় আমরা কজন।” আমরা কজন বললে হয়ত সংখ্যাটা বোঝানো যাবে না।ভাবছেন ক’জন বলতে অল্প কয়েকজন মানুষ, ভুল ভাবছেন আপনি। 

বিউটি বোর্ডিংয়ের একটি তালিকা থেকে দেখা যায়-  শামসুর রাহমান, শহিদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হক ছাড়াও এখানে নিয়মিত আড্ডা দিতে আসতেন হাসান হাফিজুর রহমান, কবি নির্মলেন্দু গুণ, কলাম লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী, কবি আল মাহমুদ, রণেশ দাসগুপ্ত, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, আহমদ ছফা, হায়াৎ মামুদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, বেলাল চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, সন্তোষ গুপ্ত, ফজল শাহাবুদ্দিন, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, শফিক রেহমান, আসাদ চৌধুরী, ফয়েজ আহমদ, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, সাঁতারু ব্রজেন দাস। এসেছিলেন কিংবদন্তি কৌতুক অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার ও লেখক জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, ভাস্কর নিতুন কুণ্ডু, নায়করাজ রাজ্জাক, টিভি ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানী, সঙ্গীতজ্ঞ সত্য সাহা, অভিনেতা প্রবীর মিত্র প্রমুখ। ঐতিহাসিক বিউটি বোর্ডিংয়ে কিছুদিন থেকেছেন জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ। 

ভাষাসৈনিক গাজীউল হক, কমরেড আব্দুল মতিন, অলি আহাদদের মতো রাজনীতির তরুণ প্রতিভারাও আড্ডা দিতেন এখানে। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এই ঐতিহাসিক স্থানে ‘সোনার বাংলা’ কার্যালয়ে এসেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও পল্লীকবি জসীমউদদীন। 

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ও মহান স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও এসেছিলেন বলে জানা যায়। এখান থেকেই ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হয় কবিতাপত্র ‘কবিকণ্ঠ’, আহমদ ছফার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘স্বদেশ’। আরো বেশ কয়েকটি সাহিত্য সাময়িকীও নানা সময়ে প্রকাশিত হয়েছে।

সব্যসাচীখ্যাত লেখক সৈয়দ শামসুল হকের লেখালেখির জন্য একটা নির্দিষ্ট টেবিল-চেয়ার রাখা ছিল এই বিউটি বোর্ডিংয়ে, যেখানে বসে তিনি কয়েকটি বইও লিখেছেন বলে জানা যায়। যার মধ্যে এক মহিলার ছবি, জনক ও কালো কফিন, আরণ্যক, সীমানা ছাড়িয়ে অন্যতম।

এখানে বসেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলে খ্যাতিমান পরিচালক আব্দুল জব্বার খান। বলা হয়, চিত্রনাট্যের কিছু অংশও এখানে বসে লিখেছিলেন তিনি। সুরকার সমর দাস অনেক বিখ্যাত গানের কথায় সুর বসিয়েছেন এখানেই আড্ডা দেওয়ার ফাঁকেই। একাত্তরের পঁচিশে মার্চ রাতে বাংলার বুকে এক পাশবিক গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তানি হানাদারেরা। 

তিনদিনের মাথায় ২৮ মার্চ অভিযান চালায় বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক আঁতুড়ঘর বিউটি বোর্ডিংয়েও। ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ১৭ জনকে। নিহতদের মধ্যে বোর্ডিংয়ের ম্যানেজার ও অন্যান্য কর্মীর পাশাপাশি ছিলেন মালিক প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা স্বয়ং। প্রাণভয়ে প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহার পরিবার পাড়ি জমায় ভারতে। রাজাকারদের দখলে থাকায় যুদ্ধের সময় খালিই পড়ে থাকে বোর্ডিংটি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহার স্ত্রী প্রতিভা সাহা দুই পুত্র সমর সাহা ও তারক সাহাকে নিয়ে দেশে ফিরে আসেন, আবারও শুরু করেন বোর্ডিং ব্যবসা। কবি শহিদ কাদরী ও বেলাল চৌধুরীর ঐকান্তিক চেষ্টায় আবারও গুণীজনদের পদচারণায় মুখরিত হয় বিউটি বোর্ডিং। কিন্তু কালের বিবর্তনে একসময় রং হারাতে থাকে পুরান ঢাকা, গড়ে ওঠে আজকের নতুন ঢাকা। সেখানেই বসতি গড়েন বেশিরভাগ মানুষ। কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী ও কলাকুশলীরাও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। ফলে বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডা একসময় ম্রিয়মাণ হয়ে ওঠে। 

সবাই ব্যস্ত হয়ে যান, আস্তে আস্তে আড্ডা কমে আসে। আজ তাই বিউটি বোর্ডিং আছে, কিন্তু নেই সেই দিনগুলো। চাইলে ইতিহাস জড়ানো এই জায়গাটায় এক রাত কাটিয়ে আসতে পারেন, কিংবা বন্ধু বান্ধব নিয়ে চাইলেই কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে আসতে পারেন। বিউটি বোর্ডিংয়ে বর্তমানে ২৭টি আবাসিক কক্ষ রয়েছে। এগুলোর কোনোটি সিংগেল বেডের আবার কোনোটি ডাবল বেডের। এগুলোর ভাড়া ২৫০ থেকে শুরু করে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। একসময় এখানে পিঁড়িতে বসে মেঝেতে থালা রেখে খাওয়ানো হতো। 

বিউটি বোর্ডিং এর খাবারের বিশাল নামডাক ছিল একটা সময়। এখনো খাবার ঘরটিতে ঢুকার সাথে সাথেই বাহারি সব খাবারের ঘ্রাণে মন ভাল হয়ে যাবে আপনার। খাবারের তালিকায় রয়েছে ভাত, ডাল, সবজি, শাকভাজি, ভর্তা, বড়া, চড়চড়ি, সরিষা ইলিশ, রুই, কাতলা, বাইলা, তেলাপিয়া, চিতল, পাবদা, ফলি, সরপুটি, শিং, কৈ, মাগুর, ভাংনা, চিংড়ি, চান্দা, বোয়াল, কোরাল মাছ, আইড় মাছের ঝোল সহ বিচিত্র পদ। চিরতরুণ বিউটি বোর্ডিং দেখে আসতে পারেন কিন্তু আপনি চাইলেই; খুব বেশি দূরে নয়! পুরান ঢাকার বাংলাবাজার থেকে একটু এগিয়ে বাঁয়ে মোড় নিলে প্যারিদাস রোড। এই রোডের পাশেই শ্রীশদাস লেন। আর এই লেনের ১ নম্বর বাড়িটিই হচ্ছে বিউটি বোর্ডিং। যাবেন নাকি (যারা দেখেননি) দেখতে বিখ্যাত বিউটি বোর্ডিং!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker