ছুটিহোমপেজ স্লাইড ছবি

টাইটানিক:লোহার জাহাজ ভেঙে গেল কেন বরফের আঘাতে?

সাইফ আতিক: সকল মেটেরিয়ালের একটা বিশেষ প্রোপার্টি আছে, যার নাম, “ডাক্টাইল টু ব্রিটল ট্রানজিশন”। আপনি ফ্রিজ থেকে বরফ বের করে হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি দিলেন, আর আপনার হাতুড়ির লোহাটা গেল ভেঙে? এটা কি কখনো হয়? না এটা হবার কথা নাহ। তাহলে আসল কারণ কী? যেটা আসল কারণ, সেটা হলো টেম্পারেচার বা তাপমাত্রা।

ধাতু/মেটালের উপর তাপমাত্রার প্রভাব ব্যাপক। সোজা ভাবে বললে, তুলনামূলক বেশী তাপমাত্রায় ধাতু/মেটাল নরম/সফট থাকে, যেটাকে ইঞ্জিনিয়ারিং এ বলা হয় “ডাকটাইল মেটারিয়াল’ আর তাপমাত্রা কমে গেলে ধাতু/মেটাল শক্ত হয়ে যায়, বা কাচের মতো ভঙ্গুর হয়ে যায়, আর সেটাকে বলে “ব্রিটল মেটারিয়াল”। ইঞ্জিনিয়ারিং এ সব সময় “ডাকটাইল মেটাল” প্রেফার করা হয়। কারণ বাংলা মুভির মতো সহজে বললে, “ডাকটাইল মেটাল” হলো মচকে যাবে তবু ভাংবে না, আর “ব্রিটল মেটাল” হলো ভেঙে যাবে তবু মচকাবে না। আরো সহজে বললে , একটা জীবিত মোটা সোটা কাচা গাছের ডালে আপনি বসলে সেটা সামান্য বাঁকবে, কিন্তু ভাঙবে না, আবার আপনি যদি সেম সাইজের একটা শুকনা গাছের ডালে বসেন সেটা কট করে ভেঙ্গে যাবার সম্ভাবনা থাকে। এখানে কাঁচা গাছের ডালটা ডাকটাইল মেটেরিয়ালের মতো আচরণ করলো আর শুকনা ডালটা করলো ব্রিটল মেটেরিয়ালের আচরণ।

তারমানে ইঞ্জিনিয়ারিং যেকোন স্ট্রাকচারের মেটেরিয়ালের জন্য একটু বেশি তাপমাত্রা কাঙ্ক্ষিত যাতে স্ট্রাকচারটা ডাকটাইল থাকে, ব্রিটল হয়ে যাতে ভেঙে না যায়। আর এই তাপমাত্রা বা টেম্পারেচার চেঞ্জ হয়ে যাবার কারণে মেটাল বা ধাতু ডাকটাইল (নরম) থেকে ব্রিটল (শক্ত/ভঙ্গুর) হয়ে যাবার প্রক্রিয়াকে বলা হয় “ডাকটাইল টু ব্রিটল ট্রানজিশন”। টাইটানিকের ক্ষেত্রে এখানেই মেটেরিয়াল ডিজাইনিং এ ভুলটা হয়ে গিয়েছিল। টাইটানিক জাহাজের “হাল/স্ট্রাকচার” (ছবিতে কালো অংশ) বানানো হয়ে ছিল “মাইল্ড স্টিল” দিয়ে। এমনিতে অসটেনাইট স্টিলের ডাকটাইল টু ব্রিটল ট্রানজিশন হবার জন্য যে তাপমাত্রা লাগে সেটা বেশ কম (হিমাঙ্কের নিচে বা আশেপাশে) সাধারণত এতো কম টেম্পারেচারে অসটেনাইট স্টিলের বানানো কোন স্ট্রাকচার অপারেট করা হয় না। কিন্তু টাইটানিক জাহাজ এই অস্টেনাইট স্টিলে বানানো ছিলো না, এটার “হাল/স্ট্রাকচার” বানানো হয়েছিল “মাইল্ড স্টিল” দিয়ে।

কারণ সেই সময়টাতে (১৯০৯-১৯১২ সালে) এতো উন্নত প্রযুক্তির স্টিল বানানো সম্ভব ছিলো না যেটা এখন সম্ভব কিংবা হয়তোবা থাকলেও তা ব্যবহার করা হয়নি।জাহাজের স্ট্রাকচারের চেয়ে নান্দনিক সোন্দর্যের দিকে বেশী নজর দেয়া হয়েছে। এনিওয়ে, এখন যে মাইল্ড স্টিল দিয়ে টাইটানিক জাহাজের “হল/স্ট্রাকচার” বানানো হয়েছিল তার “ডাকটাইল টু ব্রিটল ট্রানজিশন” টেম্পারেচার ছিল ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখানে টাইটানিকের এই মাইল্ড স্টিলের “ডাকটাইল টু ব্রিটল ট্রানজিশন টেম্পারেচার” এতো বেশী হবার কারণ, পরবর্তিতে গবেষণায় দেখা গেছে যে, সেই মাইল্ড স্টিলে কার্বণ ছাড়াও সালফার এবং ফসফরাসের ইমপিউরিটি ছিল। কিন্তু ওয়েদার আর আটলান্টিকের পানির তাপমাত্রা খেয়াল করলে দেখা যায়, সেদিন টাইটানিক চলছিল প্রায় -২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের হিমশীতল জলের উপর দিয়ে। এখন টাইটানিক জাহাজের স্টিলের “ডাকটাইল টু ব্রিটল ট্রানজিশন” টেম্পারেচার হলো ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর সেটা চালানো হচ্ছিল দেদারছে -২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আটলান্টিকের শীতল জলের উপর দিয়ে।

যার কারণে যা হবার তাই হলো, জাহাজের কাঠামো আর “ডাকটাইল/নরম স্টিল” থাকলো নাহ, তা হয়ে গেল, ব্রিটল/ভঙ্গুর/শক্ত কাচের মতো কাঠামো। যেটা উপরে বলা সেই শুকনা গাছের ডালের মতোই আচরণ করলো। যখন বরফের সাথে জাহাজের স্টারবোর্ড/ডানপাশটা ধাক্কা দিলো, তখন শুকনো গাছের ডালের মতোই ভেঙ্গে গেল, আর জাহাজের মোট ১৬ টা ওয়াটার টাইট কম্পার্টমেন্টের ৫/৬ টাই প্লাবিত হয়ে গিয়েছিল। জাহাজের মূল ডিজাইন অনুযায়ী, ১৬ টার ভিতর ৪ টা পর্যন্ত ওয়াটার টাইট কম্পার্টমেন্ট প্লাবিত হলে জাহাজ না ডুবে ভেসে থাকতে পারতো কিন্তু যেহেতু ৫/৬ টা ওয়াটার টাইট কম্পার্টমেন্ট প্লাবিত হয়ে গিয়েছিল, সেহেতু সলিল সমাধি ছাড়া টাইটানিকের কপালে আর ভালো কিছুই হবার ছিলো নাহ। আসলে এই “ডাকটাইল টু ব্রিটল ট্রানজিশন টেম্পারেচারই” হলো এই ঘটনার মূল কারণ।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker