জাতীয়হোমপেজ স্লাইড ছবি

টাইম ট্রাভেল কিংবা একটি রহস্যময় ট্রেনের গল্প!

আরিফুল আলম জুয়েল: টাইম লুপ কিংবা টাইম মেশিন বা টাইম ট্রাভেল সম্পর্কে আমরা জানি, বিভিন্ন তথ্যচিত্র সিনেমায় আমরা এর প্রয়োগ দেখেছি। এবার বাস্তবের একটি টাইম ট্রাভেলের কথা বলবো; ঘটনাটি ইতালির একটি ট্রেনের। যাত্রীরা ইতালিতে সফর করেছে ১৯১১ সালে, অথচ প্রমানাদির ভিত্তিতে তাদেরকে পাওয়া গেছে ১৮৪৫ সালে মেক্সিকোতে। এ কিভাবে সম্ভব! ট্রেনটি আসলে এমন, যার কোনো নির্ধারিত সময় ছিল না। হঠাত্‍ দেখা যেত আবার অদৃশ্য হয়ে যেত। কিন্তু কোথা থেকে আসতো? কোথায় যেতো? তা কেউ জানেনা, তার কোন ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত কারোর কাছে নেই।

কেউ বলে ট্রেনটি প্যারালাল ইউনিভার্সে চলে গেছে। আবার কেউ বলে ট্রেনটি টাইম ট্রাভেল করছে যা সময়ের আগে পরে চলছে। তো চলুন না, জেনে নেয়া যাক রহস্যময় ট্রেন “জেনেটি” র সেই ঘটনাটি! ১৯১১ সাল!ইতালির রেলওয়ে কোম্পানি ‘জেনেটি’ একটি নতুন ধরনের ট্রেন উদ্ভাবন করে। যার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র লোকাল সাইট সিন এর জন্য। অর্থাৎ ট্রেন কর্তৃপক্ষের ইচ্ছে তারা যাত্রীদের পুরো ইতালি দেশটি এ ট্রেনের মাধ্যমে ঘুরে ঘুরে দেখাবে। তো সে মোতাবেক ১৯১১ সালের ১৪ ই জুন দুপুরে ট্রেনটি ১০০ জন যাত্রী এবং ৬ জন ট্রেন ক্রু অর্থাত্‍, মোট ১০৬ জন যাত্রী নিয়ে লোকাল সাইট সিন করার জন্য যাত্রা শুরু করে। তাদের গন্তব্য ছিল কাছের একটি রেলস্টেশন।ট্রেনটিকে গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর জন্য এক পর্বতের বুক চিরে তৈরি এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি টানেলের মধ্যে দিয়ে যেতে হতো। তবে আশ্চর্যের বিষয় হল ট্রেনটি টানেলের এক মুখ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে ঠিকই,কিন্তু অন্য মুখ দিয়ে আর কখনো বাইরে বের হয়নি।

প্রথমে স্থানীয় মানুষরা মনে করেছিল ট্রেনটি হয়তো ভিতরে প্রবেশ করার পর খারাপ হয়ে গেছে। তখন তারা রোম পুলিশের সহায়তায় টানেলের মধ্যে প্রবেশ করে। তারা যতই টানেলের ভিতর এগিয়ে যেতে থাকলেন ততই তাদের মনে জিজ্ঞাসা এবং ভয় বাড়তে থাকে। এগিয়ে যেতে যেতে তারা টানেলের অন্য মুখ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু ১৪ ই জুনের ঐ ট্রেনটির কোন নাম নিশানা খুঁজে পায় না। এমনকি ভেতরে কোন দুর্ঘটনার আলামত ও খুঁজে পায় না। ট্রেনটি সেই সুড়ঙ্গে ঢুকেছিল ঠিকই, তবে সেটি আর বাইরে বের হয়নি। পরে ট্রেনটির সন্ধানে অনেকেই টানেলটির ভেতরে গিয়েছেন, কিন্তু হারানো ট্রেনটির কোনো হদিস পায়নি কেউই।

যদিও পাহাড়ের ভেতর দিয়ে তৈরি ওই সুড়ঙ্গের ভেতর অন্য কোনো রাস্তাও ছিল না, যে অন্যদিকে যাবে!এমনকি বিভিন্ন অনুসন্ধানে টানেলটির ভেতর কোনো দুর্ঘটনারও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মাঝপথে রহস্যজনকভাবে ট্রেনটি হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। ১০০ বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও ট্রেনটির কোনো খোঁজ মেলেনি এখনও। এমনকি খোঁজ মেলেনি ট্রেনটির যাত্রীদেরও। বিজ্ঞানীরা অনেক অনুসন্ধান করেও পাননি ঘটনার কোনো যুক্তি বা সূত্র। এখনও বিশ্বজুড়ে এই ভৌতিক ট্রেনটি নিয়ে আলোচনা হয়। তবে আধুনিকমনা অনেকেই বিশ্বাস করেন না ভূতুড়ে এই ঘটনাটি। কিন্তু ঘটনা সত্য !!!

এই ঘটনায় স্থানীয় সব মানুষ ভয়ার্ত ছিল। তারা সব অবাক হয়ে গিয়েছিল, এত বড় ট্রেন টানেল থেকে কোথায় গায়েব হয়ে গেল এই ভেবে ভেবে। আরো পরে একটি লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে, স্থানীয়রা রোম পুলিশের সহায়তায় টানেলটি চেক করার কিছু সময় পরে রোমের রেলওয়ে অফিসে দুজন মানুষ আসে !তারা বললেন তারা ঐ ট্রেনের যাত্রী। ট্রেনটি টানেলে ঢোকার আগেই তারা ট্রেন থেকে লাফ মেরেছিল। কারণ, তাদের অন্যরকম অনুভুতি হচ্ছিল। কোন বিপদ ঘটার আভাস পেয়েছিল। এবং টানেলের মুখেই ধোঁয়ার মতো কিছু দেখেছিল। এ কারনেই তারা ট্রেন থেকে লাফ দিয়েছিল! এই দুই যাত্রীর বয়ান রহস্যময় ট্রেনটির ঘটনাকে নয়া মোড় দেয়। এবং বিষয়টিকে আরও রহস্যজনক করে তোলে। এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে আর না হয়, তাই রেল অথরিটি টানেলটির দুই মুখ বন্ধ করে দেয়। এরপর ঘটনাটি চাপা পড়ে যায়। মানুষ ধীরে ধীরে ভুলে যায়।

ঘটনা কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ১৯১১ সালের এ ঘটনার পর টানেল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধও শুরু হয়ে যায়। একসময় শেষও হয়। এবার চমকপ্রদ ঘটনাটি ঘটে ১৯২৬ সালের দিকে। ঘটনা শুনলে আপনার চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে আমি নিশ্চিত। ঘটনা কিন্তু সত্য; আজগুবি বলার কোন সুযোগ আপাতত নেই। ১৯২৬ সালে হারিয়ে যাওয়া প্যাসেঞ্জারদের মধ্যে একজন যাত্রীর আত্মীয় পুরনো নথিপত্রে এমন একটি ঘটনার উল্লেখ পান, যা শুনে সবাই চমকে যান। এই রিপোর্টে বলা হয়েছে ১৮৪৫ সালে মেক্সিকোর একটি পাগলাগারদে একসাথে একদিনে ১০৪ জন রোগী ভর্তি হয়। এই মানুষগুলো কারা এবং কোন জায়গা থেকে এসেছে তা কেউ জানতো না!কিন্তু, অবাক করা ব্যাপার হল ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পরেই জানা যায় ওই ১০৪ জন মানুষ সকলেই ইতালিয়ান। তারা বলেছেন তারা রোম থেকে এসেছে।

এই মানুষগুলোর বয়ান এবং ঐযে ট্রেন থেকে লাফ দেয়া সেই দুই যাত্রীর বয়ান একদম হুবহু মিলে যায়।তাহলে যে ঘটনা ১৯১১ সালে ঘটেছিল, সেই ঘটনায় হারিয়ে যাওয়া যাত্রীগন ১৮৪৫ সালে কিভাবে মেক্সিকোর একটি পাগলা গারদে ভর্তি হতে পারে? আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো সব যাত্রী বলছে তারা রোম থেকে এখানে এসেছে ট্রেনে করে। কিন্তু রোম থেকে মেক্সিকোর দূরত্ব প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার। এবং এই দুই জায়গার মধ্যে রয়েছে বিশাল আটলান্টিক মহাসাগর। ঠিক আছে মেনে নেয়া হলো, এবার পাগলা গারদে ভর্তি মানুষগুলোর কথা যাচাই করার জন্য রোম থেকে মেক্সিকো যাওয়ার জাহাজ গুলোর প্যাসেঞ্জার লিস্ট চেক করা হয়, কিন্তু সেখানেও কোন যাত্রীর নাম নথিভুক্ত করা ছিল না। তাহলে ঐ পাগলা গারদে একই ভাষায় কথা বলা, একই দিনে ভর্তি হওয়া, একই দেশের ১০৪ জন মানুষ এলো কোথা থেকে? এই ইতালিয় মানুষগুলোর মধ্যে থেকে একজন ব্যক্তির কাছে একটি টোবাকো বক্স পাওয়া যায়। যার উপর কোম্পানির নামের সাথে ১৯০৭ সাল লেখা ছিল‌। ওই বক্সটি আজও মেক্সিকোতে রাখা আছে।

ঘটনা ১৮৪৫ সালের অথচ পাগলাগারদে ভর্তি হওয়া যাত্রীর কাছে থাকা টোব্যাকো বক্সের উপর কোম্পানির নামের পাশে লেখা ১৯০৭ সাল। এ কিভাবে সম্ভব!!! তাহলে টাইম মেশিন কিংবা টাইম লুপ বা টাইম ট্রাভেলে ভ্রমন করেছেন এ ১০৪ জন মানুষ!! ১০৬ জনের মধ্য ২ জন তো আগেই লাফ দিয়েছিল! ট্রেনটি ওই টানেল থেকে কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিল তা আজও এক রহস্য হয়ে আছে। কিন্তু, আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো—ওই ট্রেনটি কয়েকবার রাশিয়া, রোমানিয়া ও ইতালির কয়েকটি স্থানে নাকি দেখা গেছে। এটা গুজব বা জোর করে বিশ্বাসের ব্যাপার নয়! যারা দেখেছে তারা বলেছে যে, তারা যে ট্রেনটি দেখেছে, তা হঠাত্‍ তাদের সামনে এসেছিল, আবার গায়েব হয়ে গিয়েছিল।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছিল ট্রেনটিতে তিনটি কম্পার্টমেন্ট ছিল। একটি লোহার দণ্ড দিয়ে একে অপরের সাথে লাগানো ছিল। এখনো রোমের মিউজিয়ামে ঐ ট্রেনটির একটি মডেল রাখা আছে। বিজ্ঞান কি বলে, এ ঘটনা আসলেই কি ভুতুড়ে নাকি টাইম মেশিন/ট্রাভেল বলে বাস্তবে কিছু আছে!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker