বাক্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

ট্রোজান যুদ্ধের সূত্রপাত হয় যেভাবে

ইসমাইল আহমেদ রুপন: গ্রীক মিথোলজিতে দীর্ঘ দশ বছর ধরে ট্রয় নগরীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংগঠিত হয়; যা ট্রোজান যুদ্ধ হিসেবেও পরিচিত। তিন হাজার বছর পূর্বের ব্রোঞ্জ যুগের প্রসিদ্ধ শহর ট্রয়। সেখানকার অধিবাসীদের বলা হতো ট্রোজান। এভাবেই ঐ যুদ্ধের নামকরণ। ট্রোজান হর্সের উৎপত্তিও সেখান থেকেই। প্রতিবেশী দুইটি নগরী হওয়া সত্ত্বেও ট্রয় এবং স্পার্টার মাঝে এজিয়ান নামক এক বিখ্যাত সাগর বিদ্যমান। অর্থাৎ, একটি থেকে আরেকটি নগরীতে যাতায়াত করতে হলে মাঝখানের সেই সাগরটা পাড়ি দিতে হতো।

বাণিজ্য সংক্রান্ত চুক্তি করবার জন্য স্পার্টায় আগমন ঘটে ট্রয়ের দুই রাজপুত্রের। বড় রাজপুত্রের নাম হেক্টর, সে তার রাজ্যের সেনাপতি। আর ছোটজনের নাম প্যারিস, নিখাত প্রেমিক পুরুষ। যার ঐতিহাসিক প্রেমের কারণেই যুদ্ধটা হয়েছিলো। গ্রীক রাজা মেনেলাউস ট্রয়ের দুই রাজপুত্রকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে স্পার্টায় বরণ করে নেন। তাদের আগমনে নগরীতে উৎসবের রঙ লাগে। যুবরাজদের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। আর ঐ নৈশভোজের সময়ই যুবরাজ প্যারিসের সঙ্গে পরিচয় ঘটে অনিন্দ্যসুন্দরী রানী হেলেনের।

মেনেলাউস নিজেই তার স্ত্রী হেলেনকে প্যারিসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। কিন্তু কে জানতো এই পরিচয়টাই একসময় জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলে পরিণত হবে মেনেলাউসের। হেলেন নামের অর্থ হচ্ছে আলোকবর্তিকা। যার রুপের আলোতে লেখা হয়েছিলো গ্রীক পুরাণ। আর সেই রুপের প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছিলো রাজপুত্র প্যারিস। বয়সে চল্লিশ বছরের বড় হওয়ায়, হেলেন বুড়ো রাজা মেনেলাউসকে বিয়ে করতে রাজি ছিলেন না। রাজা টিনডারিউসের ঘরে জন্ম নিলেও, হেলেনের প্রকৃত পিতা ছিলেন দেবতাদের রাজা জিউস। তার কাছ থেকেই হেলেনকে চেয়ে নেন মেনেলাউস। এভাবেই এই বিয়েটা করতে বাধ্য হন হেলেন। মেনে নিলেও, কখনো মনে নিতে পারেননি বিয়েটা।

তার ভেতর যে শূন্যতা কাজ করতো, সেটা পূরণ করে দিয়েছিলো প্যারিস। প্রথম রাজি না হলেও, পরবর্তীতে অসুখী জীবনের দৈন্যতায় প্যারিসের দিকেও সমানতালে ঝুঁকে পড়েন হেলেন। হেলেনের জন্ম নিয়েও রয়েছে নাটকীয়তা। কোনো এক দিবসে, দেবতাধিরাজ জিউস যখন রাজহাঁসের বেশে ছিলেন তখন একটি ঈগল তাকে তাড়া করে। জিউস সেসময় রাজহাঁস লেডার আশ্রয় প্রার্থনা করে উষ্ণ সান্নিধ্যে আসেন এবং শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। ফলশ্রুতিতে লেডা প্রসব করেন একটি ডিম। সেটার খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসেন হেলেন। সেই হেলেন আর প্যারিসের প্রেম যখন মধ্যগগণে ঠিক তখনই প্যারিসের নিজ রাজ্যে ফিরে যাবার ঘন্টা বেজে উঠলো।

আবেগের বসবর্তী হয়ে প্যারিস লুকিয়ে হেলেনকে সাথে করে নিয়ে ট্রয় এর উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। মাঝসমুদ্রে এসে তার বড় ভাই হেক্টর জানতে পারলেন এই ঘটনা। তিনি সাথে সাথে জাহাজ ঘুরিয়ে হেলেনকে ফেরত দিয়ে আসতে চাইলেন। তবে আদরের ছোট ভাইয়ের অনুনয় বিনয়ের কাছে পরাজিত হলেন। প্যারিস যেভাবে হেলেনকে আদায় করে নিয়েছিলেন, সেটার পেছনে রয়েছে আরেক গল্প। সমুদ্রদেবী থেটিসের বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন সকল দেব-দেবী। সেখানে ছিলেন দেবতাদের রাজা জিউস, তার স্ত্রী হেরা, জ্ঞানদেবী অ্যাথিনা, প্রেম ও সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতি। শুধু আমন্ত্রিত ছিলেন না দ্বন্দ-সংঘাত, কলহ-বিবাদ, নৈরাজ্যের দেবী ইরিস। ডিসকর্ড শদবটির অর্থ বিশৃঙ্খলা। যা ঠিক হারমোনি বা শান্তির একদম উল্টো। এই কারণে ইরিসকে ‘গডেস অফ ডিসকর্ড’ বলা হয়। এবং এজন্যেই তাকে কোনো শুভকাজে আমন্ত্রণ জানানো হতো না।

আমন্ত্রিত না হবার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ঐ বিয়েতে একটি সংকট সৃষ্টি করতে চাইলেন ইরিস। তিনি একটি গোল্ডেন আপেল নিক্ষেপ করেন বিয়ের অনুষ্ঠানে। সেই আপেলের গায়ে লেখা ছিলো- ‘সুন্দরীতম দেবীর জন্য’; যার দাবিদার সেখানে ছিলো তিনজন- হেরা, অ্যাথিনা ও আফ্রোদিতি। সেই সংকট মেটানোর জন্য জিউস বললেন আপেলটি যেন অউডা পর্বতের রাখাল প্যারিসকে দেয়া হয়। প্যারিস যাকে আপেলটি দিবে, তাকেই সুন্দরীদের শ্রেষ্ঠা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এই আপেলটিকে ‘অ্যাপেল অফ ডিসকর্ড’ বলা হয়। যারা অ্যাসাসিন্স ক্রিড গেইমটি খেলেছেন তাদের এই মিথোলজিকাল টার্মগুলো ভালো জানার কথা। তো সেই ‘মহামূল্যবান’ আপেল কার ভাগ্যে জুটবে সেটা নিয়ে জিউসের কথা শুনে তিনজন দেবী তিন রকম লোভ দেখালেন প্যারিসকে।

হেরা জানালেন, তিনি যদি আপেলটি দেন তবে প্যারিসকে সবচাইতে ধনী ও ক্ষমতাবান রাজা বানিয়ে দিবেন। অ্যাথিনা জানালেন, প্যারিসকে সবচেয়ে জ্ঞানী ও খ্যাতিমান করে দেবেন। সবশেষে আফ্রোদিতি বললেন, মর্তের সবচেয়ে সুন্দরী নারীকে প্যারিসের স্ত্রীতে পরিণত করবেন। সুন্দরী বউ এর আশায় আপেলটি আফ্রোদিতিকে দিয়ে দিলেন প্যারিস। এ ঘটনা যখন ঘটে, তখন প্যারিস মেষ চড়াচ্ছিলেন, নিজের পিতৃ পরিচয়ও জানতেন না। পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন তিনি একজন রাজপুত্র এবং জীবনের মোড় ঘুরে যায় তার। এখানে উল্লেখ্য, প্যারিস নিজেও বিবাহিত ছিলেন। তার প্রথম স্ত্রীর নাম ইনোনি। তিনি একজন নিম্ফ ছিলেন। নিম্ফ হলো গ্রিক মিথলজিতে ছোট্ট দেবী চরিত্র, যারা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতেন। সাধারণত সুন্দরী তরুণীদের এই দায়িত্ব দেয়া হতো। তাদের কাজ ছিলো মূলত প্রকৃতিকে সাজানোর।

অর্থাৎ, প্যারিসের ঘরে ইতিমধ্যেই সুন্দরী বউ ছিলো। তবুও তিনি সেই স্ত্রীকে ত্যাগ করেছিলেন শুধুমাত্র হেলেনকে পাওয়ার জন্য। প্যারিস-হেলেনের ভালোবাসা কিন্তু শুরু থেকেই অভিশপ্ত। এদিকে হেলেন স্বেচ্ছায় গৃহত্যাগ করলেও, স্পার্টাসহ গ্রীক রাজ্যগুলোতে খবর ছড়িয়ে যায় যে রানী হেলেনকে অপহরণ করেছেন রাজপুত্র প্যারিস। রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে ফেটে পড়েন হেলেনের স্বামী রাজা মেনেলাউস। নিরুপায় হয়ে তার আপন বড় ভাই আর্পসের রাজা আগামেননের শরণাপন্ন হন। সব শুনে, আগামেনন নিজেদের সম্মান ফিরিয়ে আনার জন্য সমস্ত গ্রীক রাজার সাহায্য প্রার্থনা করেন। গ্রীক সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্ব দেন অ্যাকিলিস। প্রায় এক হাজার জাহাজের বহর নিয়ে ট্রয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় সেই বিশাল বাহিনী। ঠিক এখান থেকেই সেই ট্রোজান যুদ্ধের মূল গল্পের সূত্রপাত হয়।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker