চলতি হাওয়াজাতীয়বিশেষ খবরহোমপেজ স্লাইড ছবি

তালেবান, আমেরিকান ও আফগানিস্তান

শামীম আহমেদ: যুদ্ধে বিদেশী শক্তির Collaborator বা সোজা বাংলায় রাজাকাররা অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখবেন মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত বা ধনী সম্প্রদায় হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা চিন্তা করেন। এই যে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী গ্রামে-গঞ্জে যাদের বাড়িতে যেয়ে খাওয়া-দাওয়া করত, পরামর্শ নিত, বেশীরভাগ চেয়ারম্যান গোছের মানুষজন ছিল। আর শহরে সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী শ্রেনীর মানুষ। এই সম্প্রদায়ের মানুষরা টাকা বানাইতে চায়, জীবনের ভয়ে আতংকে থাকে এবং তাদের আদর্শ-টাদর্শ তেমন থাকে না। একই ঘটনা অন্যান্য দেশের যুদ্ধে, যেমন ইরাক, আফগানিস্তান, ভিয়েতনাম, এমনকি প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও দেখবেন।

গরীব মানুষরা সাধারণত দাসত্ব করে না, অর্থের জন্য তারা দেশকেও বেঁচে দেয় না। রিকশাওয়ালা, মুদি দোকানি, চা বিক্রেতা, সবজি বিক্রেতা এদের মধ্যে আপনি কমই রাজাকার পাবেন। একইভাবে অন্য দেশেও রাজাকার বা কোলাবোরেটররা দেখবেন গরীব মানুষ না, মধ্যবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত কিংবা ধনী শ্রেনীর। কোন দেশ যখন যুদ্ধাবস্থায় থাকে না, তখনও দেখবেন কিছু মানুষ এম্বেসি ঘেঁষা হয়। এরা নানা বিদেশী এম্বেসিকেন্দ্রিক আচার-অনুষ্ঠানের নিয়মিত ভোক্তা। একটা সুন্দর ওয়ানের গ্লাস হাতে নিয়ে দেশের যে কী খারাপ অবস্থা সেটা নিয়ে বিদেশী দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সাথে হা-হুতাশ করবে। দেশের সংস্কৃতির মূল component গুলোকে disown করে দূতাবাসসমূহের নিজস্ব সংস্কৃতিকে অন্তরে ধারণ করে তাদের কাছাকাছি যাবার চেষ্টা করবে। এই জিনিস নতুন কিছু না। শত বছর ধরে চলে আসছে। মন দিয়ে খেয়াল করলে আপনার আশেপাশেও দেখবেন এমন অনেককে। এরা সবাই অর্থ-বিত্তওয়ালা মানুষ। অনেকেই সমাজে প্রভাবশালী, তবে দেশের বিপদের সময়, শাহবাগ আন্দোলনে, হেফাজত দেশ দখল করার সময়, বাংলা ভাই এদেশকে আফগানিস্তান বানানোর সময় এরা ড্রয়িংরুমে বসে থাকে।

আফগানিস্তানে গত ২০ বছর এমন হাজার হাজার collaborator, মার্কিন দখলদার বাহিনীর সাথে হাত মিলিয়ে দেশের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। এখন ২০ বছর পর আমেরিকানরা যখন স্বার্থ উদ্ধার করে চলে যাচ্ছে, তখন এদের হয়েছে বিপদ। তালেবান এসে নিঃসন্দেহে এদের অনেককে জবাই করবে, কোন আইন-আদালতের ধার ধারবে না। নিজের দেশ, সংস্কৃতি, সভ্যতাকে বেচে দিয়ে ২০ বছর আরাম-আয়েশে থাকলেও এখন তাদের দূর্দিন। এই কোলাবোরেটরদের জন্য আমার তেমন দুঃখ নাই। তবে আমার দুঃখ আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষের জন্য। আমেরিকানরা যা দরকার নিয়ে চলে গেল। কোলাবোরেটরদের কপালে যা জোটার তাই জুটবে, সেটাই তাদের প্রাপ্য। তালেবানরাও ২০ বছরের শোধ নিয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে।

কিন্তু যে সাধারণ মানুষগুলো শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, বাসস্থানকে ঘিরে একটা স্বাভাবিক জীবনের আশা করছিল তাদের কী হবে? অনেক জায়গায় এই তালেবানরা নাকি এলাকার মেয়েদের উঠিয়ে নিয়ে বিয়ে করছে, মেয়েদের স্কুল বন্ধ করে দিচ্ছে, ছেলেদের বাধ্য করছে তাদের বাহিনীতে যোগ দিতে। এর চাইতে দুঃস্বপ্ন মানুষের জীবনে আর কী হতে পারে? একটা মানুষ তার বিশ্বাস, তার স্বপ্ন, তার ধর্ম নিয়ে নিজের মতো বাঁচবে এটা আমি আশা করি। – একটা শিশু যদি স্কুলে যেতে চায়, তবে সে যাবে। – একজন নারী যদি একটা ব্যবসা করতে চান, তিনি করবেন। – একজন পুরুষ যদি দাঁড়ি না রাখতে চায়, সে রাখবে না। – একজন বৃদ্ধ যদি টিভি দেখতে চায়, সে দেখবে। – একজন কিশোর যদি ক্রিকেট খেলে মাশরাফি হইতে চায়, সে হবে। এই সব চাওয়া তো আহামরি কিছু না! কেউ যদি নামাজ পড়তে চায়, সে পড়বে, কিন্তু কেউ যদি নামাজের সময় ঘুমাতে চায়, তবে সে ঘুমাবে – এটাও তো তার মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে নাকি?

ইসলাম ধর্মের নিয়ম না মানার জন্য যে কেউ দোজখে যেতে পারে, এখানে কোন রাষ্ট্র ব্যবস্থা হানা দিতে পারে বলে মনে করি না। চরম কট্টর সৌদিরা একসময় মেয়েদের গাড়ি চালাতে দিত না, এখন দেয়। একসময় আজানের সময় দোকান পাট খোলা রাখা যেত না, এখন যায়। সব দেশই এগুচ্ছে, এগুচ্ছে কারণ তারা নিজেদের জনগণের চাহিদা বুঝে, খাপ খাইয়ে নিয়েছে। আজকে আমেরিকানরা যদি ২০ বছর ধরে আফগানিস্তান শোষণ না করত, তাহলে হয়ত আফগানিস্তানেও একটা গ্রহণযোগ্য সরকার তৈরী হতে পারত, যারা অল্প-স্বল্প হলেও তাদের জনগণের টুকটাক দাবি-দাওয়া মানত। কিন্তু আমেরিকা ও তার তাবেদারদের স্বার্থপর আগ্রাসনের ২০ বছরে আফগানিস্তানে কোন জনগণের সরকার গঠিত হয়নি, যারা তাদের মানুষের মনে কথা বোঝার চেষ্টা করবে। বরঞ্চ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে তালেবানরা আরও শক্তিশালী হয়েছে, তালেবান ও আফগানদের জীবন থেকে ২০ বছর হারিয়ে গেছে।

তারা আসলে ২০২১ এ আসেনি, এখন ২০০১ এই রয়ে গেছে, শক্তিশালী হয়েছে গোঁড়ামি ও আগ্রাসন। ইসলাম ধর্মের প্রচারক হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর দুই স্ত্রী হযরত খাদেজা (রাঃ) ও হযরত আয়েশা (রাঃ) এর মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। তাদের কাছে সবকিছু খুলে বলতেন, তাদের পরামর্শ নিতেন, এমনকি যুদ্ধাবস্থায়ও। নারী বলে তো তাদের অবজ্ঞা করেন নাই। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কাউকে ঘাড়ে ধরে নামাজ পড়াইছেন, এমনও শুনি নাই। কাউকে জোর করে মুসলমান বানাইছেন, তাও পড়ি নাই। সুতরাং ইসলামের দোহাই দিয়ে তালেবানরা সবাইকে সবকিছু জোর করে করাইতে পারে – এইটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য না। তারা ইসলামকে কেন্দ্র করে সরকার চালাইতে পারে, কিন্তু মানুষ সেটা মানবে কিনা তাদের সে অধিকার দিতে হবে।

তালেবানরা যে জোর-জবরদস্তি করে তা মেনে নেবার বা সমর্থন করার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু এটা অবশ্যই বলতে হবে তালেবানের চাইতে আফগানিস্তানের বড় ক্ষতি করছে আমেরিকানরা। তারা যখন ইচ্ছা হবে একটা দেশ দখল করবে, আর তাদের নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের পর চলে যাবে – এটা তো হতে পারে না। তারা এখন পর্যন্ত দুনিয়ার কোন দেশে গায়ের জোরে ঢুকে সেখানকার অবস্থার উন্নতি করছে? না ইরাক, না আফগানিস্তান, না ভিয়েতনাম না অন্য কোন দেশ। ১৯৭১ এ এরা বাংলাদেশকেও স্বাধীন হতে দিতে চায় নাই। আমেরিকা দেশটা চালায় জঘন্য কিছু মানুষ। আফগানিস্তানের জনগণের জন্য যখনই মন খারাপ হবে, দুটো লাইন লিখবেন, তার একটা লাইন যেন হয় আমেরিকার বিরুদ্ধে। তার পরের লাইন তালেবানের বিরুদ্ধে।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker