বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অব সৃজিত মুখার্জী!!!

শুভ সরকার: সৃজিত মুখার্জীর প্রথম সিনেমা ‘অটোগ্রাফ’ যখন মুক্তি পায়, এই সিনেমা সঞ্জীবনী সুধার মতন জীবন্ত করে দিয়ে যায় মৃতপ্রায় কয়েকটি বিষয়কে। প্রথমত- আর্ট ফিল্মকে। আমরা যদি নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে ২০০৮-২০০৯; এই সময়ের কথা ভাবি, এ সময়ে বাণিজ্যক ফিল্মের বাইরে যেসব আর্টফিল্ম এসেছে, সেগুলোর অধিকাংশই খুব উচ্চমার্গের। সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে সেগুলো খাপ খায় না। তাদের রুচির সাথেও অতটা মেলে না। ঋতুপর্ণ ঘোষ, বুদ্ধদেব দাসগুপ্ত, অপর্ণা সেন, তরুন মজুমদার; প্রখ্যাত পরিচালকেরা তখন যে আর্টফিল্ম বানাতেন, সেগুলোর অডিয়েন্স নির্দিষ্ট।

এই নির্মাতারাও সেগুলো জানতেন। তাই তাদের নির্মাণগুলোও হতো সেরকম। ২০০৯-১০ সালের দিকে কিছু তরুণ নির্মাতা এলেন বাংলায়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বাংলায় রইলেন না। চলে গেলেন বলিউডে। সুজিত সরকার, সুজয় ঘোষের কথা বলা যেতে পারে উদাহরণ হিসেবে। বাদবাকিরা রইলেন টলিউডে। যাদের মধ্যে অন্যতম সৃজিত মুখার্জি। বানালেন- অটোগ্রাফ। এই সিনেমার কথাবার্তা সাম্প্রতিক অতীতের সিনেমাগুলোর মতন উচ্চমার্গের না। গড়পড়তা মানুষের কথাবার্তা, আটপৌরে জীবন-কিসসা, সহজ হাসিকান্না এখানে৷ ন্যারেশন স্টাইল নিপাট, সহজবোধ্য। খুব আহামরি কোনো ট্রিটমেন্ট নেই, কিন্তু যতটুকু যা আছে, মানু্ষের হৃদয়ে দাগ কাটার জন্যে যথেষ্ট। দ্বিতীয়ত- ‘অটোগ্রাফ’ জীবিত করে বাংলা গানকেও।

বাংলা গানে ‘তুমি’ ‘আমি ‘চিরদিন’ ‘এই পথ’ বদলে যায়। সেখানে জায়গা দখল করে- শুকনো পেঁয়াজকলি, জাহাজের মাস্তুল, ডাল-ভাত, ট্রামলাইন। বাংলা সিনেমার গানে হালফিল এক পরিবর্তনের জন্ম হয় এই সিনেমার মধ্যে দিয়ে। জন্মায় অনুপম রায়ের মতন শিল্পীরাও। তৃতীয়ত- এই সিনেমার মধ্যে দিয়ে জন্ম হয় টালিউডের বটগাছ প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জী’রও। এই সিনেমা তাকে ‘নায়ক’ থেকে ‘অভিনেতা’ই যেন বানায়। প্রসেনজিৎ এর এই ‘পাল্টে যাওয়া’ মডেল অনুসরণ করে এরপর আরো অজস্র তারকা নিজেদের খোলনলচে পালটে ফেলেন। একঘেয়ে ছাইভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতন পূনর্জন্ম হয় তাদের। সৃজিত পালটে দেন অভিনেতা-অভিনেত্রীর সংজ্ঞাও। সৃজিত মুখার্জির ‘অটোগ্রাফ’ বাঙ্গালী দর্শককে বিস্তর আশাবাদী করে; সিনেমা নিয়ে, সংস্কৃতি নিয়ে, পালটানো সময়ের আলো নিয়ে। সেই আশাবাদ আরো পোক্ত হয়, যখন ‘অটোগ্রাফ’ এর পরের বছর সৃজিত মুখার্জী ‘বাইশে শ্রাবণ’ নিয়ে আসেন। বাংলায় প্রপার থ্রিলার হয়ই না।

যেগুলো কচ্চিৎ কদাচিৎ হতো, সেগুলোও বাহুল্য দোষে দুষ্ট হয়ে মুখ থুবড়ে পড়তো। সেই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে ‘থ্রিলার’ জনরায় যে কাজ তিনি দেখান, তা আবার চমকে দেয় অডিয়েন্সকে। এই সিনেমার ‘প্রবীর রায়চৌধুরী’ হয়ে যায় বাঙ্গালীর স্মৃতিতে বহুদিন রাখার মতন এক চরিত্র। তবে দর্শকের বোঝা হয়ে ওঠে না, সৃজিত তখনও তার আস্তিন থেকে তুরুপের তাস অর্থাৎ ‘বেস্ট থ্রিলার’ বের করেননি। সেটা নিয়ে একটু পরেই কথা বলবো। ‘বাইশে শ্রাবণ’ এর পরের বছর আসে ‘হেমলক সোসাইটি।’ মেটাফোরিকাল এক পটবয়লার। আরেকটি দারুণ কাজ। এখানে দ্রষ্টব্য, তার প্রথম তিনটি সিনেমাতেই তিনি হেঁটেছেন তিনরকম ভিন্ন পথে। প্রত্যেকটা সিনেমার ট্রিটমেন্ট ভিন্ন, সাটল ম্যাসেজ ভিন্ন। যেন খোলনলচে বদলে বদলে একেকটি নির্মাণ নিয়ে তিনি আসছেন। এক নতুন নির্মাতার পরপর তিন ছবি, তিনটিই হিট। অসাধ্যসাধন! এই হ্যাটট্রিক সাকসেসের পর টালিউডে তখন সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম সৃজিত মুখার্জি। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা, এরপর চাকরির নিরাপদ জগত পেয়েও তা ছেড়ে সিনেমার এই ভীষণ অনিশ্চিত জগতে ঝাঁপ দেয়ার যে দুঃসাহস তিনি দেখিয়েছিলেন, সে দুঃসাহস এর সুফলই যে তিনি পাচ্ছেন…তা মানুষ বুঝতে পারে, বুঝতে পারেন সৃজিতও।

এরপর তিনি বানালেন ‘মিশর রহস্য৷’ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কাকাবাবু’ সিরিজের গল্প নিয়ে সিনেমা। মুগ্ধ করার মতন কোনো কাজ না। তবে উড়িয়েও দেওয়া যায় না। সিনেমাটা ব্যবসাও করে বেশ। সৃজিত যেন এই সিনেমাটা নিয়ে খানিকটা দম নিলেন। বর্শা নিক্ষেপ করার আগে শরীরটা একটু পেছনে হেলাতে হয়, যাতে বর্শা সর্বশক্তিতে নিক্ষেপ করা যায়। সেজন্যেই একটু পেছনে হেলে সৃজিত মুখার্জি যে বর্শা ছুড়লেন, সেটির নাম ‘জাতিস্মর।’ বাংলা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম সেরা সিনেমাগুলোর মধ্যে অনায়াসে স্থান দেয়ার মতন এক সিনেমা। কী কনসেপ্ট, কী এক্সিকিউশন, কী মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট, দুর্দান্ত!এই সিনেমার মুগ্ধতা কাটতে না কাটতেই তিনি আস্তিন থেকে বের করলেন তুরুপের সেই তাস, যার নাম ‘চতুষ্কোণ।’ বাংলায় এই থ্রিলারের চেয়ে বেস্ট থ্রিলার এখনো বানানো সম্ভব হয়নি। সামনেও সম্ভব হবে কি না, জানা নেই কারো। সৃজিত মুখার্জি তখন খ্যাতির মধ্যগগনে। দাপিয়ে বেড়াছেন অখণ্ড আকাশে। প্রখর প্রতাপে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিচ্ছেন ইন্ডাস্ট্রির অর্থোডক্স মান্ধাতার যুগের যাপিত কনসেপ্টকে। বুঝিয়ে দিচ্ছেন তার স্বমহিমা। মানুষ তখন ‘সৃজিত মুখার্জি’ বলতে অজ্ঞান। লাইমলাইট প্রায় পুরোটাই নিজে কেড়ে নিয়েছেন, আশেপাশের কাউকে দাঁড়াতে দিচ্ছেন না। অনেকে ভালোবেসে তাকে ‘টলিউডের ক্রিস্টোফার নোলান’ নামেও ডাকা শুরু করেছে। সৃজিত মুখার্জি কোনো কাজ করলেই সেটি দুর্দান্ত হবে… এই ধ্যানধারণা মানুষের হৃদয়ে বদ্ধমূল হতে শুরু করেছে।

সৃজিত মুখার্জি নিয়মিত প্রশংসা-সমুদ্রে তিনবেলা স্নান করছেন। সবই দারুণ যাচ্ছে। কিন্তু…ঠিক এরপরেই শুরু হয় বিশাল এক ছন্দপতন। তিনি এলেন ‘নির্বাক’ সিনেমা নিয়ে। ‘নির্বাক’ যারা বুঝলো, তাদের ভীষণ পছন্দ হলো। কিন্তু গড়পড়তা বহু দর্শকই এই সিনেমার সাটল ম্যাসেজ ধরতে পারলো না। সিনেমা ব্যবসাসফল হলো না। তবে তাও মানা গেলো, একজন নির্মাতা যদি এক্সপেরিমেন্টাল কাজ করেন, সেটা ব্যর্থ হলেও তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা যায়। সে হিসেবে ‘নির্বাক’ রইলো আলাদা ক্যাটাগরিতে।’রাজকাহিনী’ এলো এরপর। দেশভাগ নিয়ে কাহিনী। খুব কনভিন্সিং হলো না। চরিত্রগুলোর ডাইমেনশন খুব ভালো ধরা গেলো না। মান্টোসহ কিছু লেখকের মর্মস্পর্শী কিছু গল্পকে এক্সিকিউট করার প্রচেষ্টা ঠিক সৃজিত-সুলভ হলো না। কিসের যেন একটা খামতি র‍য়ে গেলো। এই সিনেমার হিন্দি অ্যাডাপ্টেশন- ‘বেগমজান’ হলো বলিউডে। তথৈবচ অবস্থা বজায় রইলো সেখানেও। শেক্সপিয়ারের ‘জুলিয়াস সিজার’ ও ‘অ্যান্টনি ও ক্লিওপেট্রা’কে একসাথে মিলিয়ে বানালেন ‘জুলফিকার।’ দুটি গল্পকে রীতিমতো গুবলেট পাকালেন। চরিত্রগুলোর মেকআপ থেকে শুরু করে অভিনয়, অ্যাকশন…সবই কৃত্রিমতার চরম পরাকাষ্ঠা হয়ে রইলো। ‘জুলফিকার’ থেকে এ জিনিস তাই খুব স্পষ্ট – সৃজিত মুখার্জি আর যা-ই পারুক, অ্যাকশন মুভি বানাতে পারেন না। মানুষ এ সত্যটি বুঝতে পারলেও কেন যেন সৃজিত মুখার্জিই বুঝতে পারলেন না তা। সে কারণেই হয়তো পরবর্তীতে বানালেন ‘ইয়েতি অভিযান।’ ‘কাকাবাবু’ সিরিজের ‘মিশর রহস্য’কে তাও একটু পাতে দেয়া গিয়েছিলো। এই সিনেমাকে পাতে দেয়াই গেলো না। হাস্যকর ক্লাইম্যাক্স এবং খুবই দুর্বল অ্যাকশনের এ সিনেমা মুখ থুবড়ে পড়লো আবার।

সৃজিত যে অ্যাকশন সিনেমাতে দুর্বল, সেটা তিনিই আবার হাতেকলমে প্রমাণ করলেন। বামপক্ষ সমান ডানপক্ষ। প্রমাণিত। ‘উমা’, ‘এক যে ছিলো রাজা’,’ শাজাহান রিজেন্সি’ এলো পরপর। এই সিনেমাগুলোর একটিতেও প্রথমদিকের সৃজিতকে খুঁজে পাওয়া গেলো না। একই স্ট্রাকচার বারবার ফলো করলেন তিনি। গল্পগুলোর গভীরে তলালেন না। উপর দিয়ে ভাসা ভাসা গল্পে অসমাপ্ত পরিণতি দেখালেন। ‘ভিঞ্চি দা’ খুবই গড়পড়তা এক কাজ হলো। ‘গুমনামি’ মোটামুটি ভালো হলেও ইতিহাসের প্রাসঙ্গিক গলিঘুঁজির অনেককিছুই তিনি সিনেমায় আনলেন না। সে কী প্রপার রিসার্চের অভাবে, নাকি নিষ্ঠার অভাবে, নাকি সময়ের অভাব, নাকি নেহায়েত গড়িমসি করে.. তা কেউ জানে না। গত বছরে মুক্তি পেলো ‘বাইশে শ্রাবণ’ এর সিক্যুয়েল ‘দ্বিতীয় পুরুষ।’ বিস্মিত হলাম এটা ভেবে, দুই সিনেমার নির্মাতাই স্বয়ং একজন! এ সিক্যুয়েল আগের ‘বাইশে শ্রাবণ’কেই ডোবালো অনেকটা। সিনেমার পাশাপাশি এলেন ওয়েব সিরিজে।

‘ফেলুদা ফেরত’ সিরিজের ‘ছিন্নমস্তার অভিশাপ’ এ মোটামুটি কাজ দেখালেন। কিন্তু সর্বনাশ করলেন ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’ ওয়েব সিরিজে। এই সিরিজের নির্মাতা যে ‘জাতিস্মর’ সিনেমারও নির্মাতা, এ সত্য হজম করতে অনেকেরই ধাক্কা লাগবে, সময় লাগবে, লাগা উচিতও। সৃজিত মুখার্জি নিজের জনপ্রিয়তার জোরে এখনও টিকে আছেন। প্যান্ডোরার বাক্স থেকে শেষ যে বিষয়টি বেরিয়েছিলো, তার নাম- আশা। সেই আশায় ভর করেই মানুষ এখনো এই পরিচালকের কাজ দেখেন। যখন তার নতুন নির্মাণ বেরোয়, মানুষ প্রতিবারই আশা করেন, ‘অটোগ্রাফ’ অথবা ‘চতুষ্কোণ’ এর সেই পুরোনো সৃজিত হয়তো ফিরেছেন এইবার। কিন্তু কোনোবারেই সেই পুরোনো সৃজিত আর ফেরেন না। গুজব শোনা যায়, দেড় দুই দিনেও আজকাল শুটিং শেষ করেন তিনি। স্ক্রিপ্ট দুই আড়াই ঘন্টায় বানান। যারা একসময়ে তাকে ‘টলিউডের ক্রিস্টোফার নোলান’ বলতেন, তারাই এখন তাকে প্যারোডি করে বলেন, ‘ওদিকে আছে নোলান, এদিকের ইনি ঝোলান।’ হাতে এখনও বিস্তর কাজ তার। সামনের পাঁচটি সিনেমার ঘোষণা ইতোমধ্যেই দিয়ে দিয়েছেন তিনি৷ ওয়েব সিরিজ তো রইলোই। কিন্তু এভাবে যদি এগোতে থাকেন তিনি, ‘যা খাওয়াচ্ছি, তাই খাও’ মনোভাবে যদি ট্রিট করতে থাকেন দর্শককে, তাহলে ‘সৃজিত মুখার্জি’ নামক ফানুশ মানুষের হৃদয়াকাশে কতদিন বুক ফুলিয়ে উড়বে, তা বিস্তর ভাবনার বিষয়।

কবে তার বোধোদয় হবে, বা, আদৌ হবে কি না, অর্থের কারিকুরিতে সমস্ত সৃজনশীলতা বিসর্জন দিয়ে তিনি এভাবেই আস্তাকুঁড়ে ফেলার মতন কাজ দিতে থাকবেন কি না, সেটা প্রশ্ন। তবে যদি এটাই হয়, যদি অর্থ ও জনপ্রিয়তার গিমিকেই নিয়মিত বিভ্রান্ত হতে থাকেন তিনি, তাহলে যেসব মানুষ তাকে ঘিরে বাংলা সিনেমার এই রদ্দি ইন্ডাস্ট্রি পাল্টানোর স্বপ্ন দেখেছিলো, তাদের সাথে প্রচণ্ড বিশ্বাসঘাতকতা হবে। বিশ্বাসঘাতকতার যে প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। এখন এই বিশ্বাসঘাতকতা তিনি সামনেও বজায় রাখবেন কি না, এই প্রশ্নটাই থাকবে সৃজিত মুখার্জির কাছে। আশা করি, তিনি কোনো একদিন সদুত্তর দেবেন।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker