জাতীয়বাক্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

পলাশীর যুদ্ধ, বেনিয়া স্বার্থ ও ইতিহাসের প্রতিশোধ

২৬৪ বছর আগে ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে কর্নেল রবার্ট ক্লাইভের অধিনায়কত্বাধীন ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীর হাতে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। ওই ঘটনার এক সপ্তাহ পরে ইংরেজ পক্ষের হাতে ধৃত বাংলার শেষ নবাব মির্জা মুহাম্মদ সিরাজ উদ দৌলাকে হত্যা করা হয় যা করা হয়েছিলো রবার্ট ক্লাইভ ও সিরাজ উদ দৌলার সেনাপ্রধান সৈয়দ মীর জাফর আলি খানের মাঝে সম্পাদিত চুক্তি মোতাবেক। মীর জাফরের জৈষ্ঠ পুত্র মীর মিরন ছিলেন ওই হত্যাকান্ডের প্রধান কুশীলব।

উল্লেখ্য পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের পাঁচজন সেনা-অধিনায়কের মধ্যে তিনজন বিশ্বাসঘাতকতামূলকভাবে ইংরেজের পক্ষ গ্রহণ করেন। বিশ্বাসঘাতক ওই তিনজন ছিলেন সেনাপ্রধান সৈয়দ মীর জাফর আলি খান, সেনাপতি ইয়ার লতিফ খান ও সেনাপতি রায় দুর্লভরাম। এছাড়া তাদের সাথে ছিলেন আমির চাঁদ ওরফে অমি চাঁদ ওরফে উমি চাঁদ, রাজবল্লভ এবং ‘জগৎশেঠ’ মাধব রাই ও তার চাচাতো ভাই স্বরূপ চাঁদ। শেষোক্ত দু’জন ছিলেন মারোয়াড়ি বেনিয়া। উল্লেখ্য, ‘জগৎশেঠ’ নামটির ব্যপারে কিছু বিভ্রান্তি আছে। অনেকেই মনে করেন এটি একজনের নাম। কিন্তু আসলে এটি একটি উপাধী যার প্রথম ধারক ছিলেন মানিক চাঁদের পুত্র ফতেহ্ চাঁদ – তিনিই প্রথম ‘জগৎশেঠ’ – সেটা ১৭২৩ সালের কথা। ‘জগৎশেঠ’ ফতেহ্ চাঁদ ছিলেন অবিশ্বাস্য রকমের ধনী।

প্রখ্যাত বৃটিশ ইতিহাসবিদ রবার্ট অর্মি (১৭২৮-১৮০১) এর মতে ফতেহ্ চাঁদ ছিলেন “richest man of the time in the known world” (ঐ সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি)। আর বংশপরম্পরায় সর্বশেষ অর্থাৎ দশম ‘জগৎশেঠ’ ছিলেন গোলাব চাঁদের পুত্র ফতেহ্ চাঁদ যিনি ১৯১২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। বঙ্গদশে মারোয়াড়ি বেনিয়াদের আগমন ঘটে ১৭৯০ দশকে যখন পাটনা হতে মানিক চাঁদ নামে এক মারোয়াড়ি ঢাকায় এসে ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেন। তখন ঢাকা ছিলো রেশমি ও সুতি বস্ত্র এবং আফিম ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু। এদেশে মোঘল আগ্রাসনের সাথে তাদের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিলো। মোঘল বাহিনীর সাজসজ্জা, অস্ত্রপাতি ও গোলাবারুদ অর্থায়ন সহ নিজ ব্যবসার পাশাপাশি তারা ছিলেন মূলতঃ মোঘল শাসক; স্থানীয় জমিদার; পাট, আফিম ও নীল উৎপাদনকারী এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অর্থায়নকারী তথা ব্যবসায়িক জামিনদার।

অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে এদেশে সাধারণ চাষীর দুঃসহ ঋণগ্রস্ততার পেছনে মারোয়াড়ি বেনিয়াদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিলো। তখন সুদের কারবারে তারাই ছিলেন একচ্ছত্র অধিপতি। আর তাদের সেই ঋণচক্রের যাঁতাকলে পড়ে লক্ষলক্ষ চাষী তখন নিঃস্ব ও সর্বশান্ত হয়ে পড়ে; অনেকে আত্মহত্যাও করে। এমতাবস্থায় আর্থিক স্বার্থজনিত কারণে ঢাকায় বাংলার মোঘল দেওয়ান মুর্শিদ কুলি খানের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠায় মানিক চাঁদ সেই সম্পর্কের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেন। ১৭০৪ সালে বাংলা দেওয়ানির রাজধানী ঢাকা হতে মাখসুসাবাদে স্থানান্তরিত হলে মানিক চাঁদও তার ঢাকার ব্যবসা গুটিয়ে সেখানে স্থানান্তর করেন। উল্লেখ্য মুর্শিদ কুলি খান তার নামানুসারে পরবর্তীতে ওই স্থানের নামকরণ করেন মুর্শিদাবাদ। এ’সময় স্থানীয় মুঘল শাসকশ্রেণীর সাথে ঘনিষ্ঠতা, আনুগত্য, আর্থিক সহায়তা ও নির্ভরযোগ্যতার কারণে দিল্লি সম্রাটের নিকট হতে তিনি ‘নগরশেঠ’ (নগরের পোদ্দার বা ব্যাংকার) উপাধি পান।

মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত হন তার দত্তকপুত্র ফতেহ্ চাঁদ যিনি একই যোগ্যতায় ‘জগৎশেঠ’ (বিশ্বের পোদ্দার বা ব্যাংকার) উপাধিতে ভূষিত হন। তিনিই ছিলেন প্রথম ‘জগৎশেঠ’। সেই পরাম্পরায় দ্বিতীয় ‘জগৎশেঠ’ হন ফতেহ্ চাঁদের প্রপৌত্র মাধব রাই। এছাড়া আরেক অর্থাৎ তৃতীয় ‘জগৎশেঠ’ ছিলেন মাধব রাই এর চাচাতো ভাই স্বরূপ চাঁদ। পলাশীর যুদ্ধে বাংলা-বিহার-ওড়িশার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ দৌলার সাথে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন তার সেই সেনাপ্রধান সৈয়দ মীর জাফর আলি খান এবং ধনাঢ্য বেনিয়া উমিচাঁদ সহ পক্ষত্যাগী আরো কয়েকজনের মধ্যে ছিলেন উল্লিখিত দুই ‘জগৎশেঠ’। উল্লেখ্য ওই দুই ‘জগৎশেঠ’ প্রকাশ্যে নবাবের আনুগত্য স্বীকার করলেও তলেতলে শুধু ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে যোগসাজশ করাই নয় বরং তাদের অপর দুই প্রতিপক্ষ ও শত্রু ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ফ্রেঞ্চ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথেও তলেতলে সম্পর্ক রক্ষা করে চলতেন এবং ওই তিন পক্ষকেই গোপনে নিয়মিতভাবে অর্থসহায়তা দিতেন।

তাই বাংলায় বিশ্বাসঘাতক বলতে প্রথমেই যার নাম উঠে আসে সেই মীর জাফর আলি খানের চেয়েও অনেক বেশী ভয়ঙ্কর বিশ্বাসঘাতক ছিলেন ওই দুই ভাই – দুই ‘জগৎশেঠ’ – যারা পেছন থেকে কলকাঠি নেড়ে, ষড়যন্ত্র ও অর্থায়ন করে বাংলার স্বাধীনতা হরণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছিলেন। আর ইতিহাস সাক্ষী বাংলায় মুঘল আগ্রাসন সহ পরবর্তীতে ইংরেজদের দালালি করা, এদেশে নীলচাষে অর্থায়ন ও গরীব চাষীর গলায় ঋণের ফাঁস ঝুলিয়ে তাদের সর্বশান্ত করতে যারা মুখ্য ভূমিকা রাখে পশ্চিম ভারতের মারওয়াড় অঞ্চল হতে আগত মারোয়াড়ি সম্প্রদায়ের একাংশ ছিলো তাদের অন্যতম। বলাই বাহুল্য ওইসব বিশ্বাসঘাতকের কারণে ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ সালে এদেশে তাদের প্রথম উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় যার ফলশ্রুতিতে এদেশে প্রায় দু’শো বছরের ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠা পায়।

তবে ইতিহাসের করুণ প্রতিশোধ – পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজ উদ দৌলা তার নিজ সহকর্মী ও সুবিধাভোগীদের ষড়যন্ত্রের বলী হলে বহুকাঙ্ক্ষিত বাংলার মসনদে দু’দফায় মাত্র পাঁচ বছর আসীন থাকার পর মুখ্য বিশ্বাসঘাতক সৈয়দ মীর জাফর আলি খান কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় করুণভাবে মৃত্যুবরণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বাসঘাতক সিরাজের অন্যতম সেনাপতি ইয়ার লতিফ খান পলাশী যুদ্ধের পর নিরুদ্দেশ হয়ে যান। ধারণা করা হয় ইংরেজের গোপন ঘাতকের হাতে তিনি নিহত হন। তৃতীয় বিশ্বাসঘাতক সিরাজের আরেক সেনাপতি রায় দুর্লভরাম ইংরেজের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক পদোন্নতির পরিবর্তে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। তবে সেখান থেকে কোনক্রমে রক্ষা পেলেও কলকাতায় পলাতক, নিঃস্ব ও সর্বশান্ত অবস্থায় তাঁর করুণ মৃত্যু। চতুর্থ বিশ্বাসঘাতক উমি চাঁদ ইংরেজের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক পরাজিত সিরাজের দখলিকৃত ধনরত্নের ৫% অংশ বাবদ ৩০ লক্ষ টাকা হতে বঞ্চিত ও প্রতারিত হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং উন্মাদ অবস্থায় রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে একসময় তার মৃত্যু হয়।

পঞ্চম বিশ্বাসঘাতক রাজবল্লভ পদ্মায় নৌকাডুবিতে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। ধারণা করা হয় ওই নৌকাডুবির পেছনেও ইংরেজের হাত ছিলো। এছাড়া মীর জাফর আলি খানের পরে বাংলার তৎকালীন নবাব মীর মুহাম্মদ কাশিম আলি খান ১৭৬৩ সালে বিহারের মুঙ্গের দূর্গে পঞ্চম ও ষষ্ঠ বিশ্বাসঘাতক দুই ‘জগৎশেঠ’ – মাধব রাই ও স্বরূপ চাঁদকে হত্যা করে তাদের মৃতদেহ দূর্গের প্রতিরক্ষা বাঁধের বাইরে নিক্ষেপ করেন। এছাড়া সিরাজ হত্যার প্রধান কুশীলব মীর মিরনকে হত্যা করে তারই নতুন প্রভু ইংরেজ শক্তি। বলাই বাহুল্য নবাব সিরাজ উদ দৌলার প্রতি তার পক্ষত্যাগী সহকর্মী ও সুবিধাভোগীদের বিশ্বাসঘাতকতার মূল্য তাদের নিয়তি ও তাদের ক্ষুদ্রস্বার্থের প্রভু ইংরেজ বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে এভাবেই চুকিয়ে দেয়। একেই বলে ইতিহাসের প্রতিশোধ।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker