লাইফস্টাইলস্বাস্থ্যহেলথ টিপসহোমপেজ স্লাইড ছবি

প্রাণঘাতী জ্বর আর জাদুর গাছের বাকল!

রাগিব হাসান: প্রচণ্ড জ্বরে লোকটার গা পুড়ে যাচ্ছে। থর থর করে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে। অনেক দিন আগের কথা। আর এই লোকটা হল দক্ষিণ আমেরিকার আন্দেজ পর্বতমালার পাদদেশে (আজকের পেরু যেখানে) বাস করা এক আদিবাসী গোত্রের মানুষ। সময়টা আজ থেকে প্রায় পাঁচশো বছরেরও বেশি আগে। ইউরোপীয়রা সদ্য খোঁজ পেয়েছে আমেরিকা মহাদেশের। এলাকাটা বেশ জঙ্গলে ভর্তি। পোকামাকড় মশা দিয়ে ভর্তি। সেখানকার মানুষদের গড় আয়ু কম। অনেক মানুষই জ্বরে মারা যায়। সারা গায়ে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে — প্রচণ্ড গরম হয়ে যায় দেহ, তার পর আসে মৃত্যু। গোত্রের সবাই ভাগ্যের কাছে নিজেকে সমর্পন করে দিয়েছে। এই জ্বরের তো আর কোন চিকিৎসা নেই।

কী সেই জ্বর? তখনকার দিনের মানুষেরা জানতো না কেন এই জ্বর হয়। স্যাঁতস্যাতে ডোবা নালা বা জলাভূমি জাতীয় জায়গাতে বেশি হয় এই রোগটা। কেবল দক্ষিণ আমেরিকাতেই না, সারা বিশ্বের সবখানেই ছড়িয়ে আছে এই রোগ। দুই হাজার বছর আগে গ্রিক কিংবা রোম সাম্রাজ্যের সময়েও এই রোগে ভুগে মারা যেত প্রচুর মানুষ। কেন এই রোগ হয়, তা কেউ জানতো না। তবে জলাভূমির পাশে পঁচা গন্ধের জায়গাতে বেশি হয় দেখে এই রোগের একটা জুতসই নাম বেরিয়ে গেছিলো — পঁচা বাতাসের রোগ — ইতালিয় ভাষায় পঁচা (mal) আর বাতাস (aria) –এই দুই শব্দ মিলে জ্বরটাকে সবাই বলতো ম্যালেরিয়া।

এই রোগের কোন চিকিৎসা সেসময় মানুষ জানতো না। বিশ্বের ইতিহাসে কোটি কোটি মানুষ মারা গেছে এই রোগে। এখনো এই একবিংশ শতকেও এই রোগ আছে ছড়িয়ে — ২০১৮ সালেই প্রায় ২৩ কোটি মানুষের ম্যালেরিয়া হয়েছিল, মারা গেছে ৪ লাখ মানুষ। এক অর্থে ম্যালেরিয়া এখনো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতি রোগের একটি। কলম্বাসের মাধ্যমে আমেরিকাতে ইউরোপীয়রা যাবার আগে এই রোগ সেখানে ছিল না। কিন্তু ইউরোপের লোকেরা ভাগ্য আর সোনাদানার অন্বেষণে আমেরিকাতে হানা দেয়ার পর থেকেই ছড়িয়ে যায় রোগটা সেখানে। আর এই রোগে আক্রান্ত হতে থাকে সেখানকার আদিবাসীরা।

শুরুতে বলা সেই আদিবাসী লোকটি এই ম্যালেরিয়াতেই আক্রান্ত হয়েছিল। আমরা এখন জানি এই রোগ ছড়ায় মশার কামড়ে, মশার দেহে বয়ে আনা প্লাজমোডিয়াম জীবাণুর জন্য। কিন্তু বহু বহু কাল আগে দক্ষিণ আমেরিকার দুর্গম জঙ্গলের সেই মানুষটি সেটা জানতো না। আর জানা ছিল না এর চিকিৎসা। প্রচণ্ড জ্বরে প্রলাপ বকতে বকতে মানুষটি আশ্রয় নিল একটা গাছের তলায়। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে, শরীর হয়েছে দুর্বল। তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ। পানি দেয়ার কেউ কাছে নেই। চোখে পড়লে পাশের একটা গাছের সামনে বৃষ্টির পানি জমে আছে। অনেক কষ্টে লোকটা হামাগুড়ি দিয়ে সেই গাছটার কাছে পৌছে গেল। চুকচুক করে খেয়ে নিল পানি। উহ কী বাজে স্বাদ। প্রচণ্ড তিতা পানিটা। তার পরেও তৃষ্ণার্ত বলে কথা — লোকটা অগতির গতি হিসাবে সেই পানিটাই পান করে নিল। তার পর দুর্বল শরীরে শুয়ে পড়ল গাছের তলায়। ক্লান্তিতে চোখ বুঁজে এলো। এখন কেবল মৃত্যুরই অপেক্ষা।

পরদিন সূর্যের আলো চোখে পড়ায় ঘুম ভাঙলো লোকটার। একী? মৃত্যু তো আসেনি। বরং জ্বর চলে গেছে ম্যাজিকের মত। শরীরটাও ঝরঝরে লাগছে। কিন্তু কীভাবে? বিদ্যুৎচমকের মত লোকটার মনে পড়ে গেল আগের দিনের কথা। গাছের তলার সেই তিতা পানি খেয়েছিল সে। নির্ঘাৎ সেই পানির কাজ এটা। তাড়াতাড়ি করে আরো একটু পানি খেয়ে নিল সেখান থেকে। পানিটা এত তিতা কেন? খেয়াল করে দেখল, সেই গাছের বাকল ঝরে পড়েছে সেখানে। বাকল থেকে একটা তিতকুটে রস মিশে গেছে পানির সাথে, তাই পানিটা এতো তিতা। লোকটা সাক্ষাত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরে এলো। তাঁর এই গল্প ছড়িয়ে গেল পুরো গোত্রের কাছে। কারো এই জ্বর হলে সেই জাদুর গাছের বাকল সিদ্ধ করা তিতকুটে পানি খেয়ে নিত। ব্যস, সেরে যেত সেই জ্বর।

দক্ষিণ আমেরিকায় তখন ইউরোপীয়রা হানা দিয়েছে। স্পেনের লোকেরা দখল করছে এক এক করে সব জায়গা। কিন্তু জঙ্গলের জায়গাগুলোতে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে, আর মারা যাচ্ছে প্রচুর মানুষ। ভাগ্যাণ্বেষী ইউরোপীয়দের এসেছে জেসুইট মিশনারীরা — ধর্ম প্রচারের জন্য। এই জেসুইট মিশনারীরা ১৫৭০ সালের দিকেই খেয়াল করল, স্থানীয় আদিবাসীরা কিন্তু ম্যালেরিয়ায় অতটা মরছে না। কিন্তু কেন? খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, তারা একটা গাছের বাকলের রস খেয়ে বেঁচে যাচ্ছে এই জ্বর থেকে। ম্যালেরিয়ার এই চিকিৎসার কথা আরো বেশি ছড়ালো এর পঞ্চাশ বছর পরে। গল্প চালু আছে, পেরুর স্পেনীয় ভাইসরয় (গভর্নর) এর স্ত্রী কাউন্টেস অফ চিঙ্কোন আক্রান্ত হল ম্যালেরিয়াতে। সব ইউরোপীয় চিকিৎসা যখন ব্যর্থ হলো, তখন জেসুইট মিশনারীরা পরামর্শ দিল, স্থানীয় আদিবাসীদের এই গাছের বাকলের রস খেয়ে দেখার। আর সেটাতেই সারলো এই অসুখটা। তার পর থেকেই ছড়িয়ে গেল ইউরোপে এই জাদুকরী চিকিৎসার কথা

স্পেনীয় এই কাউন্টেসের গল্প সত্যি কি না তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু একথা সত্যি, জাদুকরী এই গাছের বাকলের কথা ছড়িয়ে গেল ইউরোপে। গাছটার নাম সিঙ্কোনা, কিন্তু স্থানীয় অধিবাসীরা কেচুয়া ভাষায় এই গাছের নাম দিয়েছিল কুইনকুইনা। ইউরোপে আমদানী হতে লাগলো এই গাছের বাকল। বাকলটাকে গুড়া করে সেই গুড়া থেকে বানানো বড়ি হল ম্যালেরিয়ার ধন্বন্তরী চিকিৎসা। ইউরোপের অনেক রাজা মহারাজারাও ম্যালেরিয়া থেকে সেরে উঠলো এই বড়ি খেয়ে।

এর পরের অধ্যায় ১৮২০ সালে। ফরাসী বিজ্ঞানী পিয়েরে পেলেতিয়ে এবং জোসেফ কাভেন্তু সিঙ্কোনা গাছের বাকলের মূল উপাদান খুঁজে পেলেন। এর নাম দেয়া হল কুইনাইন (quinine)। ব্যাপকভাবে ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হল এই কুইনাইন। ১৯৪৪ সালের আগে পর্যন্ত এই গাছের বাকলই ছিল কুইনাইনের একমাত্র উৎস। তবে সেবছর আমেরিকান বিজ্ঞানী উডওয়ার্ড আর ডোরিং কৃত্রিম কুইনাইন আবিষ্কার করেন। আর তার পরে বের হয় আরো অনেক ওষুধ।

সারা বিশ্বে এখনো ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব আছে। করোনা ভাইরাসের সাম্প্রতিক মহামারীর আগে কিন্তু অন্যান্য নামকরা কুখ্যাত রোগ নয়, বরং এই ম্যালেরিয়াতেই বিশ্বের বিশাল জনগোষ্ঠী আক্রান্ত হত প্রতিবছর। কিন্তু ইতিহাসের নানা সময়ে যেভাবে ম্যালেরিয়ায় মানুষ মারা গেছে, কুইনাইনের আবিষ্কারের পর থেকে তা কমে এসেছে বটে। আর সেই কৃতিত্বটা দিতে হয় নাম না জানা দক্ষিণ আমেরিকার সেই আদিবাসী মানুষটাকে, যার কারণে আমরা পেয়েছি প্রাণঘাতী ম্যালেরিয়ার এই ধন্বন্তরী ওষুধটাকে।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker