জাতীয়বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

বাংলা পপ সংগীতের মুকুটহীন সম্রাট

আরিফুল আলম জুয়েল: ১৯৭১ সাল। যুদ্ধ চলছে, দেশকে মুক্ত করার যুদ্ধ! ছেলেটি কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন বাড়ি থেকে। প্রথমে কুমিল্লা, তারপর সেখান থেকে হেঁটে আগরতলা। ছেলেটি তার বয়সী অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা। লিকলিকে গড়ন, গড়পড়তা বাঙালি তরুণদের চেয়ে দীর্ঘদেহী। অন্য রকম এক ব্যক্তিত্বের অধিকারী। না, মোটেও রাশভারী নয়, বরং উল্টো। অফুরন্ত প্রাণশক্তি, বন্ধু-অন্তঃপ্রাণ, আড্ডার মধ্যমণি। সারা দিন হইহুল্লোড় আর বন্ধুদের নিয়ে গলা ছেড়ে গান।

আগরতলা থেকে মেঘালয়ে গিয়ে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ২ নম্বর সেক্টরে যোগ দেন। সেখানে দুই মাস প্রশিক্ষণ শেষে সম্মুখযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট ছিল কুমিল্লার সালদায়। সফলভাবে সেই অপারেশন সম্পন্ন করার পর সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ তাঁকে ঢাকায় গেরিলা অপারেশন পরিচালনার জন্য সেকশন কমান্ডারের দায়িত্ব দেন। গুলশান ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় তাঁরা বেশ কয়েকটি দুঃসাহসী অপারেশন পরিচালনা করে পাকিস্তান বাহিনীর ঘুম হারাম করে দেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘অপারেশন তিতাস’। এর মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকা শহরের গ্যাস পাইপলাইন ধ্বংস করে দেওয়া। জ্বি, ছেলেটি কিংবদন্তিতুল্য শিল্পী আজম খান।

আমাদের পপসম্রাট, পপগুরু আজম খান। তখন ২১ বছর বয়স তাঁর! ১৯৭১–এর ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নারকীয় হত্যাকাণ্ড এবং তৎপরবর্তী সময়ে তাদের অত্যাচার-নির্যাতন আজম খানকে করে বিক্ষুব্ধ। সিদ্ধান্ত নেন যুদ্ধে যাবেন তিনি। মাকে কথাটা বলতেই মা বললেন বাবার সঙ্গে কথা বলার জন্য। ভয়ে ভয়ে বাবার কাছে অনুমতি চাইলেন আজম। কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন সরকারি কর্মকর্তা আজম খানের বাবা। তিনি ভেবেছিলেন বাবা হয়তো ‘না’ বলবেন। কিন্তু আজম খানকে অবাক করে দিয়ে তাঁর বাবা বললেন- ‘যুদ্ধে যাচ্ছিস যা, দেশ স্বাধীন না করে ফিরবি না।’ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না আজম!

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে আজম খান তাঁর সহযোদ্ধাদের নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করেন। ঢাকায় প্রবেশের প্রাক্কালে মাদারটেকের কাছে ত্রিমোহনীতে এক সম্মুখযুদ্ধে পরাজিত করেন পাকিস্তান বাহিনীকে। ক্যাম্পে থাকাকালীন আজম খান বাটি আর চামচকে বাদ্যযন্ত্র বানিয়ে গান করতেন। আর এর মধ্য দিয়ে চাঙা রাখতেন মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর অমর গ্রন্থ ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে লেখা— ‘২০ আগস্ট ১৯৭১। একটি তাঁবুতে আলো জ্বলছে। সেখান থেকে ভেসে আসছে গানের সুর—“হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ।” বুঝলাম আজম খান গাইছে। আজম খানের সুন্দর গলা। আবার অন্যদিকে ভীষণ সাহসী গেরিলা, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা।’ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আজম মেলাঘরে পাহাড়ের পাদদেশে টিনের বাসন ও চামচ দিয়ে তাল ঠুকে গান গাইতেন, সঙ্গে ছিল অনেক তরুণ যোদ্ধা। এ দৃশ্য সত্যিই ভোলার নয়!

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। অনেক ক্ষেত্রে যুবসমাজ বিভ্রান্ত, কেউ কেউ বিপথগামী। এই যুবকদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে আজম সংগীতকে বেছে নেন অস্ত্র হিসেবে। পশ্চিমা রক সংগীতের আদলে তিনি বাংলা সংগীতে যুক্ত করেন এক নতুন ধারা। তাঁর সৃষ্ট ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’ অল্প কিছুদিনের মধ্যে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। অনেকেই আজম খানকে বাংলার বব ডিলান হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ষাটের দশকে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বব ডিলানের গান যেভাবে মুক্তিকামী মানুষকে সাহস জুগিয়েছে, তেমনি করে আজম খানের গানও অনুপ্রাণিত করেছে এ দেশের অসংখ্য তরুণ-তরুণীকে। সংগীতের ওপর তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, কিংবা কারও কাছে সে অর্থে গান শেখেননি তিনি। অথচ তিনিই বাংলা পপ সংগীতের মুকুটহীন সম্রাট।

কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন না গুরু! তবে কেউ, সে যে যন্ত্রই হোক, ভুল বাজালে সঙ্গে সঙ্গে তিনি তা ধরে ফেলতেন এবং শুধরে দিতেন। এ হচ্ছে আমাদের আজম খান। ২০১১ সালের ৫ জুন পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান তিনি। ২০১০ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। আজম খান ১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আজিমপুর সরকারি কলোনির ১০নং ভবনে জন্ম নেন। তার পুরো নাম মাহবুবুল হক খান। বাবা আফতাব উদ্দিন আহমেদ ও মা জোবেদা খাতুন। তারা চার ভাই ও এক বোন। ১৯৫৫ সালে আজম খান প্রথমে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সাল থেকে কমলাপুরে থাকতেন পরিবারসহ। সেখানেই আমৃত্যু ছিলেন।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ে আজম খান পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তখন ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৭০ সালে টিঅ্যান্ডটি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে এইচএসসি উত্তীর্ণ হন। ১৯৭২ সালে বন্ধু নিলু আর মনসুরকে নিয়ে ব্যান্ডের অনুষ্ঠান শুরু করেন। ওই বছরই তার ‘এত সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ ও ‘চার কালেমা সাক্ষী দেবে’ গান দুটি বিটিভিতে প্রচারের পর ব্যাপক প্রশংসিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে বিটিভিতে ‘রেললাইনের ঐ বস্তিতে’ শিরোনামের গানটি গেয়ে দেশব্যাপী আলোচনায় চলে আসেন তিনি। আজম খানের গাওয়া জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে- ‘আমি যারে চাইরে’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘একসিডেন্ট’, ‘অনামিকা’, ‘অভিমানী’, ‘আসি আসি বলে’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘পাপড়ি’, ‘বাধা দিও না’, ‘যে মেয়ে চোখে দেখে না’ ইত্যাদি। গানের পাশাপাশি ১৯৮৬ সালে ‘কালা বাউল’ নামে হিরামন সিরিজের নাটকে অভিনয় করেন। এছাড়াও, ২০০৩ সালে শাহীন-সুমন পরিচালিত ‘গডফাদার’ সিনেমায় নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি।

২০০৩ সালে ক্রাউন এনার্জি ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রথম মডেল হন আজম খান। সর্বশেষ ২০১০ সালে কোবরা ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনে মডেল হয়েছিলেন এই পপ সম্রাট। গুরুর বিখ্যাত গানগুলোর পেছনের ইতিহাস শুনলেও অবাক হবেন- গুরু একদিন হাইকোর্টের মাজারে যান। সেখান থেকে বেরিয়ে রিকশা করে বাসায় ফিরছিলেন। রিকশা ভাড়া দিতে গিয়ে দেখেন মানিব্যাগ নেই! বুঝতে বাকি রইল না মাজারেই হাওয়া হয়ে গেছে সেটা। কিছুটা দুঃখ আর হতাশা থেকে সৃষ্টি হলো অসম্ভব জনপ্রিয় এক গানের— ‘হাইকোর্টের মাজারে কত ফকির ঘুরে, কজনা আসল ফকির; প্রেমেরও বাজারে কত প্রেমিক ঘুরে কজনা আসল প্রেমিক।’ গুরুর বাসায় দোতলায় ভাড়া থাকত মেয়েটা। তার সঙ্গে প্রেম হয়ে যায় গুরুর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর শুভ পরিণতিতে গড়ায়নি প্রেম। প্রচণ্ড কষ্ট নিয়ে তিনি গান বাঁধলেন— ‘সারা রাত জেগে জেগে কত কথা আমি ভাবি; পাপড়ি কেন বোঝে না; তাই ঘুম আসে না।’

১৯৭৪–এর দুর্ভিক্ষের সময় আজম খান একদিন রেললাইনের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। অসংখ্য অভুক্ত শিশু তাঁকে ঘিরে ধরল সাহায্যের জন্য। তাঁর কাছে যা ছিল সব দিয়ে দিলেন। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে তিনি তৈরি করলেন কালজয়ী এক গানের— ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে; জন্মেছিল একটি ছেলে; মা তার কাঁদে; ছেলেটি মরে গেছে; হায় রে হায় বাংলাদেশ।’

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker