আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণহোমপেজ স্লাইড ছবি

বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ

মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে যে কয়েকটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে সভ্যতা গড়ে উঠতে দেখা যায় তার মধ্যে যোগাযোগের সুব্যবস্থা অন্যতম। এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ও দীর্ঘতম সড়ক পথ গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের কথাই ধরুন, এটি বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থেকে শুরু হয়ে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া হয়ে পাকিস্তানের পেশাওয়ারের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের কাবুল পর্যন্ত পৌছায়।

আধুনিক সড়কের পূর্ববর্তী সংস্করণটি সম্রাট শের শাহ শুরি নির্মাণ করেন (তিনি ঘোড়ার ডাকেরও প্রচলন করেন)। অথবা রেশম পথ বা সিল্ক রোডের কথা বলা যেতে পারে। এটি খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত এশিয়ার উপমহাদেশীয় অঞ্চলগুলো মধ্য দিয়ে পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়া, ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলকে সংযুক্ত করে এই অঞ্চলগুলির মধ্যে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় মিথস্ক্রিয়াঘটিত একটি প্রাচীন বাণিজ্যিক পথ। এটি গড়ে ওঠে খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকে চীনের হ্যান রাজবংশের আমলে। দশম শতাব্দীতে চীনের সং রাজবংশের আমলে বন্ধ হয়ে যায়। এ সড়কগুলো যে শুধু যাতায়াতের মাধ্যম তৈরি করেছে তা নয়, একই সাথে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় প্রভাব বিস্তরেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এমনকি সাম্রজ্যবিস্তারের জন্য অনেক সড়কপথ গড়ে ওঠতে দেখা যায়।

এমনই যোগাযোগ মাধ্যম তৈরির উদাহরণ হচ্ছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ। বিশ্ব যখন অস্ত্রের প্রদর্শনী আর সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে ব্যস্ত, তখন বিশ্বে নেতৃত্ব দিতে চীন হাতে নিয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট; একে প্রথমে ডাকা হচ্ছিল নয়া রেশমপথ (সিল্ক রোড) নামে। পরে বলা হলো ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড। ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কথাটার মধ্যে একাধিপত্যের লক্ষণ থাকায় এর সর্বশেষ নাম দেওয়া হয়েছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, সংক্ষেপে বিআরআই। এমনই সময় এই উচ্চাভিলাষি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে যখন একদিকে বিশ্বায়িত রাজনৈতিক অর্থনীতিতে পশ্চিমা অর্থনৈতিক সাম্প্রাজ্যবাদ চীনের বাণিজ্যিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার কাছে মার খাচ্ছে।

২০১৩ সালে চীন সর্বপ্রথম পৃথিবীব্যাপী এ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ পরিকল্পনা প্রকাশ করে। সবচেয়ে বেশি রাষ্ট্র, সবচেয়ে বড় অর্থায়ন ও সবচেয়ে বেশি জনসমষ্টি। বলা হচ্ছে, এটিই হতে যাচ্ছে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রকল্প। ৬৮টি দেশ, ৬০ শতাংশ বিশ্ব জনসংখ্যা এবং ৪০ শতাংশ উৎপাদন নিয়ে এই নয়া রেশমপথ রচনা করছে এশীয় আদলের নতুন বিশ্বায়ন। চীনের দাবি, এটা সহযোগিতার মাধ্যমে যৌথভাবে লাভবান হওয়ার নতুন এক মডেল। দি সিল্ক রোড ইকোনমিক বেল্ট অ্যান্ড দি টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি মেরিটাইম সিল্ক রোডের এই নেটওয়ার্কে চীনের সাথে পারস্য, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের দক্ষিন এশিয়ার প্রায় সব সব দেশই যুক্ত হতে যাচ্ছে। চীন ইতিমধ্যে তার আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্ধী ভারতকেও এই ইনিশিয়েটিভে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ভারত অবশ্য অভিযোগ করেছে, এটা নতুন ধরনের উপনিবেশবাদ, এটা দুর্বল রাষ্ট্রকে ঋণের জালে বেঁধে ফেলবে। তবে সবাই স্বীকার করছেন, এই শতাব্দীর সব থেক বড় উন্নয়ন প্রকল্প এটাই।

চীনের রোড এন্ড বেল্ট লিঙ্কে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশগ্রহন ছাড়াও পাকিস্তানকে নিয়ে চীনের সিপিইসি বা চীন পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর পাকিস্তানকে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পথে নিয়ে যাচ্ছে। চীনের নেতৃত্ব কতটা উচ্চাভিলাষী হয়ে উঠেছে, এই কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রকল্প তার প্রধান উদাহরণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিধ্বস্ত ইউরোপকে পুনর্গঠনে মার্শাল প্ল্যান যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছিল পৃথিবীর শীর্ষ শক্তির স্বীকৃতি। কিন্তু মার্শাল প্ল্যান ছিল কেবল ইউরোপের বিষয়, আর বেল্ট অ্যান্ড রোড এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকাকে ধারণ করলেও এর আওতায় আসবে সারা পৃথিবীর বাণিজ্যই।

বিআরআইয়ের মূল কিওয়ার্ড হলো কানেকটিভিটি।এর উদ্দেশ্য এশিয়াকে বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রীয় ইঞ্জিন করে তোলা। এ পরিকল্পনায় থাকছে সমুদ্রপথে একগুচ্ছ আন্তর্জাতিক বন্দর, ভূমিতে আন্তসীমান্ত সড়ক, উচ্চগতির রেলপথ, বিমানবন্দর এবং ডিজিটাল যুক্ততার অবকাঠামো নির্মাণ। এর সমান্তরালে থাকবে বিদ্যুতের গ্রিড, গ্যাসের পাইপলাইন এবং বাণিজ্য–সহায়ক আর্থিক কার্যক্রম। এতে তিনটি বেল্ট থাকবে :- ১। উত্তর বেল্ট : এ বেল্টে থাকবে সড়ক ও রেলপথ। চীন থেকে শুরুহয়ে মধ্য এশিয়া হয়ে রাশিয়া ও ইউরোপের মধ্যেদিয়ে যাবে। ২। কেন্দ্রীয় বেল্ট : এটি চীন থেকে শুরুহয়ে মধ্যএশিয়া অতিক্রম করে পশ্চিমএশিয়া দিয়ে পরস্য উপসাগর এবং ভূমধ্যসাগরে যাবে। ৩। দক্ষিণ বেল্ট : চীন থেকে শুরুহয়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া দিয়ে দক্ষিণ এশিয়া হয়ে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত যাবে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পরাশক্তি হয়ে ওঠার কালে কোনো কোনো দেশের বিশেষ কোনো সুবিধা বা ক্ষমতার জন্ম হয়েছে, তা দিয়ে ওই সব দেশ বিশ্বকে দীর্ঘ সময়জুড়ে প্রভাবিত করতে পেরেছে। ব্রিটেন জাহাজ নির্মাণ ও নৌচালনা জ্ঞান দিয়ে সাম্র্রাজ্য গড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুঁজি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা দিয়ে ইউরোপ পুনর্গঠন করে পাশ্চাত্যের নেতা হয়েছিল। পাশ্চাত্য তার অর্থনৈতিক ও প্রাযুক্তিক ক্ষমতা দিয়ে বিশ্বায়নের প্রথম পর্বের বাস্তবায়ন করেছিল। চীনের সেই বিশেষ সুবিধার দু’টি দিক হলো অবকাঠামো নির্মাণে চীনের বিশ্বসেরা দক্ষতা এবং বিরাট অঞ্চলজুড়ে অবকাঠামো নির্মাণে তাদের আর্থিক সামর্থ্য। এ প্রকল্পে চীন ৪০০০ কোটি ডলারের সিল্করোড তহবিল এবং ১০,০০০ কোটি ডলারের এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের তহবিল তৈরি করেছে।

পাকিস্তানে কয়লা ও গ্যাস বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং হাইওয়ে তৈরিতে ৬২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে যাচ্ছে চীন । এছাড়া মালয়েশিয়ার অবকাঠামো উন্নয়নে ৩৪ বিলিয়ন ডলার , শ্রীলঙ্কায় ১.৭ বিলিয়ন ডলার, মায়ানমারে ৯ বিলিয়ন ডলার, ওমানে ১০ বিলিয়ন ডলার, হাঙ্গেরী থেকে বুদাপেস্ট রেল প্রকল্প ৪৭২ বিলিয়ন ডলার, জিবুতি ও ইথিয়োপিয়ায় ১০ বিলিয়ন ডলার, ইরানে ৪০০ বিলিয়ন ডলার, কাজখস্তানে ১.৯ বিলিয়ন ডলার ইত্যাদি । দক্ষিণ চীন সাগরে জাপান ও আমেরিকার সাথে বিরোধ থাকায় চীনের দরকার সামুদ্রিক বাণিজ্যের নতুন জলপথ। এর জন্য সবচেয়ে উপযোগী হলো বঙ্গোপসাগর তথা ভারত মহাসাগর। ইতোমধ্যে ভারত মহাসাগরের কাছে শ্রীলঙ্কার হামবানটোটা ও জিবুতি এবং আরব সাগরের তীরে পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দর নির্মাণের কাজ চীন চালিয়ে যাচ্ছে। ভারত মহাসাগর হলো একবিংশ শতাব্দীর কেন্দ্রীয় মঞ্চ। এর কিনারে রয়েছে সাহারা মরুভূমি থেকে ইন্দোনেশীয় দ্বীপপুঞ্জ; রয়েছে সোমালিয়া, ইয়েমেন, ইরান ও পাকিস্তান। এ সাগর ঘিরেই চলছে গতিশীল বাণিজ্য।

আবার একে ঘিরেই দানা বেঁধেছে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ, জলদস্যুতা ও মাদক চোরাচালান। এর পূর্ব প্রান্তে বাস করে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার শত কোটি মুসলমান। অন্য দিকে, এর তীরেই বসবাস করে বিশ্বের বড় জনসংখ্যার কয়েকটি দেশ : ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া। এর ভেতর দিয়েই গেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান জলপথ। এর তীরেই রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশগুলো। এই সমুদ্র প্রাকৃতিক সম্পদেও সমৃদ্ধ। বর্তমানে বছরে এই জলপথে ৯০ হাজার জলযান দিয়ে ৯ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন টন বাণিজ্যিক পণ্য পরিবাহিত হয়।

বিশ্বের ৬৪ শতাংশ তেলবাণিজ্য এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। সৌদিআরবও তেলবাণিজ্যের জন্য এ প্রকল্পের সাথে যুক্ত হতে চাইছে। মধ্যপ্রাচ্যে এবং আফ্রিকান দেশগুলোতে চীনা পন্য বাজার তৈরি হচ্ছে। ইতালির ট্রিয়েস্টের সমুদ্রবন্দর হচ্ছে ইউরোপে চীনের প্রবেশদ্বার, ইতালি থেকে হাঙ্গেরী হয়ে জার্মানি তে চীন তার বিরাট পণ্যের বাজার তৈরিকরতে সক্ষম হচ্ছে । যা চীনের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে । বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের পৃথিবীব্যাপী যে প্রভাব তৈরি হচ্ছে, এটা দেখার জন্য শুধু সময়ের অপেক্ষা। যেসকল অঞ্চল চীনের পরিকল্পনার বাইরে রয়েছে, তাদের নিয়ে বর্তমান রাষ্ট্রগুলো শক্তি ধরেরাখতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রইল।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker