জাতীয়হোমপেজ স্লাইড ছবি

মুক্তিযুদ্ধের এক নির্মম ঘটনা!

আরিফুল আলম জুয়েল: নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে কত গল্প যে আমাদের আশপাশে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে তার কী কোন শেষ আছে! একাত্তর নিয়ে কথা বলা মানেই আজ থেকে প্রায় অর্ধশত বছর আগে এক নিমেষে সেই যুদ্ধক্ষেত্রে চলে যাওয়া। কিছু গল্প আছে আনন্দের, গৌরবের। আবার কিছু গল্প বেদনার রঙে আঁকা। মুক্তিযুদ্ধের কত গল্পই তো ইতিহাসে নেই, অজানা গল্পের চরিত্রগুলোও নেই; চরিত্র বিদায় নিয়েছে হয়তো এ পৃথিবী ছেড়ে, আমরা-আমাদের প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের না বলা ইতিহাস না জানিয়েই বিদায় নিয়েছে! আহা! আফসোস! যেমন মুক্তিযোদ্ধা সালাউদ্দিনের গল্পটাই তো অনেকেই জানে না, এ গল্প অন্য আট দশটা সাধারণ গল্পের মত নয়, এ গল্প সাধারণ কোন অত্যাচার কিংবা বর্বরতার গল্প নয়, এ গল্প গুলি করে মেরে ফেলার গল্পও নয়, এ গল্প হাতের নখ উপড়ে ফেলার কিংবা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মারার গল্পও নয়, এ গল্প রোমান সাম্রাজ্যকেও হার মানায়, হার মানায় সভ্যতাকেও!

যুদ্ধ-বিগ্রহের ইতিহাস জানতে ভালোবাসে অথচ গ্ল্যাডিয়েটরদের নাম শোনে নি, এমন মানুষ সম্ভবত খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিনই হবে। রোমান এম্পায়ার এবং রোমান রিপাবলিকের সুপরিচিত এ যোদ্ধারা লড়াইয়ে লিপ্ত হতো নিজেদের সাথে, লড়াই করতো বাঘ, সিংহ, হাতির মতো পশুদের সাথেও! ঠিক এমন ঘটনাই ঘটেছিল আমাদের দেশে ১৯৭১ সালে। প্রাচীন রোমের সেই ভয়ঙ্কর সত্যের বাঘ বনাম মানুষের লড়াই দেখেছে ঠাকুরগাঁওবাসী, যেটা ভাবনারও অতীত। এ বর্বরতার কথা শুনলে শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়, মন কল্পনায় চলে যায় মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অলিগলিতে; কেমন ছিল সেসব দিন, কেমন ছিল তখনকার মানুষ, কেমন ছিল আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা! কত কষ্ট করেছে তাঁরা, কত অত্যাচার সইতে হয়েছে তাঁদের! এবার তাহলে আসুন, চলে যাই ইতিহাসে প্রস্ফুটিতভাবে উঠে না আসা আমাদের মুক্তিযাদ্ধা সালাউদ্দিনের গল্পে।

১২ নভেম্বর, ১৯৭১। ক্যালেন্ডার দেখে নিন, দিনটি ছিল শুক্রবার। শীতকাল, সকালবেলায় রোদ ঝলমল করছে পুরো ঠাকুরগাঁওয়ে। ঠাকুরগাঁওবাসীর মনে অদ্ভুত এক শঙ্কা, এক আতঙ্ক কাজ করছে, কি হবে আজ ইপিআর ক্যাম্পে। আগের দিন এক অভিনব আনন্দ উপভোগের পরিকল্পনা করে বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যরা। তারই সূত্রধরে ঠাকুরগাঁও জুড়ে মাইকযোগে করা হয় আমন্ত্রণের এলান। আগের দিনের মাইকযোগে আমন্ত্রণের এলানই ঠাকুরগাঁওবাসীর শঙ্কার কারণ, জানানো হয়েছে ইপিআর ক্যাম্পে এক অভিনব খেলার আয়োজন করা হয়েছে। মানুষ ভীত হয়ে পড়ল। আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল দেশপ্রেমিক বাঙালির মনে।

মাইকে জানানো হলো, সালাহউদ্দিন নামক এক লোককে ঘিরে আনন্দ উৎসবটি জমবে ইপিআর ক্যাম্পে। তার আগে সালাউদ্দিনের পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার কাহিনীটা একটু বলে নেই! সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সালাউদ্দিন অবস্থান করেছিলেন জাবরহাট ক্যাম্পে। ঠিক সে সময় একটা দুঃসংবাদ এলো সেখানে। সালাউদ্দিনের বাবাকে পাকসেনারা ধরে নিয়ে গেছে সদরের ক্যাম্পে। ভেঙ্গে পড়লেন সালাউদ্দিন। সহযোদ্ধারা সান্তনা দিলেন তাকে। কিন্তু প্রিয় বাবার স্মৃতির দংশন বড় জর্জরিত করে তুললো তাকে। সালাউদ্দিন ভিতরে ভিতরে খুবই বিচলিত গভীর রাতে একজন সহযোদ্ধাকে জানিয়ে বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। যাবেন আর আসবেন। শুধু একদিনের ব্যাপার। বাবার খবরটা জানা আর মার অবস্থানটি দেখে আসবেন। নভেম্বর মাস!

পঞ্চগড় ঘেষা দেশের প্রান্তিক উত্তরের নভেম্বরের হাড় কাঁপানো শীত। ১০ তারিখ ঘন অন্ধকারে ১১-১২ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ভোর নাগাদ বাড়িতে পৌছে গেলেন সালাহউদ্দিন। মা! এক ডাকে, টোকা দিতে খুলে গেলো দরজা! মা-বাবাকে দিব্যি দেখে আনন্দ বেদনার যুগপৎ আতিসহ্যে অপলক সালাহউদ্দিন। মা বাবাও যেন আত্মহারা। আট মাস পরে সন্তনকে তারা কাছে পেয়েছেন। মায়ের চোখ গড়িযে জল। শেষ রাতের আলো আধারিতে সালাউদ্দিন যখন গ্রামে ঢোকেন, তখন শত্রুপক্ষের লোকজন দেখে ফেলে। অথবা বাবার সংবাদ পৌছে দেওয়ার মধ্যে কোনো ষড়যন্ত্রের ফাঁদ হয়তো বা ছিল। সকাল সকাল খবর চলে যায় ঠাকুরগাঁওয়ে পাক সদর দপ্তরে! ১১ নভেম্বর সকাল ১০ টায় সালাহউদ্দিনের বাড়ি ঘিরে ফেলে বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যরা। সালাহউদ্দিন পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। সালাহউদ্দিনের বাবা-মা অনেক কাকুতি মিনতি করলেন। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হলো না। বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যরা সালাহউদ্দিনকে বন্দি করে নিযে যায় ঠাকুরগাঁও সদরে। যেখানে পাকসেনাদের সদর দপ্তর। সালাহউদ্দিনের ওপরে প্রচন্ড নির্যাতন চলে।

মুক্তিসেনা এবং তাদের আশ্রয়দাতাদের বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়। লাথি, চাবকানি, গালা-গাল- কোন কিছুতে নতিস্বীকার করলেন না সালাহউদ্দিন। সে এক বিরল প্রত্যাখ্যান। তার হাতের আঙ্গুল কেটে ফেলা হয়। চোখের মণিতে বঁড়শি বিঁধিয়ে নিষ্ঠুরভাবে টানাটানি করা হয়। হাতে-পায়ে পেরেক ঢুকে দেয়। কিন্তু কিছুতে কোনো তথ্য দেয়নি সালাহউদ্দিন। তার দৃঢ়ত্য, দেশপ্রেম দেখে বিস্মিত হয় পাকিস্থানী সেনা কর্মকর্তা মেজর মাহমুদ হাসান বেগ। কোনোক্রমেই তথ্য আদায় করা গেল না সালাহউদ্দিনের কাছ থেকে। ১২ তারিখ সকালে দুই হাত পিছ মোড়া করে বাধা অবস্থায় রুদ্ধগৃহ থেকে বের করে আনা হলো মুক্তিযোদ্ধা সালাহউদ্দিনকে। আঙ্গুলে ক্ষতবিক্ষত তার সেই হাত। নানা অত্যাচারে জর্জরিত যার দেহ। ভেতর থেকে কয়েকজন বর্বর পাকসেনা টানা হেঁচড়া করে বীর সালাহউদ্দিনকে নিয়ে এলো। ততক্ষণে অনেকে আঁচ করতে পারলেন, বর্বর পাকিস্তানী সেনারা কি ধরণের আনন্দ আয়োজন সাজিয়েছে। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো পাকিস্তানী মেজর মাহমুদ হাসান বেগ। তারপর সালাহউদ্দিনকে দুটো অপশন দেওয়া হয়। মুক্তিবাহিনীর তথ্য দেবে তারা কোথায় কোথায় অবস্থান করে, কে তাদের আশ্রয় দেয়, খেতে দেয়, না হয় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। তবে সে মৃত্যুর কৌশল মামুলি কোনো গুলি করে হত্যা বা জবাই করে হত্যা করা নয়। সালাহউদ্দিনকে জানানো হলো তাদের অভিনব মৃত্যুর কৌশল! তাকে ফেলে দেয়া হবে বাঘের খাঁচার মধ্যে। তারপর বাঘগুলো তাকে টেনে হিঁচড়ে খেয়ে ফেলবে। তারপরও অকুতোভয় বীর সালাহউদ্দিন মুক্তিবাহিনীর তথ্য না দিয়ে মেনে নিলেন শেষ শর্তটি।

অর্থাৎ বাঘের খাঁচাকে কবুল করে নিলেন। সেখানে তখন পিনপতন নীরবতা নৈঃশব্দের তোলপাড় করা নির্জনতার ঝড়। বীর অকুতোভয় সালাহউদ্দিন অপ্রকম্পিত পায়ে এসে দাঁড়ালেন সেই বাঘের বাঘের খাঁচার সামনে। তাঁকে ছেড়ে দেয়া হলো খাঁচার ভিতর! খাঁচার ভেতর বাঘগুলো মুহূর্তের মধ্যে থাবায় থাবায় ছিন্ন ভিন্ন করে ফেল্ল সালাহউদ্দিনের শরীর। টেনে হিঁচড়ে চিবিয়ে চুষে তারা খেতে লাগল সালাহউদ্দিনের দেহ, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। একসময় বাঘদের ভোজের মহোৎসবে সালাহউদ্দিনের শরীরের কিছুই অবশিষ্ট থাকল না। তার রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে এগুতে লাগল নতুন পতাকার দিকে। আর তার পরনের ক্ষত-বিক্ষত কাপড়টি যেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার মতো পড়ে রইলো।

শহীদ মুক্তিযাদ্ধা সালাউদ্দিনের চাচাতো ভাই মো. ওহিদুজ্জামান বলেন— বিশ্বের ইতিহাসে কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে এভাবে হত্যার বর্বরতা আর আছে কি না, তা তাঁর জানা নেই। এ ঘটনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক নির্মম ঘটনা। দেশের স্বাধীনতার জন্য সালাউদ্দিন বাঘের খাঁচায় নিজের জীবন উৎসর্গ করলেও আজ সে ঘটনার খুব একটা আলোচনা নেই। বাঘের খাঁচায় সালাউদ্দিনের জীবন উৎসর্গের ঘটনাটি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তি এবং ১২ নভেম্বর শহিদ সালাউদ্দিন দিবস হিসেবে ঘোষণার দাবি করেন তিনি। কষ্ট দেয় আমাদের— শহিদ সালাহউদ্দিনের বীরত্ব নিয়ে অনেক কিছু করার ছিল। কিন্তু আমরা তেমন কিছুই করতে পারলাম না। আমরাও চাই- বাঘের খাঁচায় সালাউদ্দিনের জীবন উৎসর্গের ঘটনাটি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হোক এবং ১২ নভেম্বর শহিদ সালাউদ্দিন দিবস হিসেবে ঘোষণা হোক!

আনিসুল হকের “মা” গল্পটা আমাদের শুনিয়েছে, শহীদ আজাদের কথা। শহীদ আজাদের মা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ভাত না খেয়ে মাটিতে শুয়ে জীবন পার করেছেন শুধু মাত্র ছেলের জন্য। শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আজাদ কে আনিসুল হক সকলের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। স্বাধীনতার পঞ্চাশতম বছরে জানলাম আরেক বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সালাউদ্দিনের কথা। আচ্ছা, একাত্তরে নৃশংস, বর্বর হত্যা ও শহীদের কথা বাংলাদেশের মানুষের সামনে তুলে ধরার জন্য কি কেউ নেই, কিংবা কারো দায়িত্বের মধ্যে কি পড়ে না?? কথায় কথায় মুক্তিযুদ্ধ কিংবা মুক্তিযোদ্ধা বলে মুখে ফেনা না তুলে, মুক্তিযুদ্ধে বর্বরতা ও শহীদের কথা প্রচার ও প্রকাশ করলে এমনিতেই মানুষ একাত্তরের বর্বরদের ঘৃণা করবে। আমরা চাই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বর্বরদের ঘৃণা করুক আর বীর শহীদদের আত্মদান স্মরণ করুক। সমৃদ্ধ হোক প্রজন্ম, সমৃদ্ধ হোক দেশপ্রেম!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker