বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

রহস্যের অন্য নাম মেরিলিন মনরো

আরিফুল আলম জুয়েল: স্বর্ণকেশী সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত মেরিলিন মনরো, কোটি মানুষের হৃদয়ে কাঁপন তোলা এক নারী; যিনি লাস্যময়ী হাসি, সুমিষ্ট কণ্ঠ আর তীক্ষ্ণ চাহনিতে ঝড় তুলেছিলেন এবং এখনো তুলে চলেছেন! তাই তো মনরোর অকাল মৃত্যু, যেটিকে অনেকে আত্মহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন, গণমানুষের মনোজগতে ফেলেছিল ব্যাপক প্রভাব।

যখন তিনি মারা যান, তখন দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন বলছে, মনরোর মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর নিউ ইয়র্ক শহরে আত্মহত্যার সংখ্যা পূর্বের সকল রেকর্ডকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। একই দিনে আত্মহত্যা করেছিল ১২ জন, যাদের মধ্যে একজন তো সরাসরিই সুইসাইড নোটে লিখে গিয়েছিল, “যদি জগতের সবচেয়ে চমৎকার, সুন্দর সৃষ্টিটিই বেঁচে থাকার কোনো কারণ খুঁজে না পায়, তাহলে আমিই বা কীভাবে পাই!”

সেই মানুষটি খুব বেশিদিন বেঁচে ছিলেন না, মাত্র ৩৬ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন এ সৌন্দর্যকন্যা। পিতৃপরিচয়হীন অবস্থায় মানসিক ভারসাম্যহীন মায়ের গর্ভে ১৯২৬ সালের ১ জুন ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে কাউন্টি নামক একটি হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেন এক মেয়ে! জন্মের পর একদিকে দারিদ্র্য, অন্যদিকে অভিভাবকহীনতায় আশ্রয় জোটে এতিমখানায়। আহা! কি দুর্ভাগ্য তাঁর! দুর্ভাগ্য নিয়ে জন্মালেও সৃষ্টিকর্তা যেন দু’হাত ভরে সৌন্দর্য দিয়েছিল তাকে। তাঁর মা গ্লাডিস পার্ল বেকারের তৃতীয় সন্তান ছিলেন তিনি, মা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ফিল্ম নেগেটিভ কাটার কাজ করতেন।

আগের দুই ভাইয়ের পিতৃপরিচয় থাকলেও তাঁর কোন পিতৃপরিচয় ছিল না। মনরো যখন তার মায়ের গর্ভে তখন তার মায়ের স্বামী জানতে পারেন এই সন্তান তার নয়। কারন, তাঁর মা ছিলেন মানসিকভাবে অসুস্থ! এমনকি মানসিকভাবে অসুস্থ মা নিজেও এ ব্যাপারে নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হন। মনরোর জন্মের পর তাঁর মায়ের মানসিক অবস্থার আরো বেশি অবনতি ঘটে।
এমনকি তিনি বেশ কয়েকবার মনরোকে বালিশ মুখে চেপে মেরে ফেলারও চেষ্টা করেন। তাই তখন তাকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, আর ছোট্ট মনরোকে রেখে আসা হয় এতিমখানায়।

রুপালী জগতে প্রবেশের পূর্বে ক্ষণজন্মা এই অভিনেত্রীর নাম ছিল নর্মা জীন বেকার। এতিমখানা থেকে ১২ বছর বয়সে এক পালক পিতা-মাতার গৃহে আশ্রয় পান মনরো, ফলে চাইল্ড হোমের অনুশাসন থেকে মুক্তি মেলে তার। সেখানে তিনি পূর্ণ স্বাধীনতায় জীবনযাপন শুরু করেন। এই পালক মা ছিলেন তার আসল মায়েরই বান্ধবী। কিন্তু ভাগ্য সেখানেও তার সহায় ছিল না। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পরিবারে অভাব দেখা দেয়। ফলে তাদের অভাব-অনটনের মাঝে মনরোর দেখাশোনা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। তাই পুনরায় তারা মনরোকে আশ্রমে পাঠানোর মনঃস্থির করেন। কিন্তু সেখানের আত্যাচারের কথা স্মরণ করেই শিউরে ওঠেন মনরো।

জেমস ডগার্থি নামে এয়ার ক্রাফট প্লান্টে কর্মরত এক লোক থাকতেন মনরোর পাশের বাড়িতে, সে বছর ১৯ শে জুন মনরো জেমসকে পালিয়ে বিয়ে করেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৬! তার স্বামী জেমসের সহায়তায় বিয়ের পর মনরো এরোপ্লেন পার্টস কোম্পানীতে শ্রমিক হিসেবে কাজ পান। রূপের লাবণ্য আর শরীরের মোহনীয় অভিব্যক্তির জন্য অল্প কিছুদিনের মাঝেই সেখানকার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসেন মনরো। কোম্পানীর শো-গার্ল হিসেবে মডেলিংয়ের সুযোগ পান তিনি। সেই শুরু, তারপর বড় পরিসরে মডেলিংয়ের প্রস্তাব পান এবং পরবর্তীতে সেই ছবি বিভিন্ন মহলে ব্যাপক সাড়া তোলে। ১৯৪৬ সালে প্রথম অভিনয় জগতে পা রাখেন মনরো। সেখান থেকেই নর্মা জীন বেকার নাম পরিবর্তন করে পরিচিত হন মেরিলিন মনরো নামে।

বাদামী চুলের রঙ পরিবর্তন করে তাতে প্লাটিনামের সোনালী আভা আনেন, পরবর্তীতে এই স্বর্ণালী কেশই তাকে অন্যদের থেকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলে দর্শকদের কাছে। সেই চুল, সেই হাসি লাখো দর্শকের হৃদয়ে কাঁপন তুলে মেরিলিন মনরো, জগতের সেরা সুন্দরী! ১৯৫০ সালে টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি ফক্স স্টুডিও ‘অল অ্যাবাউট ইভ’ চলচিত্রের জন্য তাকে চুক্তিবদ্ধ করে। এই সিনেমায় লাস্যময়ী অভিনয়ে রাতারাতিই তারকা বনে যান এ লাস্যময়ী!

পরবর্তী দুই বছরে তার সাড়া জাগানো চলচিত্র রাইট ক্রস, হোম টাউন স্টোরি, ক্ল্যাশ বাই নাইট, উই আর নট ম্যারিড, জেন্টলমেন প্রেফার ব্লন্ডিস, হাউ টু মেরি এ মিলিয়নেয়ার প্রভৃতি মুক্তি পায়। সবগুলো সিনেমাতেই তাকে যৌনাবেদনময়ী নারী হিসেবে পর্দায় দেখা যায়। ‘হাউ টু মেরি এ মিলিয়নেয়ার’ সিনেমাটিও বক্স অফিসে বেশ সাড়া ফেলে।

সে বছরেই খ্যাতির শীর্ষে অবস্থিত মনরো প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ উন্মুক্তভাবে নিজেকে প্রকাশিত করেন ‘প্লে বয়’ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে। যদিও এটি নিয়ে অনেক কেলেংকারী, বিতর্ক! ক্যারিয়ারের যখন মধ্যগগন, তখন তাঁর তৃতীয় বিয়ে চলছে; জীবনের নানা হতাশায় তিনি অধিক ঔষধ সেবন ও মদ্যপান শুরু করেন। ফলে কাজে অনিয়ম আর অমনযোগী মনরো পরিচালকদের কাছেও অপ্রিয় হতে শুরু করেন। শোনা যায়, এরই মাঝে সন্তানসম্ভবা হলেও জটিলতার কারণে তিনি মা হতে পারেননি।

এর মধ্যেও ১৯৫৯ সালে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ‘সাম লাইক ইট হট’ সিনেমার মাধ্যমে।
এই সিনেমায় তিনি একজন গায়িকার ভূমিকায় নজরকাড়া অভিনয় করেন এবং বিপুল সমাদৃত হন। তার অসাধারণ অভিনয়ের জন্য জিতে নেন ‘গোল্ডেন গ্লোব’ পুরস্কার। মনরোর অভিনীত শেষ চলচিত্র ছিল ‘দ্য মিসফিট’ যেটা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬১ সালে! সে বছরই ব্যক্তিগত মতামতের অমিল হেতু ডিভোর্স হয় মনরোর তৃতীয় বিয়ের!

মনরোর ব্যাপারে একটি চমকপ্রদ তথ্য প্রায়ই শোনা যায়। বলা হয়ে থাকে, মনরোর আইকিউ নাকি আইনস্টাইনের চেয়েও বেশি ছিল। ঠিক কত আইকিউ, সেটিও বলা হয়ে থাকে: ১৬৮! কিন্তু এই তথ্য কি আদৌ সত্য? নাকি এটি পুরোটাই বানোয়াট? প্রথম মনরোর আইকিউ বিষয়ক তথ্যটির আবির্ভাব ঘটেছিল ২০১৩ সালের ৫ আগস্ট। বাজফিডে একটি লিস্ট আর্টিকেলে দাবি করা হয়েছিল।

তবে, এ তথ্যের সাথে প্রাসঙ্গিক কোনো রেফারেন্স সংযুক্ত ছিল না। তাই আর্টিকেলটির রচয়িতা কোথা থেকে এ তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, তা-ও জানা যায় না। তাই মনরো সারাজীবন চেষ্টা চালিয়ে গেছেন প্রচুর বই পড়ে আত্মোন্নয়নের, যার প্রমাণ মেলে তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরির বইগুলো থেকে। ফলে আইকিউ ১৬৮ কিংবা ‘আইনস্টাইনের চেয়ে বেশি” যদি না-ও হয়ে থাকে, মনরো যে তার পাবলিক পারসোনার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমতী ও বিদুষী ছিলেন, এবং তার ছিল অতলান্ত জ্ঞান পিপাসা, সে ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। শেষ দিকে লস অ্যাঞ্জেলসে একাই থাকতেন তিনি। শেষ জীবনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডির সাথে বেশ ঘনিষ্টতার কাহিনী শোনা যায় তার।

১৯৬২ সালের স্নায়ুযুদ্ধের সময় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের সময় প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডির একজন ঘনিষ্ট লোক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। সেই বছর মে মাসের ২৯ তারিখে কেনেডির জন্মদিনে আমন্ত্রিত ছিলেন তিনি এবং পার্টিতে তার গাওয়া ‘হ্যাপি বার্থডে মি. প্রেসিডেন্ট’ গানটি এখনও মানুষের কানে ভাসে। গান গাওয়ার কথা যখন আসছে তখন বলি- মনরো একজন সফল গায়িকার খেতাবও পেয়েছিলেন;  তার গাওয়া ‘মাই হার্ট বিলংস টু ড্যাডি’, ‘আই ওয়াননা বি লাভড বাই ইউ’ এবং ‘ডায়মন্ডস আর এ গার্লস বেস্ট ফ্রেন্ডস’ গানগুলোও বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল!

কেনেডির জন্মদিনের পার্টি থেকে ফেরার পর ১৯৬২ সালের ৫ আগস্ট লস অ্যাঞ্জেলসে নিজ বাসভবনেই তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ড্রাগ ওভারডোজকে দায়ী করা হলেও অনেকে আজও বিশ্বাস করে মনরোকে হত্যা করা হয়েছিল পরিকল্পিতভাবে। সেসময় একইসাথে প্রেমের গুঞ্জন শোনা যায় জন এফ. কেনেডি ও তাই ভাই রবার্ট কেনেডির সাথে। মৃত্যুর প্রায় ১ ঘন্টা আগেও দুজনের সাথে গোপন সম্পর্ক ও মনরোকে দেওয়া তাদের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রচন্ড তর্ক হয়েছিল তার- এমনটাই বলেন মনরোর গৃহকর্মী।

তারা চলে যাবার পর মধ্যরাতে গৃহকর্মী মনরোর ঘরে আলো জ্বলতে দেখে দরজার কড়া নাড়লে ভেতর থেকে আর সারা পাননি। ভীতসতস্ত্র হয়ে তিনি ফোন দেন মনরোর ব্যক্তিগত সাইকিয়াট্রিস্ট কে। তিনি এসে জানালা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে মনরোর নগ্ন দেহ নিথর অবস্থায় বিছানায় পড়ে থাকতে দেখেন। এক হাতে ফোন আর পাশে ঔষধের খালি বোতল পড়ে থাকতে দেখা যায়। জানা যায়- মনরো মৃত্যুর পূর্বে শেষ ফোন জন এফ. কেনেডিকেই দিয়েছিলেন। মনরো তাদের সম্পর্ক সবার সামনে আনার হুমকি দিয়েছিল। তাই তার বেঁচে থাকা কেনেডির কাজের পথে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। ঠিক এ কারণেই তাকে চলে যেতে হয়েছে- এমনটাই মনে করেন মনরোর অনেক ভক্ত। অবশ্য এমন সন্দেহের বাস্তবে কোনো প্রমাণ মেলেনি।

তাই মনরো আত্মহত্যা করেছিলেন জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা নিয়ে- এমনটাই তদন্তে লেখা হয়। পিতৃ- পরিচয়হীন মেয়েটিকে ১৯৯৯ সালে আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে তাকে ‘গ্রেটেস্ট ফিমেল স্টার অফ অল টাইম’ খেতাব দেওয়া হয়।মোহনীয় হাসি, ঝলমলে চুলের আভা, তীক্ষ্ণ চাহনি, সুমিষ্ট কন্ঠ আর মধুর হাসির জাদুতে মনরো রুপালী জগতের মাধ্যমে দর্শক-হৃদয়ে যে জায়গা করে গেছেন, তা আজও অমলিন। আজও মানুষ ভুলতে পারে না তার হাসির জাদু! এখনও যারা বয়োবৃদ্ধ অবস্থায় আছেন, তাদেরকে যদি বলা হয় মেরিলিন মনরোর কথা; তাহলে নিশ্চিত যারা চিনেন বা জানেন, তাদের মুখের কোনে ফুটে উঠবে এক চিলতে হাসি!

ছোটবেলার দুর্ভাগ্য কাটিয়ে একসময় ভালবাসা, নাম, যশ, খ্যাতি সবই অর্জন করেছিলেন। কিন্তু শেষজীবনে বারবার কঠিন পরিস্থিতি যেন নিঃসঙ্গই করে দিয়েছিল তাকে। তবে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে জীবন প্রদীপ নিভে গেলেও তার হাসির মোহাবিষ্ট লাখ লাখ ভক্ত আজও তার সৌন্দর্যের রহস্য খুঁজে বেড়ায়। তাই মৃত্যুর ৫৮ বছর পরও চলচ্চিত্র জগতে সেরা অভিনয়ের জন্য, সেরা সৌন্দর্যের জন্য তাকে স্মরণ করা হয়। মেরিলিন মনরো, সত্যি-ই আজো এক রহস্যের অপর নাম!

 

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker