ছুটিহোমপেজ স্লাইড ছবি

হারিয়ে যাওয়া ‘জাহাজ বাড়ী’র গল্প

আরিফুল আলম জুয়েল: ধানমন্ডি লেকসংলগ্ন বাড়িটির নাম্বার-৬০, রোড-৫/এ! যাকে আমরা অনেকেই “জাহাজ বাড়ি” নামে চিনে থাকি! দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও জনবহুল শহরগুলোর একটি হচ্ছে ঢাকা। জনসংখ্যার বিচারে এটি দক্ষিণ এশিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম এবং সমগ্র বিশ্বের মাঝে নবম বৃহত্তম শহর। জনবহুল এ শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য স্থাপত্য। এসব স্থাপত্য ধীরে ধীরে অঞ্চলভেদে মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

ধানমন্ডিবাসীর প্রাণকেন্দ্র ধানমন্ডি লেক। তবে ধানমন্ডির অন্যতম আকর্ষণের জায়গা জাহাজ বাড়ি। এক সময়ের ধানমন্ডি লেকে শোভা বাড়াতো এই ৫/এ রোডের ৬০ নাম্বার জাহাজ বাড়িটি যা ছিল চিশতিয়া প্যালেস। যা আজ শুধু ইতিহাসের পাতায় ছবি হয়েই আছে। বাড়ির গেটে নেমপ্লেটে লেখা আছে নাম- “চিশতিয়া প্যালেস”; অনেকই আবার বলে থাকে “খ্রিস্টিয়া প্যালেস”! ধানমন্ডি লেক ঘেষে গড়ে ওঠা এই বাড়িটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে কৌতুহলের কোনো শেষ নেই। অনেকটা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আদলে তৈরি করা বাড়িটিকে দেখে অনেকেই ভাবেন এটি কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।

আবার কারো মতে এটি কোনো বিদেশী সংস্থার অফিস, কেউ কেউ মনে করে এটি একটি ভৌতিক বাড়ি। এটি এমন একটি বাড়ি যে বাড়ির সদস্যদের খুব একটা বাইরে দেখা যায় না। কোলাহল তো দূরের কথা, সামান্য টু শব্দটিও শোনা যায় না বাড়ির ভেতর থেকে। বাড়ির প্রধান দরজাও সবসময় বন্ধ থাকে। বাইরের কারো ভেতরে প্রবেশ করারও অনুমতি নেই। তাই বাইরের মানুষ আপন মনে বাড়িটি সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের ধারণা পোষণ করে আসছে। চিশতিয়া প্যালেসের তৈরি সম্বন্ধে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

১৯৯৩ সালে প্রায় ১৬ কাঠা জমির উপর এ বাড়িটি তৈরির কাজ শুরু হয় এবং মাত্র এক বছরের মাথায় ১৯৯৪ সালে বাড়িটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। তবে প্রথম দিকে বাড়িটির ডিজাইন জাহাজ আকৃতির ছিল না। নির্মাণের পর ঢাকা সিটি কর্পোরেশন বাড়িটির কিছু অংশ ভেঙে এর পাশ দিয়ে চলাচলের রাস্তা তৈরি করে। তখন বাড়ির মালিক বাড়িটির সীমানা প্রাচীর বর্তমান জাহাজ আদলে তৈরি করেন। চিশতিয়া প্যালেসের স্বত্বাধিকারীর নাম হচ্ছে ‘শের এ খাজা’। তবে তার আসল নাম হচ্ছে একেএম আনোয়ারুল হক চৌধুরী। তার জন্মস্থান ও জন্মতারিখ সম্বন্ধে সঠিক কোন তথ্য জানা যায়নি। যতটুকু জানা যায়, তিনি ১৯৫২ সালে জন্মগ্রহন করেন। বাড়িটির ন্যায় বাড়ির মালিকও ছিল বেশ রহস্যময় একজন ব্যাক্তি। তাই তার সম্বন্ধে খুব কম ব্যক্তিই জানেন।

তবে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সাথে তার ওঠাবসা ছিল। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী, ভারতের আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী এইচ. ডি. দেব গৌড়া, ভারতের উপরাষ্ট্রপতি কৃষ্ণ কান্ত, জাতিসংঘের সাবেক ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ইকবাল রেজা প্রমুখ। জানা যায়, এর মূল কারন ছিল তার সঠিক ভবিষ্যৎ বাণী করার ক্ষমতা। ফলে অনেক নেতাদের পদচারণাও ছিল এ জাহাজ বাড়িতে। আরও জানা যায়, তার ভবিষ্যৎ বাণী অনুসারে নাকি বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ব্যাক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন এবং এজন্য তাকে “কিং অব কিং মেকার” বলা হত। তিনি সুফিবাদি মতাবাদ দ্বারা বিশেষ ভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তবে প্রচলিত সুফিবাদী পুরুষের মত কানকায়ে শরীফ বা জলসার আয়োজন করতেন না। ছিল না কোন মুরিদও।

শের এ খাজা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা করেন। আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী হলেও তিনি এটিকে পুঁজি করে কোনো ব্যবসা করেন নি। তার এই আধ্যাত্মিক ক্ষমতার সেবা শুধুমাত্র বিশ্বের প্রথম সারির নেতারাই পেতেন। এসবের বাইরে তিনি গার্মেন্টস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। চিশতিয়া গ্রুপ অব ইন্ড্রাস্ট্রিজ নামে তার একটি কোম্পানি রয়েছে। তিনি নিজেই এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতেন। তার স্ত্রীর নাম রেহানা চৌধুরী। তাদের একমাত্র পুত্র রুবেল চৌধুরী ও একমাত্র কন্যা সাদিয়া চৌধুরী। তার ছেলে রুবেল চৌধুরী বিয়ে করেন নেপালের সাবেক উপ প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুজাদা কৈরালার মেয়েকে। তার স্ত্রী সম্পর্কে নেপালের প্রধানমন্ত্রী গিরিজা প্রসাদ কৈরালার নাতনী। ২০১১ সালের ১৭ নভেম্বর মাত্র ৫৯ বছর বয়সে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যায়। পরবর্তীতে তার লাশ দেশে এনে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

বর্তমানে, এ রহস্য ঘেরা জাহাজ বাড়ি এখন শুধুই স্মৃতি। সেখানে এখন “শান্তা হোল্ডিং” কোম্পানির নির্মিত বহু আধুনিক সুবিধা নিয়ে তৈরি একটু বহুতল (১৪ তলা) ভবন দেখা যায়। ভবনটিতে জিম, সুইমিংপুল ও কমন স্পেস সহ অনেক ধরনের নাগরিক সুবিধা বিদ্যমান। এ বহুতল ভবনটির নাম দেয়া হয়েছে “চিশতিজ ইয়ট”!

ঢাকা পৃথিবীর সবথেকে জনবহুল শহরগুলোর মধ্যে একটি। প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় সাতচল্লিশ হাজার মানুষ বসবাস করে। এ শহরটি তার বাসিন্দাদের আবাসন সমস্যা মিটাতে একে একে বলি দিচ্ছে এর অপরূপ সুন্দর স্থাপনাগুলোকে। হয়ত, এরকমই এক বলির উদাহরণ ধানমন্ডির “জাহাজ বাড়ি” খ্যাত “চিশতিয়া প্যালেস”। অস্তিত্ব থেকে বিদায় নিলেও হয়ত দীর্ঘদিন মানুষের মনে বেঁচে থাকবে এ অপরূপ সৌন্দর্য্যমন্ডিত স্থাপনাটি।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker