ছুটিহোমপেজ স্লাইড ছবি
গহীন পাহাড়ে বয়ে চলা রোমাঞ্চকর দামতুয়া ঝর্ণা

আল রাকিব তনয়: বান্দরবান পর্যটকদের জন্য স্বর্গরাজ্য। আরামপ্রিয় পর্যটকদের জন্য যেমন রয়েছে নীলগিরি, নীলাচল, স্বর্ণমন্দির, চিম্বুক ইত্যাদি আবার এডভেঞ্চার প্রেমীদের জন্যও বান্দরবানের দুয়ার খোলা। এখানেই রয়েছে কেওক্রাডং, নাফাখুম, আমিয়াখুম ইত্যাদি ঝর্ণা। আবার রয়েছে সাইরু হিল রিসোর্টের মত দৃষ্টিনন্দন রিসোর্ট এবং মেঘলার মত সুবিশাল পর্যটন কেন্দ্র। বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলার গহীনে লুকিয়ে থাকা একটি ঝর্ণা হলো দামতুয়া ঝর্ণা। এই ঝর্ণা ডামতুয়া/ তুক অ / লামোনই ঝর্ণা নামেও পরিচিত। স্থানীয়দের ভাষায় “তুক” অর্থ ব্যাঙ আর “অ” মানে ঝিরি। ঝিরির নাম অনুসারে ঝর্ণার নামকরণ হয়ে থাকে সাধারণত তাই দামতুয়া ঝর্ণার দেয়াল খাড়া হওয়ায় ব্যাঙ সেখানে বেয়ে উঠতে পারে না তাই এই ঝর্ণাকে “তুক অ” বলা হয়।
আবার লামোনাই অর্থ চাঁদের আলো। ঝর্ণায় দুই দিক থেকে পানি পতিত হয়ে মাঝের যে স্থানে পড়ে সেখানে চাঁদের আলো পড়ে এক অপার্থিব সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয় তাই এর আরেক নাম লামোনাই ঝর্ণা। বর্ষাকাল সব ঝর্ণারই যৌবনকাল কিন্তু সেইসাথে বর্ষাকালে ঝর্ণা রুদ্রমূর্তিও ধারণ করে। তাই অতিবৃষ্টির সম্ভাবনা দেখলে সে সময়টাতে না যাওয়াই উচিত সেইসাথে নতুন ট্রেকারদেরও ভরা বর্ষার সময়টা এড়িয়ে চলা উচিত। সবদিক মিলিয়ে ভালো সময় বর্ষার শেষ দিকে। ঝর্ণায় তখন প্রচুর পানি থাকে অপরদিকে ফ্ল্যাশ ফ্ল্যাডের (পাহাড়ী ঢল) সম্ভাবনাও কমে আসে। ঢাকা থেকে আলীকদম যাওয়ার একাধিক উপায় আছে। প্রথম উপায় ঢাকা থেকে বাসে বান্দরবান শহর অথবা সরাসরি আলীকদম। আবার ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী বাসে চকোরিয়া নেমে সেখান থেকে লোকাল বা জীপে করে আলীকদম আসা যায়। আলীকদম পানবাজার এলাকায় আপনাকে আসতে হবে প্রথমত। সেখান থেকে বাইক বা লোক বেশি থাকলে রিজার্ভ জীপে করে আপনাকে যেতে হবে আলীকদম-থানচি সড়কের ১৭ কিলোমিটার পয়েন্টের আদুপাড়ায়।
যাবার পথে ১০ কিলোমিটার-এ পৌঁছে সেখানের আর্মি ক্যাম্পে ন্যাশনাল আইডি কার্ড ও ফোন নাম্বার দিয়ে অনুমতি নিয়ে যেতে হবে। সেইসাথে খেয়াল রাখতে হবে ট্রেকিং করে যাতে সেদিন বিকাল ৫ টার দিকেই ফিরে আসতে পারেন কারণ ৬ টার মধ্যে আর্মি রাস্তার গেট বন্ধ করে দেয়। তাই সকালে যত দ্রুত সম্ভব যেতে হবে ও বিকেলের মধ্যে ফিরতে হবে। আদুপাড়া থেকে ট্রেকিং শুরু। ট্রেকিং শুরু করার আগে স্থানীয় দোকান থেকে শুকনো খাবার কিনে নেওয়া ভালো কারণ দুপুরে খাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। চেষ্টা করবেন ম্যাংগো বার, বাদাম, বিস্কুট, কেক ইত্যাদি রাখতে যাতে অল্প খেলে পেট কিছু সময়ের জন্য ভর্তি থাকে। ঝর্ণা দেখতে আপনাকে এই আদুপাড়া থেকেই গাইড ঠিক করে নিতে হবে।
আদুপাড়া থেকে ঝর্ণা দেখে ফিরে আসতে ৬-৭ ঘন্টা লাগবে। গাইডের সাথে বিস্তারিত আলাপ করে নিবেন। খরচ, সময়, ফেরার সময় মেম্বার পাড়ার পাশে অবস্থিত ওয়াংপা ঝর্ণা দেখে আসা যাবে কিনা সব আলাপ করেই গাইড ফাইনাল করবেন। এছাড়া সুযোগ পেলে আশেপাশের অন্য দুয়েকটা ঝর্ণা ও ঝিরি দেখে আসতে পারেন। অভ্যস্ত ও পুরোনো ট্রেকারদের কাছে দামতুয়া ট্রেকিং খুব বেশি কঠিন মনে না হলেও নতুন ট্রেকারদের কাছে বান্দরবানের দানবের মত অতিকায় খাড়া পাথুরে পাহাড়ে ট্রেকিং কিছুটা কষ্টসাধ্যই। যদিও ঝর্ণার সৌন্দর্য দেখার পর সেসব কষ্ট উবে যায়। হাঁটতে হাঁটতে কখনো ঝর্ণার শব্দ শুনতে পাবেন কিছু জায়গায় দেখা পাবেন ছোট ছোট পানির ধারার। তবে মূল ঝর্ণার সৌন্দর্যের সামনে সব নস্যি। কিন্তু কষ্টের বিষয় হলো বেশিক্ষণ সময় ঝর্ণায় কাটানো যাবে না সময়ের বাধ্যবাধকতার কারণে। যেভাবে গিয়েছেন একই উপায়ে ফিরে আসবেন।
রাতে থাকতে চাইলে মত আলীকদম বা চকোরিয়ায় হোটেল আছে, সেখানে এসে থাকতে পারেন কিন্তু ঝর্ণার কাছাকাছি থাকার ব্যবস্থা নেই। খাওয়াদাওয়া আলীকদমেই করতে পারবেন। দামতুয়া ট্রেকিং-এ অবশ্যই ভালো গ্রিপের স্যান্ডেল বা জুতা পরতে হবে সেই সাথে জোঁক ধরার সম্ভাবনা আছে তাই বড় মোজা পরা ভালো। নিজের প্রয়োজনীয় ঔষধ ও শুকনো খাবার সাথে রাখতে হবে। ব্যাকপ্যাক যত ছোট হবে ততই ভালো। বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু বা অসুস্থ কাউকে না নিয়ে যাওয়াই উচিত কারণ বেশ ধকল আছে এই ট্রেকিং-এ। নিজের সাথে অবশ্যই নিজের পরিচয়পত্রের মূলকপি ও ফটোকপি রাখতে হবে। সেই সাথে অবশ্যই সময়ের খেয়াল রাখতে হবে। কোথাও বেড়াতে গেলে অবশ্যই ময়লা-আবর্জনা ফেলে নোংরা করবেন না। আমাদের দেশ আমাদেরই পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।



