বই Talkহোমপেজ স্লাইড ছবি
মির্জা গালিব : উর্দু সাহিত্যের এক কিংবদন্তি

মোতাওয়াক্কিলুর রহমান: উর্দু সাহিত্যের এক কিংবদন্তির নাম মির্জা গালিব। তাকে বলা হয় দুরূহ কবি। কারণ তার কবিতা বুঝা সেই সময়ের সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা কবিরাও বুঝতে পারতো না। তাই গালিবকে নিয়ে লোকের তখন অনেক রসিকতা ও ঠাট্টা করতো। তার কবিতা নিয়ে লোকেরা বলতো, “সৌদার কবিতাও বুঝি, মীরের কবিতাও বুঝি। কিন্তু আপনার কবিতা হয় আপনি বুঝেন না হয় খোদা বুঝেন।” তখন তিনি বলতেন, “প্রতিদান আশা করি না, প্রশংসার পরোয়া করিনা।
আমার কবিতার মানে না থাকলে না থাকুক” তিনি আরো বলতেন, “আমি যখন কবিতা বলবো বলে উঠে দাঁড়ায়, শব্দরা তখন ভিক্ষাপাত্র নিয়ে বলে, আমায় কিছু অর্থ ধার দাও” তিনি আরো বলতেন, “আমি অনাগত বাগানের পাখি, যে বাগান এখনো পৃথিবীর বুকে জন্মায় নি।” গালিব নিজেকে নিজে সান্তনা দিয়ে বলতেন, “গালিব! তুমি যদি ভাবো লোকে কি বলবে তাহলে লোকে কি বলবে?” তাকে চিঠিতে লোকেরা প্রচুর গালি দিতো। কিন্তু গালিব এসব কানে তুলতেন না। একদিন গালিব খাবার খাচ্ছিলেন। ডাকপিয়ন এসে চিঠি দিয়ে গেল। প্রেরকের নাম নেই, অচেনা হাতের লেখা দেখে তিনি সেটা এক সাগরেদকে দিয়ে বললেন, কি ব্যাপার দেখতো? চিঠি পড়ে শিষ্যটি চুপ।
গালিব বুঝলেন, এটি সেই গাল-মন্দের চিঠি। তাই নিজেই নিজের পড়ে দেখলেন। হেসে বললেন, “গাধাটা গাল দিতেও জানে না বুড়ো লোককে মা ধরে গালি দিতে নেই এদের গাল দিতে হয় মেয়েকে নিয়ে। জোয়ান লোককে গাল দিতে হয় বউকে নিয়ে। এদের বউয়ের জন্য মনে ভালোবাসা থাকে। আর বাচ্চাকে গাল দিতে হয় তার মায়ের নাম ধরে। কারণ এর চেয়ে আপন তার আর কেউ নেই। এ যে আমার মতো ৭২ বছরের বুড়োকে মা ধরে গালি দিচ্ছে এমন বেকুব আগে দেখিনি।” আমার মাঝে মাঝে মনে হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষরাই বোধহয়, দরিদ্রতাকে নিয়ে রসিকতা করতে পারে। গালিবও তাদের একজন।
একবার বাসা বাড়া দিতে না পারায় তাকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হলো। তখন গালিব গাছের নিচে বসে আছেন। লোকে জিজ্ঞেস করে, গালিব কি অবস্থা? তখন তিনি শেরে বলছেন, “খোদা যখন পৃথিবীতে কোন দুঃখ পাঠায়, তারা নির্দিষ্ট জায়গায় যাওয়ার আগে উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করে গালিবের ঘরটা কোথায় জানি?” গালিব বলতেন, “যখন পাওনাদাররা এসে বকা দিতো তখন আমি নিজেকে অন্য কেউ ভেবে নিজেই নিজেকে বলতাম, বুঝো মজা ধার নেওয়ার সময় তো মনে ছিলো না।” গালিবের এ দারিদ্র্যতা তাকে একটুও বিচলিত করতো না। মদের টাকা বাকি পড়ে পাওনাদারের নালিশে দাঁড়ালেন কাঠগড়ায় বিচারক তার কাছে জানতে চাইলেন, শোধ করতে পারবে না জেনেও কেন করলে এতো দেনা? গালিব হেসে জানালেন, “কর্জ করে মদ খেতে ঠিক তবে জানতাম যে হ্যাঁ এই খালি পেটে আনন্দ করে একদিন পুরো দুনিয়ায় রঙ ছড়াবে” টাকা না থাকলেও গালিবের মর্যাদাবোধ ছিল আকাশসম।
অভাবের কারণে ডাক পেলেন দিল্লি কলেজের ফরাসির অধ্যাপক হওয়ার। কলেজের প্রিন্সিপাল গালিবের বন্ধু মানুষ। গালিব চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গেলেন। সে সময় মানুষজনকে অভ্যর্থনা জানানোর রীতি ছিলো। গালিব পালকি নিয়ে অপেক্ষায় রইলাম কিন্তু কেউ তাকে রিসিভ করতে এলো না বলে তিনি ফিরে গেলেন। পরে প্রিন্সিপাল সাহেব বার্তা পাঠালেন, “আপনি এবার এসেছেন কর্মপ্রার্থী হয়ে তাই আমি আপনাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে যেতে পারি না।”
গালিব উত্তর পাঠালেন, “সম্মান বাড়বে বলে চাকরি নিতে চেয়েছি, যা আছে সেই সম্মানও যদি কমে তবে সে চাকরিকে দূর থেকে সালাম।” এ আত্মসম্মানবোধ গালিবকেই মানায়। এতোকিছুর পরও গালিব ছিলেন মানুষের জীবন পঙক্তির ধ্বনি। ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা। তাই লোকে তাকে বলতো চাচা গালিব। আমার পড়া গালিবের শের্ এর মধ্য সবচেয়ে প্রিয় শের্ দিয়ে শেষ করি, “না গুল-এ-নাগমা হু, না পর্দা-এ-সাজ, ম্যায় হু মেরি শিকস্ত কি আওয়াজ।” ‘আমি ফুলের সঙ্গীত নই, আমি সাজসজ্জার আবরণ নই, আমি আমার পরাজয়ের প্রতিধ্বনি।”



