জাতীয়হোমপেজ স্লাইড ছবি

ষ্টকহোম সিন্ড্রমের আদ্যোপান্ত!

ওয়াসিম ইফতেখারুল হক: আমরা প্রায়শ বলিনা যে, পাপ কে ঘৃণা কর; পাপীকে না’। তো এই সুত্রে তো খুন কে ঘৃণা করেও খুনিরে ঘৃণা করা যাবে না? রেপিষ্ট, রেসিষ্ট, কিলাররেও ঘৃণা করা যাবে না? সুইস ক্যপিটাল স্টকহোমে নরডিয়া ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা ঘটে। মুখোশ পরে জ্যাকেটের ভেতর রাইফেল নিয়ে ব্যংকে ঢুকে পরে ডাকাত। রাইফেল তাক করে প্রথমে ব্যাংকের সিলিং বরাবর এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়ে ফ্যান লাইট ঝাঝড়া করে দেয়। আর উচ্চশব্দে গান শুরু করে “The party has just begun”গুলি শেষ করে এক পুরুষসহ চারজন নারীকে জিম্মি করে ফেলে সে। এরপরে কিছুটা শান্ত হয়ে আসে ডাকাত। পা মেলে মেঝেতে বসে পরে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে এসময় সম্পূর্ণ মাতালের মত ছিল তার অ্যাঠিচ্যুড। পুরো ঘটনা অবশ্য বাইরে থেকে লাইভ করছিল একটা টিভি চ্যানেল। ডাকাত তখন পর্যন্ত একা হলেও পুলিশ তারে পাকড়াও করতে সাহস পাচ্ছিল না। আশঙ্কা করছিল জীবনহানি ঘটে যেতে পারে। দেন-দরবার শুরু হলে জিম্মি মুক্তির বিনিময়ে ডাকাতটি ৩ মিলিয়ন সুইডিস ক্রোনার দাবী করে। সাথে লাগবে দুটি বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, দুটি ম্যাগজিন সহ অস্ত্র, দুটি হেলমেট আর একটা পিকআপ ট্রাক। তবে এগুলো প্রথম শর্ত ছিল না। তার প্রথম শর্ত ছিল তার বন্ধু আরেক ডাকাতকে তার কাছে ব্যাংকে এনে দিতে হবে ডাকাতিতে সহযোগিতা করার জন্য। টানা ২৮ অগাস্ট পর্যন্ত ৬ দিন ধরে চলে এই ডাকাতি। এক পর্যায়ে ডাকাত, প্রধানমন্ত্রী’র সাথে কথা বলার আবদার করে বসে। বাধ্য হয়ে প্রধানমন্ত্রী কথাও বলেন তার সাথে। তিনি শুধু নিজেই কথা বলে ক্ষান্ত দেননি। দু’জন জিম্মির সাথেও কথা বলিয়ে দেন পিএমরে। প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলাপের পর শুরু হয় শর্তপূরণের কাজ।

প্রথমেই ডাকতের বন্ধু ডাকাতকে এনে ব্যংকে ঢুকিয়ে দেয়া হয় সঙ্গ দেবার জন্য। একে একে রাইফেল, গুলি, জ্যকেট, হেলমেট সব কিছুই সাপ্লাই করা হয়। গাড়িটি পার্ক করে দেয়া হয় গ্যরাজে। প্রশ্ন উঠতে পারে গাড়িতে উঠার সময় কেন পাকড়াও করা হবে না ডাকাতকে? কারণ হল যেহেতু বুলেট প্রুফ জ্যকেট পেয়ে গিয়েছে তারা তাই ধরতে গেলে এলোমেলো গুলি চালাতে ভয় পেত না তারা। তাছাড়া গাড়ি থাকায় গুলি করে পালিয়ে যাওয়াও সহজ ছিল। এক পর্যায়ে সুইস কতৃপক্ষ মৌমাছির ঝাঁক ব্যংকের ভেতর পাঠিয়ে ডাকাতকে কামড় খাইয়ে হেনস্থা করার সিদ্ধান্ত নেয়। সঙ্গত কারনে সেই সেটা আর করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

এক পর্যায়ে ছাদে ড্রিল দিয়ে ছিদ্র করে পুলিশ। তাদের টার্গেট ছিল ফুটা দিয়ে গুলি করে ডাকাত শায়েস্তা করা। কিন্তু ছিদ্র করার পর পুলিশের আগেই গুলি ছূড়ে দেয় ডাকাত। এবং নির্দেশ দেয় এক্ষুনি ছিদ্র ঢালাই করে দিতে। নতুবা পার্টি শুরু করে দেবে। এভাবে ৬ দিন চলার পর কৌশলে ডাকার দুজন কে ব্যংকের একপ্রান্তে সরিয়ে এনে নার্ভ গ্যাস চার্জ করে ধরে ফেলা হয়।তবে যেহেতু দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকার, সাধারণ মানুষ এবং ডাকাতরা খুব কাছাকাছি অবস্থান করেছিল। এবং দুই পক্ষই দুইটি ভিন্ন ধরনের মানসিক সংকটের মুখোমুখি হয়। ফলে তাদের ভেতর এক ধরনের বন্ধন তৈরী হয়ে যায়। জিম্মি থাকাকালীন ক্রিষ্টিম ইনমার্ক নামে একজন নারী কর্তা রাতে শীতে থরথর করে কাঁপছিলে। এ দৃশ্য দেখে ডাকাত সর্দার জ্যাম এরিক ঐ ভদ্রমহিলার গায়ে নিজের জ্যাকেটটি খুলে পড়িয়ে দেন।

অন্য একজন নারী জিম্মাবস্থায় রাতে দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। একটু পর পর তার ঘুম ভেঙে যেতে। তখন এরিক এসে তাকে সান্ত্বনা দিত, অভয় দিত। এক পর্যায়ে নিজ অস্ত্র থেকে একটা গুলি বের করে তারে উপহার দেন। বলেন ডাকাতির স্মারকচিহ্ন হিসেবে যেন তিনি আজীবন রেখে দেন । বার্গিটা নামের একজন ব্যাংকার তার বাচ্চাদের সাথে ফোনে কথা বলার দাবী তোলে। কিন্তু ভয়ে ঠিকমত ডায়াল করতে পারছিল না। তখন এরিক নিজেই ডায়াল করে ফোনে ধরিয়ে দেয়। অফিসারের বাচ্চার সাথেও ফোনে কথা বলে অভয় দেয়।বার্গেনিং এর এক পর্যায়ে জীম্মিদের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে একজন পুলিশ অফিসারকে সাময়িক ভাবে ভেতরে ঢুকার সুযোগ পায়। ভেতরে এসে ডাকাত ও জিম্মিদের আড্ডা গালগল্প দেখে অফিসার রীতিমত ভড়কে যায়। বাইরে এসে সে সাংবাদিকদের জানায়, “আমার মনে হয় না বন্দুকধারীরা তাদের কোনো ক্ষতি করবে১!”এরেষ্ট করার পর ডাকাত দুজন কে যখন পুলিশ নিয়ে যাচ্ছিল তখন সেখানে এক হৃদয় বিদারক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

জিম্মিরা কেউ পুলিশকে অভিনন্দন দিচ্ছে না। তারা বরং ছুটে আসছিল ডাকাতের দিকে। হ্যান্ড সেক করছিল, কেউ কেউ বুকে জড়িয়ে ধরে বাস্পরুদ্ধ হচ্ছিল। কেউ কেউ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল ডাকাতের জেল হয়ে গেলে ডাকাতের ফ্যমিলিকে দেখভাল করবে। জেলে গিয়ে সাক্ষাৎ করবে এসব। ডাকাত সব শেষে সবার কাছে অটোগ্রাফ আবদার করে বসে। তার সাদা টিশার্টে অন্তত ৬ জন ভালবাসা জানিয়ে স্বাক্ষর করে দেন। পরবর্তীতে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হয় এবং একজন ডাকাত তার অর্ধেক জীবনই কারাগারে কাটিয়ে দেন। দুজন ডাকাতই এখন পর্যন্ত জীবিত এবং তারা অপরাধ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছে। ৬ টা রাত জিম্মি হয়ে কাটিয়েও অধিকাংশ জিম্মির ডাকাতদের প্রতি কোন ঘৃণাই তৈরী হয়নি। বরং ভালোবাসা জন্ম নিয়েছিল।

আসলে মানুষের ভেতর সু ও কু দুটি প্রবৃত্তিই পাশাপাশি থাকে। আপনি কোনটাকে যত্ন করছেন সেটা একান্ত আপনার বিষয়। জুলুম এবং হিংস্রতার পাশাপাশি একজন মানুষের মধ্যে মানবিক উপলব্ধিও থাকে। এ ধরণের জিম্মি পরিস্থিতিতেও ডাকার ও জিম্মিরা সেই মানবিক স্বত্তার সন্ধান পেয়েছিল। সম্পূর্ণ সময়ে ডাকাতরা বন্দিদের কোন ক্ষতি করেনি। নূন্যতম হেনস্থাও করেনি। উচ্চস্বরে গালাগাল পর্যন্ত করেনি। তারা প্রশাসনকে ভয় দেখিয়ে দাবি পূরণ করতে চেয়েছিল মাত্র। জিম্মি ব্যাংককর্তাদের সাইকোলজিষ্টের চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। তাদের একজন সাইক্রিয়াটিষ্টকে প্রশ্ন করেন “আমার কোথাও কি কোনো ভুল হচ্ছে, অথবা এটা কি আমার সমস্যা- আমার ডাকাতদের প্রতি কোনো ঘৃণা জন্ম হয় নি কেন? এক ধরণের বিশেষ মানসিক পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী অপরাধীর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে যেতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তির মধ্যে এমন সব মানসিক উপসর্গ লক্ষ্য করা যায় যেটা খুবই বিরল- যেমন ব্যক্তিটি অপরাধীর প্রতি দুর্বল এবং আবেগতাড়িত হয়ে যায় । এসময় সে আর ওই অপরাধীকে একজন অপরাধী হিসেবে মানতে চায় না।

উক্ত ব্যংক ডাকাতি নিয়ে সারা বিশ্বে হৈচৈ পরে যাই। প্রচুর গবেষণা হয়। দেখা যায় ব্যাংক কর্তাদের সাথে জিম্মিকারীর পূর্ব সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও তারা পরস্পরের সাথে Irrational relationship এ জড়িয়ে পরে। ডাকাতদের বিচার চলা-কালীন সময়ে আদালত এবং পুলিশকে কোনোভাবেই তাদের কেও নূন্যতম সাহায্য করেনি। অপরাধীদের সাথে Irrational relationship-এর এ ধরণের আরো নমুনা আছে, যেমন- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচারের মুখোমুখি হওয়া এক জার্মান অফিসারের ছবি দেখেন একনারী। তিনি দেখেই চিনতে পারেন যে এই অফিসারই তাকে নির্যাতন করেছিল। কিন্তু তিনি ছুটে যান ট্রাইব্যুনালে এবং উক্ত অপরাধী’র পক্ষে সাক্ষ্য দেন। সাক্ষী দিতে তিনি বলেন নির্যাতিত হলেও অফিসারটি আদতে মানবিক ছিলেন। বন্দীদের শাস্তি থেকে বাঁচানোর ক্ষমতা তার ছিল না, কিন্তু তিনি মনে প্রাণে মানবিক হতে চেষ্টা করতেন সব সময়।

ধর্ষনের ঘটনা গুলো তারে ঘটাতে হত ওপরের নির্দেশে, নিজে বাঁচার তাগিদে। ধর্ষিত হবার সময় সেই মানবিক চোখ তিনি বুঝেছিলেন। ১৯৩৩ আমেরিকায় একটি মেয়েকে এক ব্যক্তি কিডন্যাপ করে শিকল দিয়ে বেঁধে নির্যাতন করে। কিন্তু পরবর্তীতে ওই নারী এটা অস্বীকার করে এবং কিডন্যাপারকে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনতে সহায়তা করে। স্টকহোমে ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা থেকে এই সাংঘাতিক মানসিক ব্যধির নামকরণ হয় ষ্টকহোম সিন্ড্রম।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker