বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি
কফি হাউজ গানটির জন্মেকথা!

মান্না দে’র নাম করলেই বাঙালির সবার আগে মাথায় আসে এই গানটা, “কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই”। সারা জীবনে মান্না দে কত কালজয়ী গানই তো গেয়েছেন। “ও কেন এত সুন্দরী হল”, “বাজে গো বীণা”, “যখন কেউ আমাকে পাগল বলে”, “কে তুমি তন্দ্রাহরণী”, “সে আমার ছোটো বোন”, “আমি যে জলসা ঘরে” – বাংলাতেই রয়েছে অসংখ্য বিখ্যাত গান। এছাড়া, বলিউডে একের পর এক হিট গান, মারাঠি, গুজরাটিতেও বেশ কিছু মনে রাখার মতো গান গেয়েছেন তিনি। এত কিছুর পরেও বাঙালির কাছে “কফি হাউজের সেই আড্ডাটা”-র মতো জনপ্রিয় আর কোনো গান হয়নি। নিখিলেশ, রমা রায়, সুজাতা, মইদুল, ডি সুজা, অমল এবং লেখক নিজে – গানের এই চরিত্রগুলো আমাদের যাপনে মিশে রয়েছে।
অবশ্য মান্না দে নিজেও মনে করতেন, এই গানে তাঁর থেকে গীতিকার এবং সুরকারের কৃতিত্ব অনেক বেশি। তাঁর মতে, তিনি গানটা গেয়েছিলেন মাত্র। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এই গান গাইলে সুপারহিট হত, আর শ্যামল মিত্র গাইলেও হত হিট। কার কৃতিত্ব বেশি, এই বিতর্কে ঢুকে আমাদের কাজ নেই। তবে, গানটির জন্ম কীভাবে হল, সেই ইতিহাসের দিকে একবার তাকাতে পারি।
আশির দশকের কথা। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার তখন বেশ কিছু প্রেমের গান লিখেছেন, আশা ভোঁসলের কণ্ঠে সেগুলো হিটও হয়েছে। তবুও গৌরীপ্রসন্নের মনে আক্ষেপ, মান্না দে’র জন্য একটা পুজোর গানও লিখতে পারছেন না। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখা পুজোর গান গাইছেন মান্না। এরই মধ্যে একদিন গৌরীপ্রসন্ন গেলেন নিউ আলিপুরে নচিকেতা ঘোষের বাড়িতে। তখন ১৯৮৩ সাল।
তখনকার বাংলা গানে সেরা জুটি ছিলেন নচিকেতা আর গৌরীপ্রসন্ন। নচিকেতার ছেলের সঙ্গেও গৌরীপ্রসন্নের ভালো হৃদ্যতা, গৌরীকাকার স্নেহের ‘খোকা’ তিনি। ইতিমধ্যেই সুপর্ণকান্তির সুরে মান্না দে গেয়ে ফেলেছেন “সে আমার ছোটো বোন” এবং আরো কয়েকটি সুপারহিট গান। নচিকেতার বাড়িতে সুপর্ণকে দেখে গৌরীপ্রসন্ন মজা করে বললেন, “কী বাইরে আড্ডা মেরে সময় কাটাচ্ছ?”
সুপর্ণ বললেন, “কী সব গদগদে প্রেমের গান লিখে যাচ্ছ? একটু অন্য রকম গান লিখে দেখাও না! এই আড্ডা নিয়ে তো একটা গান লিখতে পারো”৷ “তুমি তো অক্সফোর্ডের এমএ হয়ে গিয়েছো? আড্ডা নিয়ে বাংলা গান গাইবে?”, শুধোলেন গৌরীবাবু।
সুপর্ণের পাল্টা প্রশ্ন, “এই যে আমরা কফি হাউসে আড্ডা দিতে যাই, এটা নিয়ে গান হবে না কেন?”এইভাবে তর্ক জমে উঠল। গৌরীপ্রসঙ্গ কিন্তু কথাবার্তা বলতে বলেই ভেবে চলেছেন গানের লাইন। একটু পরে সুপর্ণকে বললেন, “লিখে নাও, ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই/ কোথায় হারিয়ে গেল সোনালি বিকেলগুলো সেই’”। সঙ্গে সঙ্গেই তাতে সুর দিয়ে দিলেন সুপর্ণ। সেখানে শক্তি ঠাকুরও হাজির ছিলেন। তাঁর অনুরোধ, পুজোয় তিনিই এই গানটি গাইবেন। কিন্তু সুপর্ণ তখনই ঠিক করে ফেলেছেন, গানটা তিনি মান্না দে’কে দিয়েই গাওয়াবেন। অনেক কষ্টে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শক্তি ঠাকুরকে শান্ত করলেন তিনি।
পরের দিন সকালে সুপর্ণকে ফোন করলেন গৌরীবাবুর স্ত্রী। বললেন, “কী গান দিয়েছিস তোর কাকাকে? সারা রাত জেগে লিখে গিয়েছে৷ এত অসুস্থ, বহু দিন পরে রাত জেগে কোনও গান লিখল৷” ততদিনে ক্যানসার বাসা বেঁধেছিল গৌরীপ্রসন্নের শরীরে।
দু’দিন পর গান লিখে গৌরীবাবু সুপর্ণের কাছে হাজির। সুপর্ণ চাইছিলেন, গানে আরেকটি স্তবক যোগ করুন গৌরীপ্রসন্ন। কিন্তু গৌরীবাবু প্রথমে রাজি ছিলেন না। তাঁর বক্তব্য ছিল, “একটা নতুন স্টাইলে এই গানটা শেষ করছি৷ ও রকম ভাবে বাড়তি লাইন যোগ করার মানে হয় না৷” অন্যদিকে সুপর্ণের আবদার, গানে একটা ক্লাইম্যাক্স দরকার। অনেক পীড়াপীড়ি করে শেষ পর্যন্ত গৌরীবাবুকে রাজি করান আরেকটা স্তবক লিখতে। যোগ হয়, “সেই সাতজন নেই আজ, টেবিলটা তবু আছে…” স্তবকটি।
এই গানের শেষ তিনটে লাইন গৌরীপ্রসন্ন লিখেছিলেন হাওড়া স্টেশনে, একটা সিগারেটের প্যাকেটের পিছন দিকে। চিকিৎসা করাতে চেন্নাই যাচ্ছিলেন তিনি। এক চেনা লোকের মারফত গানের শেষ লাইনগুলো ‘খোকার’ কাছে পাঠিয়ে দেন তিনি।
“কফি হাউজের সেই আড্ডাটা” বোম্বে শহরে রেকর্ড করলেন মান্না দে। পরের ঘটনা তো ইতিহাস। গানটির দ্বিতীয় অংশ হিসেবে অনেক বছর পর “স্বপ্নের কফি হাউজ” নামের একটি গান মান্না গেয়েছিলেন। কিন্তু সেই গান খুব বেশি দাগ কাটতে পারেনি শ্রোতাদের মনে।
তথ্যঋণ – রূপায়ণ ভট্টাচার্য, লুতফুল কবির রনি।



