ছুটিহোমপেজ স্লাইড ছবি
চীনের মহাপ্রাচীর ও লেডি মেন জিয়াং নু এঁর কান্না

তৈয়বল আজাহার: চীন সাম্রাজ্য ভ্রমণে এ প্রবাদটি প্রতিষ্ঠিত— “বেইজিং এসে তিয়েন আনমেন স্কয়ার ও ফরবিডেন সিটি না গেলে ধরে নেয়া হবে আপনি বেইজিং যাননি আর চীনের মাটিতে পা রেখে মহাপ্রাচীর (Great Wall of China) না গেলে ধরে নেয়া হবে আপনি কখনো চীনে যাননি।” এত বিশাল মহাচীন, এত বড় গণচীনের ব্যাস ব্যাসার্ধের সন্ধান পাওয়া বাঙালির জন্য চিরকালই এক দুর্ভেদ্য রহস্য হয়ে আছে। প্রাচীনকালে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য অতীশ দীপঙ্কর নামের যে এক মহান বাঙালি পণ্ডিত চীনে এসেছিলেন বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করতে তা আজও চীনবাসী মনে রেখেছে।
চীন এমন এক প্রাচীন দেশ যার বুকে হাজার হাজার বছর ধরে শিল্প-সাহিত্য-চিকিৎসা-জ্ঞান আর কিংবদন্তির চাষবাস হয়েছে। এর একদিকে বরফ পড়ে তো অন্যদিকে কুমতুং মরুভূমির তপ্ত বালুতে আলেয়ার খেলা চলে। একপ্রান্তে কড়কড় ডলার-আরএমবি’র চকচকে হংকং-ই জাহাজ চলে উপকূলের কোলঘেঁষে আরেক প্রান্ত তান্ত্রিক আর কুংফু-কারাতেরা জিনসেং চিবিয়ে ডুবে থাকে অতীন্দ্রবাদের অমানিশায়। চীনের মহাপ্রাচীরের গল্প পাঠ্যপুস্তকে সবাই পড়েছি পৃথিবীর সপ্তমাশ্চর্যের একটি হিসেবে। কেন-ই-বা পড়বো না! মানুষ চাঁদে গেল, সেখান থেকে দুনিয়ার বুকে চীনের মহাপ্রাচীরের দেখা মিললো।
মহাপ্রাচীরের এক মাথা কুমতুং মরুভূমির লুপ নুর নামক শুকিয়ে যাওয়া লবণ হ্রদ থেকে শুরু হয়ে লেজ মিশেছে সাংহাইয়ের সমুদ্র বুকে। যদি কেউ ৬৫৩২ কিলোমিটারের সুদীর্ঘ গ্রেটওয়ালের মরুভূমির লুপ নুর অংশ থেকে হাঁটতে শুরু করে তবে সাংহাইয়ের সমুদ্রে গিয়ে গোসল করতে তার পাক্কা দুই বছরের বেশি সময় লাগবে। চীনের মহাপ্রাচীর মানুষের হাতে তৈরি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্থাপত্য। মাঞ্চুরিয়া আর মঙ্গোলিয়ার যাযাবর দস্যুদের হাত থেকে চীনকে রক্ষা করার জন্য এ গ্রেট ওয়াল অব চায়না তৈরি করেছিলেন চীন সাম্রাজ্যের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াঙ (Qin Shi Huang), খ্রিস্টপূর্ব ২২১ হতে ১৫ বছর ধরে।
কিন রাজবংশের (Qin dynasty) মহাপ্রতাপশালী এ শাসকই পৃথিবীতে প্রথমবারের মতো ‘emperor’ শব্দটি ব্যবহার করেন। শুধু শৌর্যে নয় বীর্যেও তিনি যে অলৌকিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন তার প্রমাণ তিনি প্রায় ৩ হাজার জন নারীকে উপপত্নী হিসেবে তার সাথে বসবাস করতে বাধ্য করিয়েছিলেন। যে নারীকে তিনি জোর করে নিয়ে আসতেন তার প্যালেসে, সে নারীর জন্য চিরদিনের জন্য নিজের পিতামাতা, ভাইবোন আর শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত গৃহে ফিরে যাওয়ার ব্যাকুলতা নিষিদ্ধ হয়ে যেতো। তিয়েন আন মেন স্কয়ার সংলগ্ন সম্রাটের প্যালেস মিউজিয়াম এজন্যই হয়তো Forbidden City নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে।
দুনিয়ার বুকে শক্তিশালী অবিবেচক শাসকের দ্বারা শোষিত মানুষের বঞ্চনার আওয়াজ সভ্যদের কানতক পৌঁছুলেও রাজগৃহের হেরেমবন্দী নির্যাতিত অপমানিত নারীর কান্নার প্রতিধ্বনি হয়তো দেয়ালজুড়েই গুমরে মরে। ফরবিডেন সিটির গেটে সাঁটানো মহান মাও-সে-তুঙও হয়তো জানেন না ৩ হাজার নারীর আত্মচিৎকার ১৯৮৯ সালের তিয়েন আন মেন স্কয়ারের হাজারো ছাত্রের বিক্ষোভের আওয়াজের চেয়ে তীব্র ছিল কিনা! জানে শুধু একজন। সে সমুদ্রের নীরবতা।
চৈনিক কিংবদন্তি প্রচলিত আছে সম্রাট কিন শি হুয়াঙ যখন সর্বস্ব হারানো বিরহী নারী লেডি মেন জিয়াং নুকে (Meng Jiang Nü) উপপত্নী করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন সেদিন তিনি আর্তচিৎকার দিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন। গ্রেটওয়ালের সমুদ্রের অংশে আজও নাকি কোমল হৃদয়ের কেউ কান পাতলে সে কান্নার আওয়াজ শুনতে পায়। গ্রেট ওয়ালের সাথে লেডি মেন এর পৌরাণিক কাহিনী আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। চৈনিক চারটি প্রধান পৌরাণিক কাহিনীর একটি হলো লেডি মেন। আজ থেকে দুই হাজার বছর আগে কিন সাম্রাজ্যেকালে (Qin Dynasty) মেন জুং য়াং এ একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তার বাড়ির প্রাঙ্গণের টবে লাউ গাছের বীজ বপন করলেন। লাউ গাছটি বড় হয়ে কান্ড আর পাতা ছড়িয়ে প্রতিবেশি জিয়াংয়ের বাড়ির সীমানা পর্যন্ত চলে গেল। এ নিয়ে দুইপক্ষে বিবাদ শুরু হলে তারা একদিন দেখলেন যে, একটি ফুটফুটে সুন্দর মেয়ে লাউ গাছের তলায় বসে আছে। এত সুন্দর কন্যাশিশু দেখে লাউ গাছের বিরোধ ভুলে দুপক্ষই মেয়েটিকে লালনপালন করার জন্য নিজের কাছে নিতে চাইলো। পরে তারা সিদ্ধান্ত নিলো মেয়েটি যৌথভাবে ‘মেন জিয়াং নু’ নামে বেড়ে উঠবে।
মেয়েটি দিনে দিনে অপরূপ সুন্দরীরূপে বেড়ে উঠছিল। চৈনিক সম্রাট কিন শি হুয়াংঙ তখন মহাপ্রাচীর নির্মাণের শ্রমিক হিসেবে কাজ করার জন্য চীনের সকল যুবককে বাধ্য করছিলেন। স্বাধীনচেতা যুবকেরা এ থেকে মুক্তি পেতে বনে জঙ্গলে পালিয়ে বেড়াতেন। একদিন অপরূপ মেয়েটি (মেন জিয়াং নু) দেখলো তার পিছনের বাগানে একজন ক্লান্ত যুবক বিশ্রাম নিচ্ছে। ফ্যান জিলিয়াং তার নাম। জিলিয়াং ছিলেন গ্রেট ওয়ালের শ্রমিক না হতে চাওয়া পালিয়ে বেড়ানো স্বাধীনচেতা যুবকদের একজন। জিলিয়াং ক্ষুধা এবং তৃষ্ণার যন্ত্রণায় মেনদের বাগানে এসেছিলেন। মেন তাকে ক্ষুধা আর তৃষ্ণা মেটালেন। জিলিয়াংয়ের স্বাধীনচেতা মন আর সততা মেনকে মুগ্ধ করলো। তারা একে অপরের প্রতি প্রেমের আহ্বানে মশগুল হয়ে গেল।
মেন তার সাথে পালিয়ে যেতে পারে এ আশংকায় পারিবারিক সম্মতিতে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। দুনিয়ার সকল মহৎ প্রেমেই একজন ভিলেন থাকেন। এ প্রেমপুরাণে ভিলেন হিসেবে আবির্ভূত হলেন একজন স্থানীয় দস্যু, যে কিনা মেন এর রূপে মোহগ্রস্ত ছিলেন। সেই দস্যু তাদের পরিণয়কে মেনে নিতে না পেরে সম্রাটকে সংবাদ পাঠালেন যে ফ্যান নামের এক শিক্ষিত যুবক গ্রেট ওয়াল নির্মাণের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে না গিয়ে মেন এর বাড়িতে পালিয়ে আছে। এ গোপন খবর পেয়ে নৃশংস রাজকর্মচারীরা বিয়ের তৃতীয় দিনের মাথায় ফ্যানকে জোর করে ধরে নিয়ে যায় গ্রেট ওয়াল নির্মাণ করার জন্য। স্বামীহারা মেং পাগলপ্রায় হয়ে গ্রেট ওয়ালের পাদদেশ ধরে ফ্যানের সন্ধানে হাজার হাজার মাইল হাঁটলেন। শ্রমিকদের মধ্যে একজন তাকে জানালো যে তার স্বামী মারা গেছে এবং গ্রেট ওয়ালের নিচে তাকে দাফন করা হয়েছে। মেন ভগ্ন হৃদয়ে তিন দিন তিন রাত একটানা মহাপ্রাচীরের নিচে কাঁদলেন। তার এ কান্নার শব্দে প্রকৃতির নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে গেল।
হঠাৎ একটা দুর্দান্ত শব্দ দিয়ে গ্রেট ওয়ালের ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ অংশ ধসে পড়লো এবং সে তার স্বামীর মৃতদেহ খুঁজে পেল বোহাই সাগরের তীরে শ্যানডং প্রদেশের জিবো শহরে কাছে। সম্রাট এ খবর শুনে মেন জিয়াংনকে শাস্তি দিতে চাইলেন। সম্রাট মেনকে দেখে তার রূপের মোহে মোহিত হয়ে তাকে শাস্তির বদলে জোর করে তার উপপত্নী করতে চাইলেন। মেন বললেন, তিনি উপপত্নী হতে রাজি আছেন তিন শর্তে আর সেগুলো হলো আর কোনদিন কাউকে জোর করে গ্রেট ওয়াল নির্মাণের শ্রমিক বানানো যাবে না; ফ্যানকে খুঁজে বের করতে হবে এবং সম্মানের সাথে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। সম্রাট শর্ত ভঙ্গ করে সমুদ্রে তার চরিত্রহনন করতে উদ্যাত হলে মেং আত্মহননের পথ বেছে নিয়ে নির্যাতিত সকল মহাপ্রাচীর শ্রমিককে যেমন মুক্তির বার্তা দিলেন তেমনি নিজের পবিত্র ভালোবাসার প্রতি আত্মউৎসর্গ করে চীনের সাধারণ মানুষের মনে চিরদিনের শ্রদ্ধার জায়গাটি নিজের করে নিলেন। চীনবাসী এ সাহসী, ন্যায়বান, প্রেমাস্পদ নারীর প্রতি সম্মান জানাতে ফনিক্স মাউন্টেনের পাদদেশে নির্মাণ করেছে Meng Jiangnu Temple.
পাঠকবৃন্দ, এ পৌরাণিক কাহিনী পড়ার পরও আপনাদের কারো কারো মনে হতে পারে যে দুর্ধর্ষ মঙ্গোল দস্যুদের আক্রমণ থেকে চীনকে রক্ষার জন্য সম্রাট কিন শি হুয়াঙ চীনের মহাপ্রাচীর (Great Wall of China) নির্মাণ করেছিল। কিন্তু এ কথা বলা কি খুব বেশি অযৌক্তিক হবে যে, দুর্ধর্ষ মঙ্গোল দস্যুর হাত থেকে চীনকে রক্ষা নয় বরং তরুণ আর যুবকদের জোর করে গ্রেটওয়ালের শ্রমিক হিসেবে পাঠিয়ে দিয়ে হাজার হাজার অরক্ষিত অসহায় তরুণী আর যুবতীকে সম্ভোগ করার বাসনায় এক কুৎসিত মনের সম্রাট গ্রেটওয়াল তৈরির এক নগ্ন খেলায় অংশ নিয়েছিলেন! দুনিয়ার সব ঝলমলে রোদের পেছনে একটা অন্ধকার ছায়া থাকে। আমরা আলো দেখতে পছন্দ করি, অন্ধকার তাই সবসময় আলোর পেছনে চুপ করে বসে থাকে। আসমুদ্রহিমাচলের আঁচলে উদিত সূর্য ডুবে গেলে কেঁদে ওঠে লেডি মেন জিয়াং নু এঁর পবিত্র আত্মা, এশিয়ার নারীরা— চীনের মহাপ্রাচীরের দেয়ালঘেঁষে।



