খেলাচলতি হাওয়াহোমপেজ স্লাইড ছবি
বার্সেলোনা ও মেসি বৃত্তান্ত

মিরাজুল ইসলাম: ১৮৯৯ সালে হুয়ান গাম্পার বার্সেলোনা ফুটবল ক্লাবের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ১৯১০ সালের পর ক্লাবটি প্রফেশনাল ফুটবল খেলা শুরু করলো। ১৯২৫ সালের পর স্পেনে স্বৈরশাসন কায়েম হলো। এরপর থেকে মূলত রাজনৈতিক অস্থিরতার শিকার হতে থাকে এই কাতালান ক্লাবটি। ফ্রাঙ্কো সরকার সরাসরি সমর্থন দিতে শুরু করে রাজধানী ভিত্তিক রিয়াল মাদ্রিদ ফুটবল ক্লাবকে। স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে কাতালানদের প্রতি মাদ্রিদ সরকারকে দমন-পীড়নের অজস্র ঘটনাবলী।
কয়েক দশক ধরে বার্সেলোনা ফুটবল ক্লাবকে এর খেসারত দিতে হয়েছে। নির্মম বাস্তবতা এখনো জাতিগত বিদ্বেষের শিকার কাতালানরা। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বার্সেলোনার নতুন যুগ শুরু হয়। ক্লাবের প্রথম সুপারস্টার ছিলেন কুবালা। এই হাঙ্গেরিয়ান প্রতিভা ১৯৫১ সাল থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত বার্সেলোনা মাতিয়েছিলেন। ১৩১ টি গোল করে মোট চারবার লা লীগা চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন বার্সাকে। সেই সময় ১৯৫৩ সালে স্প্যানিশ সরকারের যোগ সাজশে রিয়াল মাদ্রিদ আইনের মারপ্যাঁচে ছিনিয়ে নিয়েছিলো আর্জেন্টাইন কিংবদন্তী রিভার প্লেট ক্লাবের ডি স্টেফানো’কে। দলবদলের ইতিহাসে এটি ছিল ঐতিহাসিক ন্যাক্কারজনক ঘটনা।
১৯৫৭ সালে নির্মিত হলো তৎকালীন ইউরোপের সর্ব বৃহৎ ফুটবল স্টেডিয়াম ক্যাম্প ন্যু। বার্সেলোনার গর্বের ধন। আধুনিক বার্সেলোনার গত পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে ক্ষণস্থায়ী কিংবা দীর্ঘস্থায়ী ক্যারিশমা স্থাপন যারা করেছেন তাদের মধ্যে ইতিমধ্যে অমরত্ব পেয়ে গেছেন যথাক্রমে - ক্রুয়েফ, ম্যারাডোনা, লাউড্রপ, রাইকার্ড, স্টিচকভ, কোম্যান, রোমারিও, গার্দিওলা, রিভালদো, রোনালদিনহো, ইতো, পুয়োল, জাভি, ইনিয়েস্তা এবং লিওনেল মেসি।
একমাত্র মেসি ২০০৫ সাল থেকে এখনো নিজেকে ধরে রেখেছেন পূর্ণ উদ্যমে। কিন্তু দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বিশ্রাম নেবার সামান্যতম লক্ষণ দেখা না যাওয়ায়, বার্সেলোনার ছন্দপতন ঘটাতে মেসিকে চলে যেতে হচ্ছে ক্লাব ছেড়ে। যদিও কয়েক বছর আগে থেকে দলের জাভি-ইনিয়েস্তা-পুয়োলের বিদায়ের পর ধরে নেয়া হয়েছিলো মেসি এককভাবে বার্সার স্বপ্নপূরণের চাপ নিতে ব্যর্থ হবে। কিন্তু গত তিন মৌসুম মেসি এককভাবে বার্সেলোনার হাল ধরেছিলো। পরে সুয়ারেজ’কে সরিয়ে নেয়া হলো মেসির পাশ থেকে। তারপরও একক প্রচেষ্টায় মেসি দলের হয়ে ৩০ টি গোল করলো পুরো মৌসুমে। ভাঙাচোড়া দলকে জিতিয়ে দিলো কোপা দেল রে।
এই মৌসুমে মেসির সুপারিশ অনুযায়ী বার্সেলোনা নতুন করে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো তারুণ্য নির্ভর দল গড়তে। কিন্তু না। মেসিকে উপড়ে ফেলতে হবে তার ফুটবলের ভিটা মাটি থেকে। লা মেসিয়া প্রজেক্ট ব্যর্থ করা চাই প্রতিপক্ষের। যেভাবে বার্সেলোনার ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে রিয়াল মাদ্রিদ এনেছিলো কোচ মরিনহো’কে। যার যাবতীয় ক্ষোভ জমা ছিল বার্সার বিপক্ষে। কিন্তু কেবলমাত্র মেসি-জাভি-ইনিয়েস্তা মানে লা মেসিয়া’র ঐন্দ্রজালিক জাদু এবং পেপ গার্দিওলার মন্ত্রে মাদ্রিদ সরকারের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তারা ব্যর্থ হয়েছিলো বার্সেলোনার গুরুত্বপূর্ণ শিরোপা জেতা ঠেকাতে। অবশেষে সুযোগ এলো বার্সেলোনার শেষ তুরুপের তাস লিওনেল মেসি’কে বার্সা-চ্যুত অর্থাৎ বাস্তুহারা করবার। কেবল বার্সেলোনা থেকে বিদায় নয়, যেন পছন্দের ক্লাবে নিজেকে মেলে ধরতে না পারে সে চেষ্টাও করতে দেখলো বিশ্ববাসী। ক্লাব ষড়যন্ত্র কতটা জঘন্য ও অমানবিক হতে পারে তা বিশ্বের সেরা ফুটবলারের সাথে না ঘটলে কেউ আমলেও নিতো না।
গত ৫ তারিখ না হয়ে যদি লা লীগার বেতন কাঠামোর আপত্তি যদি এর দুইদিন আগে ৩ তারিখেও জানা যেত তবু সুযোগ থাকতো ম্যানচেস্টার সিটির। হয়তো ১০০ মিলিয়ন পাউণ্ডে গ্রেলিশ’কে না কিনে মেসির সাথে গার্দিওলার নতুন মিথষ্ক্রিয়া দেখার সুযোগ হতো। সময় ও সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় অবিশ্বাস্য কম মূল্যে মেসি’কে পেয়ে গেলো অনুজ্জ্বল ফ্রেঞ্চ লীগের পিএসজি। পুরো প্যারিস এখন মেসি রোমান্সে আচ্ছন্ন। পুরো ঘটনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে, আদতে মেসির বার্সেলোনা ছাড়ার পেছনে পরোক্ষ ভূমিকা আছে লা লীগা কর্তৃপক্ষের। যারা আদতে রিয়াল মাদ্রিদের স্বার্থ রক্ষা করে আসছে গত শত বছর ধরে, যারা বরাবর এলিট মাফিয়াদের পৃষ্ঠপোষকতায় ফুটবলকে ব্যবহার করে অভ্যস্ত।
মেসি না থাকায় লা লীগা সাময়িক ভাবে বর্ণ হারালেও আখেরে রিয়াল মাদ্রিদের লাভ ষোল আনা। ওদিকে মেসি এখন তুলনামূলকভাবে পিএসজি’তে চাপমুক্ত হয়ে খেলতে পারবে। চ্যাম্পিয়নস লীগ জেতা ছাড়া বিশেষ কোন চ্যালেঞ্জ মেসির সামনে নেই। কাতার বিশ্বকাপের জন্য শারিরীক প্রস্তুতিটাই এখন প্রয়োজন মেসির সবচেয়ে বেশি। বার্সেলোনায় মেসি শেষ বারের মতো ক্যাম্প ন্যু স্টেডিয়ামে বিদায়ী বক্তব্য দেন। সাথে ছিলো তার বাবা হোর্গে মেসি। যার হাত ধরে ২০০১ সালের মার্চ মাসে ফ্লাইট ৭৭৬৭ বোয়িং বিমানে চড়ে প্রথম বার্সেলোনায় পা রেখেছিলো। হয়তো মুখ ফুটে বলেনি বার্সেলোনার হয়ে সবচেয়ে বেশী ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়ে সবচেয়ে বেশী গোল করা, সবচেয়ে বেশী এসিস্ট করা, সবচেয়ে বেশী হ্যাট্রিক করা, সবচেয়ে বেশী ফ্রি কিকে গোল দেয়া, এল ক্ল্যাসিকো’তে সবচেয়ে বেশী গোল দেয়া ছাড়াও বার্সার পক্ষে এমন অনেক কিছু করে গেছে যা দ্বিতীয় কারো পক্ষে করা আপাতত অসম্ভব! মেসি এমনই।
মাথা নীচু করে দাঁত দিয়ে হাতের নখ খোঁটা নার্ভাসনেসে ভোগা একটা ১৩ বছরের ছোট্ট ছেলে সে। যে ন্যাপকিনে ২১ বছর আগে তার সাথে প্রথম চুক্তি হয়েছিলো, আজ যাবার সময় একই রকম ন্যাপকিনে কয়েক লক্ষ বার্সা সমর্থকদের চোখের জল মুছিয়ে চলে যাওয়াটাই লিওনেল মেসি’ক অমরত্ব। একশোটা ব্যালন ডি অর থেকে ঐ একটা ন্যাপকিনের মূল্য হাজার গুণ দামী।



